অনুমতি আমি চেয়ে নেব।
মনে হয় পাবে না। যে-জায়গা থেকে একটি মেয়ে চলে গেছে, সেখানে আর একটি মেয়েকে যেতে দেন কখনও!
সে আমি বলে দেখব। কাকিমাকে দিয়ে বলাব। ওঁর কথা বাবা নিশ্চয়ই শুনবেন।
ওঁর কথা শুনবেন কেন?
কী জানি কেন?
তার মানে?
আমার মনে হয় কাকিমার কথা ঠেলতে পারবেন না। অসুখের সময় সেবা করতেন, শাসনও করতেন। সেই থেকে কাকিমার সঙ্গে ওঁর অনেক সুখদুঃখের কথা হয়।
তা হলে তো ভালই, তুমি কাকিমাকে দিয়ে বলাও। বলবে, কাকিমাও আমাদের সঙ্গে যাবেন।
.
অফিসটা আমার বেশ জমে উঠেছে। পরিবেশটা এখন অফিস বলে মনেই হয় না। তেমন কোনও শাসন নেই। কেবল চিফ কেমিস্ট ভদ্রলোক মাঝেমধ্যে একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েন। সে ওই পেটের জন্যে। মুড়ির সঙ্গে ভুঁড়ির ভীষণ যোগ। দু’ফোঁটা হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড জলে গুলে সুধীর যেই খাইয়ে দেয়, অমনি মেজাজ শান্ত। তখন মুখে হাসি ফোটে। রবিবাবুর শিক্ষায় অল্পদিনের মধ্যেই অ্যানালিসিসের হাত বেশ পেকে উঠেছে। ফোঁড়ার মতো আরও কত কী যে পাকে! চুল পাকে, ছেলে পাকে, সম্পর্ক পাকে। ম্যানেজিং ডিরেক্টারের সঙ্গে সম্পর্কও বেশ পেকেছে। অনেকটা ছেলের মতো হয়ে গেছি। আসলে চাওয়া আর পাওয়ার তুচ্ছ জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ হতে পারে। একেবারে উনুনে হাঁড়ি চাপিয়ে চাকরিতে না এলে যেটা সম্ভব। বিয়ে করে সংসারে ঢোকা মানেই দাস হয়ে ঘুরে বেড়ানো।
আজ আকাশ একটু মেঘলা মেঘলা। মাঝে মাঝে দমকা বাতাসে গাছপালা পাগলের মতো দুলে দুলে উঠছে। বিকেলের দিকে জোর নামবে মনে হয়। আজ ক্যালকাটা ভেসে যাবে। ময়দানে দুই বড় দলের খেলা আছে। বিকেলে আজ জমবে ভাল।
লেবরেটরিতে ঢুকতেই সুধীরবাবু বললেন, শিগগির যান, এম ডি খুঁজছেন। লেবরেটরিতে যখন কেউ থাকেন না, তখন বেশ দেখায়। রহস্য, রোমাঞ্চ, কল্পনা সব মিলেমিশে জগতের ভেতর একটা জগৎ তৈরি হয়ে যায়। মানুষ যেমন তিনটে! একই মানুষ নানা স্তরে বিভক্ত। এক হল তার হাড়ের খাঁচা, কঙ্কাল। মৃত একটা স্তর। তার ওপর, মেদ মাংসের একটি অবয়ব। ধুধুলের খোসার মতো শিরা উপশিরার জালি। বুকের খাঁচায় দুটো যন্ত্র, হরতনের মতো হৃদয়, বেলুনের মতো ফুসফুস। গর্ভে লিভার, পিলে, অন্ত্র, বৃহদন্ত্র, প্রভৃতি পোঁটলাপুঁটলি। দুপায়ের ফাঁকে মানুষের কদিচ্ছার কোষ। যার সামনে দাঁড়িয়ে আলিবাবা অষ্টপ্রহর হেঁকে চলেছে, চিচিং ফাঁক, ঝিঙে ফাঁক, তাঁড়স ফক, উচ্ছে ফাঁক। এই সজীৰ কম্পন ঘিরে তৈরি হয়ে আছে একটি চেতন আধার, অবয়বহীন একটা ব্যাপার, যেখানে প্রেম আছে, অনুভূতি আছে, কল্পনা আছে, হিংসা আছে। মাতামহ সেই গাইছিলেন একদিন নেচে নেচে,
এই মানুষে সেই মানুষ আছে
কত মুনি ঋষি চারযুগ ধরে বেড়াচ্ছে খুঁজে ॥
জলে যেমন চাঁদ দেখা যায়
ধরতে গেলে হাতে কে পায়,
তেমনি সে থাকে সদায় আলোকে বসে ॥
এম ডি ঘরে পায়চারি করছেন। টেবিলের ওপর একটা নকশা খোলা, পেপার ওয়েট চাপা। দূরে আর একটা টেবিলে রয়েছে একটি মডেল। মনে হয় কোনও কারখানার। আমি যখন ঘরে ঢুকলুম, এম ডি তখন আমার দিকে পেছন ফিরে, জানলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। জানলার বাইরে একটা কদমফুলের গাছ। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে সাদা সাদা ফুল এসেছে। দুটো হাত পেছন দিকে। মুখ। সামনের দিকে তোলা। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, মেঘলা আকাশের চাপা আলো পড়ে চিকচিক করছে। একমাথা সাদা চুলে তার বৈজ্ঞানিক চেহারাকে বড় স্পষ্ট করে তুলেছে। মাঝে মাঝে এই। মানুষটিকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়। সব থেকেও যেন কিছু নেই। সবেতে থেকেও যেন সবকিছু থেকে অনুপস্থিত।
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াতেই আমাকে দেখতে পেলেন। এমন একটি হাসি খেলে গেল মুখে, যে-হাসির সঙ্গে একঝাক উড়ন্ত শঙ্খচিলের তুলনা চলে।
খুব কাজের লোক হয়েছ, না?
না, তা নয়।
তা নয় মানে? তিন দিন তুমি আমার সঙ্গে দেখা করোনি।
ওই তিন দিনই অফিসে আসতে আমার একটু দেরি হয়েছিল। সোজা ল্যাবরেটরিতে উঠে গিয়েছিলুম।
এদিকে এসো, এই জানলার কাছে সরে এসো। প্রকৃতির খেলা দেখে যাও।
বিশাল জানলা পা থেকে মাথা ছাড়িয়ে উঠে গেছে। কদমগাছের সবুজ পাতা সবুজ আলো ছড়াচ্ছে। এম ডি গাছটা দেখিয়ে বললেন, দেখেছ, সবুজের কী খেলা চলেছে। গাছের ধর্ম দেখো। আমাদের মতোই বয়েস বাড়ে; কিন্তু বৃদ্ধ হতে জানে না। প্রতি বছরই পাতা ঝরিয়ে, আবার নতুন পাতায় সেজে ওঠে। আমরা কেন পারি না পলাশ!
কী জানি? আমরা কেবল বুড়ো হতেই শিখেছি।
দেখেছ, প্রকৃতিতে বার্ধক্য নেই।
সেভাবে দেখলে, মানুষেরও বার্ধক্য নেই, মৃত্যু নেই। ওপর থেকে চলে যাচ্ছে, তলা থেকে ভরে উঠছে।
তা উঠছে। তবে একই মানুষ গাছের মতো বছরে বছরে নবীন হতে শেখেনি।
মানুষের তেমনই অভিজ্ঞতা বাড়ে, জ্ঞান বাড়ে। গাছের মতোই প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন পাতা গজায়।
জ্ঞানপত্র! বলেছ ঠিক, তবে সব মানুষের নয়। এই গাছটাকে আমি কত বছর ধরে দেখছি। এই কারখানার ফিউমসে এতদিনে মরে যাওয়া উচিত ছিল। অসীম জীবনীশক্তি। প্রতি বছরই সবুজ পাতায় সেজে, ফুল ফুটিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গ করে, বৃদ্ধ, তুমি আরও বৃদ্ধ হও, আমি সবুজে সবুজ হয়ে তোমার মৃত্যুর পাশে দাঁড়িয়ে জীবনের কথা বলি।
