কাকিমার গায়ে হাত রাখতেই চমকে উঠলেন। ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসলেন। চোখেমুখে ঘুম জড়িয়ে আছে।
তুমি ঘুমোওনি পিন্টু?
আর ঘুমিয়ে কী হবে? একটু পরেই ভোর। বাবা আপনাকে মুকুর পাশে শুতে বললেন।
ইস ছি ছি, উনি আমাকে এই অবস্থায় দেখে গেলেন!
উনি এ ঘরে আসেননি। আমাকে পাঠালেন। নিন শুয়ে পড়ুন। মশা ঘেঁকে ধরেছে।
ছি ছি, গুরুজনদের বিছানায় শোয়া যায়।
খুব যায়। গুরুজন অনুমতি দিলে সব করা যায়।
আমি বেশ আছি গো। এসব আমার অভ্যাস আছে। কত রাতে তোমার কাকা ঘাড় ধরে ঘরের। বাইরে বের করে দিয়ে, দরজা দিয়ে দিয়েছে। দরজায় পিঠ রেখে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছি। ভোরবেলা দরজা খুলতেই উলটে পড়ে গেছি। কত দুঃখের রাত পার করেছি পিন্টু, এ তো সুখের রাত!
মুকু কেমন একটা শব্দ করল। কাকিমা মশারিতে মাথা ঠেকিয়ে দেখলেন। মুকু আর কোনও শব্দ করল না। স্থির হয়ে গেল।
আচ্ছা কাকিমা, কাকাবাবু যদি হঠাৎ আপনাকে ছেড়ে চলে যান, আপনার খুব দুঃখ হবে?
ছেড়ে যাবে কেন? বিয়ে করা বউকে কেউ ছাড়তে পারে! পুরুষমানুষ একটু এদিক-সেদিক করে, কিন্তু শেষে সেই বউ। বউ ছাড়া সেবা পাবে কোথায়? ভালবাসবে কে? ও চলে গেলে আমাকে তো গলায় দড়ি দিতে হবে। কোথায় গিয়ে দাঁড়াব আমি, কে দেখবে আমাকে! তোমার কাকার সব ভাল, কেবল একটু গোঁয়ার। পেটে দু’কলম থাকলে অমন স্বভাব হত কি! হত না। তা আমারই বা কী ছিল, যে শিক্ষিত ছেলে বিয়ে করবে! ও নিয়ে দুঃখু করলে চলে! ভাগ্যকে মেনে নিতে হয়।
নিন, আপনি শুয়ে পড়ুন। সারাদিন অনেক খেটেছেন। আপনাকে শোয়াতে না পারলে, বাবা আমাকে বকবেন।
আমার কেমন লাগছে পিন্টু!
ওসব লাগালাগি পরে হবে। আগে উঠুন তো।
হাত ধরে টেনে তুলে দিলুম। কাকিমা উঠে দাঁড়ালেন। শুধু শরীর নয়, বেশবাসেও ঘুম লেগেছে। কাকিমা বললেন, তোকে আমার এত ভাল লাগে কেন বল তো! আর জন্মে তুই আমার কেউ ছিলিস, এ জন্মে আবার ফিরে পেয়েছি।
হাত দিয়ে আমার মাথার চুল সরিয়ে দিলেন। মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, বউ হলে পর করে দিবি না তো!
আমি বিয়েই করব না।
যে-ফাঁদে পড়েছিস, বিয়ে না করে পারবি! মেয়েটা ভারী সুন্দর রে, তেমনি স্বভাব। হবে না, কত বড় ঘরের মেয়ে। বটঠাকুরকে বলব, সামনের মাঘেই লাগিয়ে দিন।
নিন তো, মশারিতে ঢুকুন।
আমার সোনা ছেলে।
কাকিমা গাল ধরে নেড়ে দিয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে মশারিতে ঢুকে গেলেন।
১.৪০ এই মানুষে সেই মানুষ আছে
কয়েকদিন ধরে কেবলই মনে হচ্ছে, আমি খুনি। লাশ চাপা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। যে-কোনও মুহূর্তে ধরা পড়ে যেতে পারি। কাকিমাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছি। কাজটা খুব সহজ নয়। কাকিমা আর দুরের মানুষ নন। আমাদের পরিবারেরই একজন। প্রফুল্লকাকার অবর্তমানে এই কাছাকাছি সরে আসা সহজ হয়েছে। পিতাও আর আগের মতো দেখলেই লাফিয়ে ওঠেন না। তফাত যাও ভাবটা সংযত করেছেন। কাকিমা এতদিনে বেশ উতলা হয়ে পড়েছেন। ঘুরতে ফিরতে প্রায়ই জিজ্ঞেস করছেন, কী হল বলো তো! কোনওবার এতদিন তো বাইরে থাকে না। আমার রাতে ভাল করে ঘুম হয় না। দুঃস্বপ্ন দেখি, আর জেগে জেগে উঠি। তুমি একটু খোঁজখবর করো না, পিন্টু। কাকিমাকে এখন আর আমি আপনি বলি না। তুমির সম্পর্কে নেমে এসেছি। কোথায় খোঁজখবর করব, তুমিই বলে দাও। কোথায় গেছেন তুমিই তো জানো না।
ওর যাবার একটা জায়গা আছে। ওই যে সব গাইয়ে মেয়েছেলে আছে না? গাইয়ে মেয়েছেলে অনেক আছে, নাম ঠিকানা না বললে হয়?
তারা সব কলকাতার একটা জায়গায় থাকে। রাতের বেলা সেজেগুঁজে সব বাবুদের গান শোনায়।
তাও জানি। তুমি নাম বলতে পারবে?
না।
তা হলে হয়ে গেল। ওসব জায়গায় ঘরে ঘরে ঘোরার ক্ষমতা কারুর নেই।
কাকিমা উদাস হয়ে কখনও রাস্তার দিকে তাকিয়ে, কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর আমার ভেতরটা কেঁপে কেঁপে ওঠে। মনে হয় আমিই যেন জলজ্যান্ত একটা মানুষকে খুন করে চোরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি।
সুবিধে একটাই, খুব সকালে অফিস, একবার বাইরের জগতে বেরিয়ে পড়তে পারলে, আমায় আর পায় কে! মেসোমশাই মোটামুটি সুস্থ। তবে কনক যদি না ফেরে, ভদ্রলোকের হাসিখুশির দিন আর ফিরবে না। মুকুর কপালের ব্যান্ডেজ খোলা হয়েছে। সামান্য একটু সাদা দাগ আছে, পরে মিলিয়ে যাবে। মেসোমশাই ঠিক করেই ফেলেছেন, সামনের শনিবার, সকালের প্লেনে চলে যাবেন। আর এখানে পড়ে থাকার কোনও মানে হয় না।
মানুষের জীবন নদীর মতো হঠাৎ হঠাৎ কীরকম বাঁক নিয়ে ঘুরে যায়! মুকু যেন হঠাৎ কীরকম বদলে গেছে। সেই গুমোরে ভাব আর নেই। সুযোগ পেলেই কথা বলে। সময় সময় জিনিসপত্র এগিয়ে দেয়। এক গেলাস জল। রুমাল। চিরুনি। মাঝে মাঝে নীচে নেমে গিয়ে কাকিমার সঙ্গে গল্প করে আসে। এই পরিবর্তনটা যদি আগেই আসত। মুকু একটু রোগা হয়ে গেছে। চেহারায় কনকের আদল আসছে।
সেদিন সকালে অফিস বেরোবার আগে মুকু বললে, আর তো আমরা মাত্র দু’দিন আছি, তুমি আমাকে দক্ষিণেশ্বরটা একবার দেখিয়ে আনবে? আর কি আসা হবে! হয়তো হবে না। দিদি যেখান থেকে চিরকালের মতো চলে গেল, সেই জায়গাটা শেষবারের মতো একবার দেখে যাই।
আমি নিয়ে যেতে পারি, তোমার বাবা যাবার অনুমতি দেবেন না।
