এই ক’দিন একটু বিশ্রাম পাওয়া গেল। শরীর ঢকঢকে হয়ে আছে। সবসময় ঘুম পাচ্ছে। মনের দেয়ালে আরাম হারাম হায় বাণীটি সবসময় ঝোলানো থাকলেও, শুলে উঠতে ইচ্ছে করে না, বসলে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না। বেশ ঘুমঘুম চোখে, হাই তুলে তুলে দিন কাটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আকাশ, গাছের পাতা, পাখি, রাস্তায় মানুষের স্রোত দেখে দেখে ক্রমশই দার্শনিক হয়ে উঠছি। আমি চাই না মাগো রাজা হতে। উঠতে গেলে হাত পা কাপে। বেশ আছি মা এলিয়ে বসে!
দোতলার বারান্দা। জানলার কাছে বেঞ্চ পাতা। দেয়ালে পিঠ। ঠ্যাং দুটো সোজা ছড়ানো। পায়ের পাতার ওপর পাতা। বাঁ পাশে টেবিল। টেবিলের ওপর বাঁ হাত আলগোছা ঝুলছে। এক বিঘত দূরে একটি বই, রজেটস থেসারস। একটি ইংরেজি কাগজ। কর্মখালির বিজ্ঞাপনের পাতায় এখানে-ওখানে লাল পেনসিলের ঢ্যাঁড়া মারা। কর্মস্থলে যাবার আগে দুটি নির্দেশ আমার জন্যে রেখে গেছেন। থেসারস মুখস্থ করে যাও। ওই বিদ্যেটি তো ভালই জানা আছে। অঙ্কের মগজ থাক আর না-থাক। ইংরেজিটা যদি ভাল করে রপ্ত করতে পারো, তা হলে কোনওমতে দু’বেলা দুটো অন্ন হয়তো জুটবে। পিতার হোটেল চিরকাল ভোলা থাকবে না রে দামড়া। দ্বিতীয় নির্দেশ, ঢ্যাঁড়ামারা জায়গায় চিঠি ছেড়ে যাও। বলা যায় না লাগলেও লেগে যেতে পারে। যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো ভাই, মিলিলেও মিলিতে পারে পরশপাথর। দুটো কাজই বেশি এগোয়নি। আকাশে মেঘের ফর্মেশনে হিমালয়। শরীরে তাগত এলেই, একদিন উড়বে সাধের ময়না। মাটির চেয়ে আকাশ কত উদার! এখানে কচু, ঘেঁচু, মুলো, ময়লা, আবর্জনা, গোঁফ, দাড়ি, ঘামের গন্ধ, তিরস্কার। ওপরে, ট্রপোস্ফিয়ার, আয়নোস্ফিয়ার, ইথার, ওজোন, মেঘ, পাখি, মহাওঙ্কারধ্বনি। নীচে ভাগাভাগি, মারামারি, পাঁচিল তোলাতুলি, পার্টিশন, ডিক্রি। অস্থির পঞ্চম অবস্থা।
রাস্তার দিকেই চোখ ছিল। একটা গাড়ি আসছে। আমাদের বাড়ির সামনেই থামল। এই ভূতমহলে, অসময়ে, বিনা নোটিশে কার আগমন রে বাবা! দরজা খুলে সামনের আসন থেকে যিনি নামলেন, তার চেহারা ডবলডিমের ওমলেটের মতো। সাদা জিনের প্যান্ট, হাফহাতা সাদা জামা, মাথায় একটা শোলার টুপি। মুখ দেখা যাচ্ছে না। সামনে ভুড়ি ঠেলে আছে আধ হাত। জল-ভরা বেলুনের মতো থিরিথিরি নাচছে। বাড়ির ঠিকানা দেখে হুংকার ছাড়লেন, হ্যাঁ, এই তো সাতান্ন নম্বর। ঠিক এসেছি। নেমে আয়।
নেমে আয় বলামাত্রই আমি পা গুটিয়ে নিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছি। কে নামে, কে নামে! পেছনের আসন থেকে একটা পা ঝুলে পড়ল। সুন্দর মনোহর লেডিজ স্লিপার। ফুলফুল শাড়ির প্রান্ত। সর্বনাশ! মহিলা। একজন নয়, ওয়ান আফটার এনাদার, দু’জন। বুড়ি নয়, যুবতী। খেল খতম, পয়সা হজম। নির্জন বাড়িতে বেঞ্চে বসে দেয়ালে পিঠ দিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় হবার বারোটা বেজে গেল। বুকের মধ্যে ভয় হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে। কী করে সামলাব এই অপ্সরাদের। জিভ উলটে টাগরায় গিয়ে ঠেকেছে। মেয়ে দেখলেই আমি অবশ হয়ে পড়ি। খাটের তলায় কি জালার কোণে ঢুকে লুকোতে ইচ্ছে করে। আমি তো সুখেন নই।
সদরের কড়া নড়ে উঠল। মাথায় টুপি থাকায় ভদ্রলোক আমাকে দেখতে পাননি। টুপির কার্নিসে দৃষ্টি ঠোক্কর খেয়েছে। মেয়েদুটি ওপরে চোখ ঘুরিয়েই আমাকে দেখে ফেলেছে। আমার ছাগলদাড়ি, শীর্ণ ঘোড়ার মতো মুখ, দুটো ড্যাব ড্যাবা নির্বোধের মতো চোখ, বকের মতো গলা। এমন ভজুয়া-মার্কা চেহারা আর দুটি নেই।
সদর খুলে সামনে দাঁড়াতে হল। ভদ্রলোক টুপি খুলে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি? হরিবাবুর ছেলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাবা কোথায়?
অফিসে।
জানতে আমরা আসব?
আজ্ঞে না।
একটা চিঠি পাওনি তোমরা?
না তো!
তা হলে জানো না আমরা কে?
আজ্ঞে না।
না জানাই স্বাভাবিক।
চৌকাঠের এপারে আমাকে সাসপেন্সে রেখে ভদ্রলোক ড্রাইভার আর মেয়েদের বললেন, এই সামান উতারো। মেয়ে দুটির নজর আর আমার ওপর নেই। একবারই চোখে চোখে ঠোকাঠুকি হয়েছিল। এমন কিছু দর্শনীয় বস্তু নয়। অনেকটা রামছাগলের মতো। চারটের বদলে দুটো কেঠো কেঠো লিকলিকে পা। বরং বাড়িটা দর্শনীয়। নাম্বার ওয়ান নাম্বার টু-কে চোখ উলটে বললে, দেখেছিস মুকু, বাড়িটা কী ভীষণ পুরনো। ঘাড়ে ভেঙে পড়বে না তো!
যাক, একজনের নাম জানা গেল মুকু। পরক্ষণেই জানা গেল আর একজনের নাম, কনক। ভদ্রলোক ভেতরে থেকে একটা সুটকেস বের করে বললেন, দাঁড়িয়ে থেকো না কনক। সাহায্য করো, সাহায্য করো।
মুকু ছোট, কনক বড়। মুকু খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বললে, দিদি, এ যেন স্বর্গের সিঁড়ি রে। দু’জনেরই হাতে মালপত্র। আমার ভাগে পড়েছে সুন্দর একটি বেতের বাস্কেট। জীবনে এমন বস্তু দেখিনি, দেখবও না। সর্ব অঙ্গে কারুকাজ। পিতার ভাষায় বলতে হয়, আহা, একটা ওয়ার্ক অফ আর্ট। নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে, মন খারাপ করে ঘণ্টাখানেক বসে থাকো। অনুশোচনায় অন্তশুদ্ধি হয়।
দোতলার বারান্দায় মালপত্তর এসে জমল। বেশি কিছু না, গোটা তিনেক সুটকেস, একটা বেডরোল, বিশাল একটা স্টিল ট্রাঙ্ক। ওপরে আনতে ভদ্রলোক আর গাড়ির ড্রাইভার হিমশিম খেয়ে গেলেন। রিয়েল মাল যদি কিছু থাকে তো ওর মধ্যেই আছে। আরও গোটা দুই বেতের বাস্কেট আর হাতব্যাগ। দুই বোন, একবার এদিকে ফিরছে, একবার ওদিকে ঝুঁকছে। একবার এটা তুলছে, ওটা নামাচ্ছে। চুলের বেণি চাবুকের মতো, গোরুর ন্যাজের মতো সপাসপ ডাইনে বাঁয়ে দোল খাচ্ছে। কথায় বলে, আহা, তিনি যেন ঘর আলো করে বসে আছেন! সত্যিই তাই। দুই বোন যেখানে যাচ্ছে, যেদিকে ছুটছে সেই দিকটাই আলো হয়ে যাচ্ছে। অমাবস্যা আর পূর্ণিমার একই সঙ্গে আবির্ভাব। স্বামী ঘুটঘুটানন্দের হাত ধরে দুই ফুটফুটান। এখন বেশ গলা ছেড়েই গাওয়া যায়, আমার ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো কে দেখবি আয়।
