আমি লক্ষ করিনি। অক্ষয় কাকাবাবুর নজরে পড়েছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো নেমে এসেছে। নীচে। রাতের দিকে পৃথিবীটা কেমন যেন ধোঁয়াধোয়া হয়ে ওঠে। মিলটনের নরকের মতো। সেই আলোকিত ধোঁয়ার বৃত্তে, দু’পাশে দু’হাত ছড়িয়ে একজন মানুষ ভূমিকম্পের জমিতে গোল হয়ে ঘুরছেন। মাঝে মাঝে উলটে পড়ে যাবার মতো হচ্ছে।
কাকাবাবু এগিয়ে গেলেন। দোসর আমি পেছনে। কাছে গিয়ে শুনতে পেলুম, লোকটি অস্পষ্ট জড়ানো গলায় বলছেন, শালা কোন দিকে, উত্তরে, দক্ষিণে, পুবে, পশ্চিমে? বল, শালা কোন দিকে?
কাকাবাবু লোকটিকে ধরে ফেললেন। চড়া গলায় বললেন, কী কোন দিকে?
এই যে বাওয়া বিবেক, আমার বাড়িটা কোন দিকে? আমার সেই সাতমহলা মার্বেল প্যালেস।
কাকাবাবু পশ্চিম দিকে মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন, এই দিকে।
লোকটি মেয়েলি গলায় বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ ব্যাটা হনুমান।
ডাইনে বাঁয়ে, ফাঁক ফাঁক পা ফেলতে ফেলতে লোকটি কঁচি সিগারেটের মতো অন্ধকারে চলতে লাগলেন। অনিশ্চিত যাত্রা। জড়ানো গলায় টপ্পার সুরে গান ধরেছেন, বিধুমুখী, তোমায় সাজাব যতনে, মাইরি বলছি, সাজাব যতনে।
উনি কোথায় চললেন কাকাবাবু?
থানার দিকে। মুখটা সেইদিকেই ঘুরিয়ে দিলুম। তবু প্রাণে বাঁচুক। এরপর তো গুন্ডার হাতে পড়বে। নয়তো মাতাল ড্রাইভারের চাকার তলায়। লোকটার হাতে গোটা তিনেক আংটি রয়েছে। খুব টেনেছে, বুঝলে।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
রাত বড় মজার সময়, পিন্টু। দিনের বাঁধন আলগা হয়ে পড়ে। নাও নাও, পা চালাও! কুইক মার্চ। তোমার তো এসে গেল, আমাকে এখনও কত দূর যেতে হবে জানো! বালির ব্রিজটা কী হয়ে আছে। একবার চিন্তা করো, রাতের আতঙ্ক। পারবে তুমি এখন ওই ব্রিজের ওপর দিয়ে একা একা যেতে?
আজ্ঞে না।
কী তুমি পুরুষমানুষ হয়েছ? ভয়কে জয় করো। তা না হলে জীবনের কাছ থেকে কিছুই পাবে না। সে কী দৃশ্য, ভাবতে পারো! বহু নীচে গঙ্গা বয়ে চলেছে। চারপাশ অন্ধকার। দক্ষিণেশ্বরের মন্দির। রেল কোয়ার্টারের বাড়ি। একের পর এক ব্রিজের আর্চ চলে গেছে এপার থেকে ওপারে। সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে পড়ে আছে একজোড়া রেললাইন। পারবে না তুমি?
আজ্ঞে না। আমি ভীষণ ভিতু। এমনিই আমি রাতকে ভীষণ ভয় পাই, তার ওপর আছে ভূতের ভয়, বদমাইশ লোকের ভয়, এমনকী ভগবানকেও আমি ভয় পাই। জ্যোতির্ময় মূর্তি ধরে সামনে এসে তিনি যদি দাঁড়ান আমার দাতে দাঁত লেগে যাবে।
নাঃ, তোমার যে কী হবে!
আপনি তো আমার হাত দেখেছেন। অনেক কথাই বলেছেন, অনেক কথাই চেপে গেছেন।
চেপে গেছি, কী করে বুঝলে?
আমি জানি। এমন কিছু বলার আছে, যা বাবার সামনে বলা যায় না।
ধরেছ ঠিক। তোমার হাতটা বড় অদ্ভুত। এক দিকে প্রচণ্ড ভোগী, অন্য দিকে সাংঘাতিক ত্যাগী। একই সঙ্গে জ্ঞানী, আবার নির্বোধ। একই আধারে বসে আছে শিশু আর পণ্ডিত। কখনও জ্ঞানীর মতো কথা বলবে, কখনও নির্বোধের মতো। একই সঙ্গে লম্পট ও সন্ন্যাসী। অনেকটা চন্দ্রের মতো। পনেরো দিন অন্ধকারে, পনেরো দিন আলোয়!
বাবা, এ তো দেখছি সাংঘাতিক হাত। বিপজ্জনক চরিত্র।
তোমার জীবন সম্পর্কে আমার নিজেরই ভীষণ কৌতূহল। দূর থেকে তোমাকে দেখে যাব। আমি আছি। প্রায় পঁচানব্বই বছর থাকব। তুমিও থাকবে, তোমার আয়ু নেহাত কম নয়। জোর করে কিছু করতে যেয়ো না। দৈবশক্তির ওপর নিজেকে ছেড়ে দাও। দেখো না কী হয়।
সেটা কি ঠিক হবে?
আরে সেইটাই তো মজা! এই সন্ন্যাসী, এই প্রেমিক। কখনও গুহায়, কখনও প্রমোদকাননে। কখনও বৃদ্ধ, কখনও কৃষ্ণ। একটা কথা আমি স্ট্যাম্প পেপারে লিখে দিতে পারি, মেয়েরা তোমাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে। সব বয়েসের মেয়েরা।
বাঁচার উপায়?
মৃত্যু।
রাত কাঁপিয়ে রাস্তা কাঁপিয়ে অক্ষয় কাকাবাবু হেসে উঠলেন। পথের ধারের একটা দোতলা বাড়ির বারান্দা থেকে এক বৃদ্ধা আকুল গলায় বললেন, কে যায়, জীবন নাকি?
অনেকটা ভেতর থেকে পুরুষালি গলায় ধমক ভেসে এল, আঃ, চুপ করে শুয়ে থাকো। ঘুমোতে পারছ না?
বৃদ্ধা টেনে টেনে বললেন, আঃ, মধুসূদন!
অন্ধকারে ভাল দেখা যাচ্ছে না। বারান্দায় সারি সারি অর্কিডের টব ঝুলছে। সাদামতো কী একটা রেলিং-এর পাশে জবুথবু হয়ে রয়েছে। অক্ষয় কাকাবাবু তাড়া লাগালেন, পা চালাও, পা চালাও।
মোড়ের মাথায় বেশ বড়সড় একটা পানবিড়ির দোকান রাতকে মাত করে রেখেছে। বিশাল আয়নায় আলো মুখ দেখছে। পেতলের পান-সিংহাসন ঝকঝক করছে। কোলে কুলো নিয়ে পাশাপাশি তিনটি লোক দুলে দুলে বিড়ি বাঁধছে। একটা হাঙড়ায় রেডিয়োয় দূরের কোনও কেন্দ্র বাজছে। শব্দ মাঝে মাঝে ঝাঁপসা হয়ে যাচ্ছে। থেকে থেকে চোঁচা, কেঁকা আওয়াজ হচ্ছে। দোকানের সামনের বেঞ্চে গুন্ডা-গুন্ডা চেহারার দু’জন লোক বসে আছে। মনে হয়, সাদা পোশাকের পুলিশ। পাশেই অন্ধকারমতো একটা বাড়ির দোরগোড়ায় একজন মহিলা দাঁড়িয়ে।
আরও কিছু দূর এসে একজন বৃদ্ধ পথিককে পাওয়া গেল। সামনে শরীর ভেঙে লাঠি ঠুকঠুক করে টুকটুক করে চলেছেন। হাঁটার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, গন্তব্য পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। রাত চলেছে, মানুষ চলেছে। আমাদের দেখে বৃদ্ধ বললেন, বাবুমশায়, একটা বিড়ি হবে?
কাকাবাবু বললেন, না।
নস্য?
না।
এক আনা পয়সা?
পকেট থেকে একটা আনি বের করে বৃদ্ধের হাতে ধরিয়ে দিলুম। কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, যাবে কোথায়?
