মৃত্যু বলে কিছু আছে কি?
এম ডি গাছের দিক থেকে ঘুরে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
এ তোমার বইয়ের কথা, না বিশ্বাসের কথা?
বিশ্বাস বলতে পারেন, যে-বিশ্বাসের জন্ম অভিজ্ঞতা থেকে।
অভিজ্ঞতা থেকে?
এম ডি চেয়ারে বসলেন। সোনার চশমা খুলে রাখলেন নকশার ওপর। মুখে একটা রক্তাভ দ্যুতি খেলছে। হঠাৎ মনে পড়ল, মানুষ বৃদ্ধ না হইলে সুন্দর হয় না। ইশারায় বললেন, বোসো।
অভিজ্ঞতা মানে? মৃত্যু নেই এমন অভিজ্ঞতা কী করে হতে পারে? না না, তুমি ঠিক বলছ না। এমন একটা বিশ্বাস কষ্টেসৃষ্টে গড়ে তোলা যায়। অভিজ্ঞতায় আসে কী করে? ৩১৮
অভিজ্ঞতা একটা নিজস্ব ব্যাপার। আপনার জানলার কাছে এই গাছটা আছে, আমাদের জানলার কাছে নেই। টেবিলের তলায় আপনার পায়ের কাছে একটা পাদানি রয়েছে, সকলের পায়ের কাছে নেই।
এর সঙ্গে মৃত্যু নেই, এই অভিজ্ঞতার কী সম্পর্ক?
আছে। আমি যদি বলি, আমাকে ছেড়ে যাঁরা চলে গেছেন, তাঁরা প্রতি মুহূর্তেই আমার সঙ্গে আছেন, জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই কদমগাছের মতো। আপনি বিশ্বাস করবেন না, কারণ আপনাকে দেখানো যাবে না। জাগতিক স্তর থেকে তারা অনুভূতির স্তরে উঠে গেছেন। এ এমন একটা ব্যাপার, যা লেবরেটরিতে ডেমনস্ট্রেট করা যায় না। ঈশ্বরকে যেমন দেখানো যায় না। কোনওদিন বিজ্ঞান হয়তো পারবে।
কী জানি তুমি কী বলতে চাইছ!
তা হলে, আর একভাবে বলি। এই মুহূর্তে এই ঘরে বহু শব্দতরঙ্গ ঘুরে বেড়াচ্ছে। গান, বাজনা, বক্তৃতা। বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন দেশ থেকে ভেসে আসছে। লন্ডন থেকে, রাশিয়া থেকে, চিন থেকে। কোনওটাই আমরা শুনতে পাচ্ছি না। আমাকে একটা ভাল রেডিয়ো দিন। আমি সবকটা ধরে ধরে শুনিয়ে দোব। শব্দের মতো মানুষও এক তরঙ্গ থেকে আর এক তরঙ্গে চলে যেতে পারে। টেলিভিশন বিভিন্ন তরঙ্গের আলো ধরে এ তথ্য প্রমাণ করেছে।
তোমার অভিজ্ঞতা কী করে আমার অভিজ্ঞতা হতে পারে?
বিশ্বাস। বিশ্বাসে অনুভূতি তৈরি হয়, অনুভূতিতে অভিজ্ঞতা আসে। কেউ যদি বলেন, এই ঘরে এখন বেগম আখতার গান গাইছেন, তাতে আমার অনুভূতি তৈরি হবে বিশ্বাসে। হ্যাঁ হয়তো গাইছেন। অনুভূতি তেমন প্রখর হলে শুনতেও পাব। তারপর কেউ হয়তো রেডিয়ো খুলে অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রমাণ মিলিয়ে দেবেন।
নাঃ ব্যাপারটা বড় জটিল হে। আমার জমি এখনও তৈরি হয়নি। এই নিয়ে তোমার সঙ্গে একদিন বসব। এপার তো দেখা হল, ওপারটা একবার দেখতে ইচ্ছে করে। অবশ্য এপার থেকে। ওপারে গেলে তো এপারে ফিরতে পারব না। মাথায় একটা লাইন এসে গেল:
যখন নিঃশব্দে শব্দেরে খাবে
তখন ভবের খেলা ভেঙে যাবে–
কার লেখা?
ঠিক মনে পড়ছে না।
লালন কয়, দেখবি ফিরে কী গতি। লালন ফকিরের লেখা। তুমি এসব পড়ো? না হরিশঙ্কর কেবল অঙ্ক কষায়?
আজ্ঞে ওইটাই আমি ভাল পারি না বলে, জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল। তা না হলে এতদিনে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে, কোথায় কোন দেশে চলে যেতুম!
তোমার কি মনে হয় জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে?
বাবার তাই ধারণা।
হরির কথা ছেড়ে দাও। ও একটা র্যাংলার। একটা পরীক্ষায় ও অঙ্কে একশোর মধ্যে একশো এক পেয়েছিল।
সে কি সম্ভব?
সম্ভব হয়েছিল। একটা অঙ্ক ভুল ছিল। অঙ্কটাই ভুল। ও সেটা পয়েন্ট আউট করে, অঙ্কটা কী হওয়া উচিত, শুদ্ধ করে, একটা নোট সমেত খাতা জমা দিয়েছিল। হইহই ব্যাপার। পরীক্ষক যে-বই থেকে অঙ্কটা নিয়েছিলেন, সে বই বাতিল হয়ে গেল। হরিশঙ্করের মাথার দাম অন্য দেশ হলে কত হাজার টাকা হত জানো? এ দেশে মুড়ি মিছরির এক দর।
আমার মাথাটা ভগবান কেন যে এমন করে দিলেন!দুই আর দুইয়ে চার ছাড়া কিছুই সহ্য করতে পারে না।
তোমার মাথায় কেমিস্ট্রিটা ভালই খেলে। রবিবাবু বলছিলেন, এই অল্পদিনেই হাত বেশ পেকেছে।
আজ্ঞে, ওতে তো মাথা নেই।
মাথা ছাড়া হাত হয়! সবই মাথার খেলা। আচ্ছা শোনো, আমার একটা পরিকল্পনার কথা তোমাকে বলি। এই হল সেই পরিকল্পনার ব্লু-প্রিন্ট। এপাশে সরে এসো, আমার চেয়ারের পাশে। দেরাদুনে আমরা আর একটা কারখানা করছি। সেখানে তৈরি হবে শুধু ওষুধ। পাশেই হিমালয়, গাছগাছড়ার অভাব হবে না। ক্লাইমেটও খুব সুন্দর। কী, কেমন হবে?
আজ্ঞে, সাংঘাতিক হবে।
এই দেখো মুসৌরি-চক্রাতা রোড। এর পাশে দু’একর জমি। চমৎকার স্পট। ডান পাশে ঘাড় ঘোরালেই মুসৌরি হিলস। ওই হল কারখানার মডেল।
আজ্ঞে হ্যাঁ, ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়েছে।
বুঝলে, একেবারে আধুনিক ডিজাইনের ব্যাপার। বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি এসে, ডকে পড়ে আছে। আমার একটা ভীষণ ইচ্ছে। বলব?
হ্যাঁ, বলুন।
তোমাকে আমি দেরাদুন পাঠাব। কেমন হবে?
আজ্ঞে ভীষণ হবে।
আমি বেছে বেছে এখানকার কয়েকজনকে ওখানে পাঠাব। তার মধ্যে নাম্বার ওয়ান, তুমি। নাম্বার টু, রবিবাবু। নাম্বার থ্রি, জীমূতবাবু। কেমন হবে টিমটা!
খুব ভাল।
আমিও থাকব তোমাদের সঙ্গে। তবে আমাকে তো দুটো দিকই দেখতে হবে। আমি আসা। যাওয়া করব। হ্যাঁ, এই কয়েকদিন আগে হরিশঙ্করকে ফোন করেছিলুম, মাই গুড ওলড ফ্রেন্ড। ওর খুব ইচ্ছে, তাড়াতাড়ি তোমাকে সংসারী করার। পারলে এই ফাল্গুনে। ফাল্গুন ওর প্রিয় মাস। শিল্পী মানুষ তো! বসন্তের দূত। নিজেও বিয়ে করেছিল ফাল্গনে। সেই স্মৃতিটাকেই আবার জাগিয়ে তুলতে চায়। জানো তো, নিজের জীবনের অপূর্ণ আশা আকাঙ্ক্ষা মানুষ সন্তানের জীবনে ফুটিয়ে তুলতে চায়। তুমি ওকে দুঃখ দিয়ো না। অমন নীতিবাদী আদর্শপরায়ণ মানুষ, তুমি আর দুটি পাবে না। একেবারে পারফেক্ট ম্যান। অমন কামনাশুন্য নির্লোভ মানুষ সচরাচর দেখা যায় না। পঙ্কজকেও আমি চিনি। কলেজে আমরা সব সহপাঠী ছিলুম। দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না। সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।
