বৃদ্ধ বললেন, দেখি, কোথায় যাওয়া যায়।
বৃদ্ধ যেন ছদ্মবেশী ভগবান। পৃথিবীর হালচাল দেখতে বেরিয়েছেন।
বাঁ পাশের অন্ধকার একটা গলিতে, গোটা তিনেক বিড়ির আগুন জ্বলছে আর নিবছে। অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, পা চালাও, পা চালাও।
উলঙ্গ এক পাগলি আঁস্তাকুড়ে ময়লা ঘাঁটছে। কিছু দূরে একটা কুকুর প্রতিবাদে গড়গড় করছে। উত্তর আকাশে পাঞ্জা মাপের একটা তারা ধকধক করছে।
আমাদের বাড়ির সদর দরজা বন্ধ হলেও, ভেতরে আলোর খেলা চলেছে। শুধু পিতা নয়, সকলেই মনে হয় আমাদের অপেক্ষায় জেগে বসে আছেন। কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দিলেন কাকিমা। মাথায় ঘোমটা ছিল না। সন্ধের দিকে তেল দিয়ে চুল বেঁধেছেন। আলো পড়ে খোঁপা চকচক করছে। কপালে সিঁদুরের টিপের অরুণোদয়। কাকাবাবুকে দেখে তাড়াতাড়ি মাথার ঘোমটা টানলেন। একপাশে সরে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, এত দেরি হল?
আমার প্রথম প্রশ্নই হল, কাকাবাবু আসেননি?
কাকিমা বললেন, দাঁড়াও, কোথাও গেলে, অত সহজে কি আসবেন? সব শেষ করে, অরুচি ধরিয়ে আসবেন।
সিঁড়ির মাথা থেকে পিতার গলা ভেসে এল, কী? ফিরেছ?
আমরা তিনজনে একসঙ্গে উত্তর দিলুম, আজ্ঞে হ্যাঁ।
অক্ষয় কাকাবাবু ওপরে উঠতে লাগলেন।
কাকিমা আমার হাত টেনে ধরে বললেন, তোমরা চলে যাবার পর খুব বিপদ হয়েছে।
বুকটা ধক করে উঠল, কী বিপদ?
মুকু পড়ে গেছে।
কোথায়?
নীচের সিঁড়িতে। কপাল ঘেঁতো হয়ে গেছে।
সেকী?
কাকিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। যেন চাঁদের কপালে সূর্য উঠেছে।
ওপরে উঠে বোঝা গেল পিতৃদেব এতক্ষণ অশান্ত পায়ে পায়চারি করছিলেন। কেমন যেন উদভ্রান্তের মতো চেহারা। সারাঘরে একটা আয়োডিন-আয়োডিন, বেনজিন-বেনজিন গন্ধ বেরোচ্ছে। মুকু আমাদের বিছানাতেই চিত হয়ে শুয়ে আছে। কপালে একটা ব্যান্ডেজ।
পিতা ফিসফিস করে অক্ষয় কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, কী? দেখলে?
অক্ষয় কাকাবাবু চাপা গলায় বললেন, না।
থ্যাঙ্ক গড। কী হল কী? এ তো দেখছি বিপদের ওপর বিপদ।
আর বোলো না। খুব বাঁচা বেঁচে গেছে। একে মেয়েছেলে। কপালটা না দাগরাজি হয়ে যায়। বিয়ে দিতে হবে তো!
অনেকটা গেছে!
ভাগ্য ভাল। স্টিচ পড়েনি। ডাক্তারবাবু বলে গেলেন, তেমন কোনও ভয় নেই।
হরিদা, আমি তা হলে চলি।
পাগল নাকি! এই রাতে তুমি যাবে কোথায়! তুমি আজ এইখানে থাকবে। কাল সকালে আমার সঙ্গে অফিস যাবে।
আমি থেকে যেতে পারি, কিন্তু আপনাদের যদি কোনও অসুবিধে হয়।
আমাদের অসুবিধে। তুমি হাসালে অক্ষয়।
কাকিমা অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, বললেন, আমি আপনার জন্যে খাবার তৈরি করেছি।
পিতা বললেন, তুমি এত বড় একটা খবর আনলে, এইসব ছোটখাটো দুর্ঘটনা না থাকলে, আজ তো আনন্দের দিন।
কী যে আনন্দের দিন সে তো আমি জানি। যে-দুঃসংবাদ আমি চেপে রেখেছি, তা যদি কোনওরকমে একবার প্রকাশ পায়, এই বাড়ি কেঁপে যাবে। কী যে হবে আমার জানা নেই।
কাকিমা বললেন, আপনারা তৈরি হয়ে নিন, খাবার জোগাড় করি। এরপর খেলে শরীর খারাপ হবে।
পিতা বললেন, আমার জন্যে খুব সামান্য। অনেক বেলায় খেয়েছি। এবেলা না খেলেই ভাল হয়।
কাকিমা বললেন, মশারিটা ফেলে দিই। মেয়েটা ঘুমোচ্ছ। ওকে আর না জাগানোই ভাল। এখানেই ঘুমোক। আপনাদের আমি আলাদা বিছানা করে দিই।
হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই ভাল। বিনয়দাকে আজ আর নতুন কোনও চিন্তায় না ফেলাই ভাল। সন্ধের থেকে ভদ্রলোক আরামে ঘুমোচ্ছেন। ঘুমই ওনার ওষুধ।
কাকিমা আমার পিঠে টোকা মেরে আড়ালে ডাকলেন।
তোমার কী হয়েছে গো!
কই কিছুই তো হয়নি।
তা হলে তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
এতটা পথ হেঁটে এলুম না! বাসট্রাম সব বন্ধ হয়ে গেছে না!
তুমি হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় ছেড়ে নাও।
এই তো নিচ্ছি।
অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, আমি চান করব।
এত রাতে তুমি চান করবে অক্ষয়!
আপনি তো জানেন, সারাদিন আমি বারেবারে চান করি। আমার গরম একটু বেশি।
যাও, তা হলে ঝট করে সেরে নাও।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সারাবাড়ি গাওয়া ঘিয়ের গন্ধে আমোদিত হয়ে উঠল। গভীর রাতে এমন ভোজনের আয়োজন একমাত্র এই ভুতুড়ে বাড়িতেই সম্ভব। এ বাড়ির প্রতিটি ইট ইতিহাসের সাক্ষী। কত ঘটনাই দেখেছে! আরও কত ঘটনা দেখবে।
রান্নাঘরে মধুর এক নাটক চলেছে। কাকিমার বাধা শোনেননি পিতা। বসে গেছেন লুচি বেলতে। এক হাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে, দু’হাত চাই। এসব কাজে তিনি সিদ্ধহস্ত। রাতের আকাশ দেখে মনে হচ্ছে, একটু পরেই পাখি ডেকে উঠবে।
হলঘরে পরপর তিনটে বিছানা পড়েছে। অক্ষয় কাকাবাবু চিত হয়ে বুকের ওপর হাত জড়ো করে শুয়েছেন। পিতাপুত্রে জেগে শুয়ে আছি। সহজে কি ঘুম আসে!
পিতা বললেন, একেই বলে সাধকের ঘুম। শুল আর ঘুমোল। তোমার কাকিমার আজ খুব ধকল গেল। ও ঘরে মুকুর মাথার কাছে হয়তো ঠায় জেগে বসে আছে। বিছানা বেশ বড় আছে, দু’জনের বিছানা। তুমি গিয়ে বলে এসো, পাশে শুয়ে পড়তে। না বললে হয়তো ওই মাটিতেই পড়ে থাকবে। শেষরাতে মশা বাড়ে। ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। মায়ের জাত, ওদের কথাও একটু ভাববে। স্বার্থপর হলে চলে না।
মুকুর মাথার কাছে একটা চেয়ারে কাকিমা বসে আছেন। মাথাটা পাশে হেলে পড়েছে। হাতদুটো দু’পাশে এলিয়ে আছে। সারাঘরে বিনবিন করছে মশা। এত ক্লান্তি, মশকদংশনেও সাড় নেই। এত অসহায়! প্রাণটা কেমন যেন করে ওঠে। এ দেশের মহিলাদের জীবনের যেন কোনও ছিরিছাদ নেই। ভাগ্যনির্ভর। হাসালে হাসি, কাদালে কান্না।
