অপর্ণা বললে, দিদা, তাড়াতাড়ি ছেড়ে দাও, অনেক রাত হয়েছে, বাড়ি ফিরবেন।
বৃদ্ধা আসন ছেড়ে উঠলেন। প্রসাদের থালা থেকে ধবধবে সাদা সন্দেশ তুলে আমাদের হাতে দিলেন। মুখে কোনও কথা নেই। মৃদু হাসি লেগে আছে। দু’চোখে জলের ধারা সমানে বইছে। বেশ বোঝাই গেল আবেগে রুদ্ধকণ্ঠ।
ফিরে আসার পথে অপর্ণা বললে, আমাদের ঠাকুর বড় জাগ্রত। দিদার নানারকম দর্শন হয়। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমরা গভীর রাতে মাঝে মাঝে বাঁশির শব্দ শুনি। এই দেখুন, বলতে বলতে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে।
অপর্ণা তার হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। কী করব, প্রথমে আমার মাথায় এল না। হ্যাঁ, তাই তো তাই তো বলে ছেড়ে দিলে, লঘু করা হয়। তাই কম্পাউন্ডার যেভাবে ইন্টারভেনাস ইঞ্জেকশন দেয়, সেই কায়দায় দু’হাতে সেই সুন্দর হাত ধরে, ত্বকে ভাবাবেগের কাটা দর্শন করলুম। একেই বলে ভাগ্য। কেউ ঈশ্বর দেখেন, কেউ অতীন্দ্রিয় ধ্বনি শোনেন। আর কেউ সুন্দরীর দেহত্বকে কাটা দর্শন করে, হায় হায় করে। ওপাশে মৃত্যু শুয়ে আছে মর্গে, এপাশে যুবতীর দেহবল্লরী।
অপর্ণার হাত সাবধানে ধীরে ধীরে তার দেহের পাশে নামিয়ে রাখলুম। ধপাস করে ছেড়ে দিতে সাহস হল না। এসব ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা বড় কম। পুতুলে মানুষে তফাত বুঝি না। শুনেছি বিখ্যাত এক বিদেশি শিল্পী সারাজীবন শুধু এঁকে গেছেন নানা ভঙ্গিমায়।
অপর্ণা বললে, এই দেখুন আমার গালেও কীরকম কাটা দিয়েছে।
একটা গাল আমার চোখের কাছাকাছি নিয়ে এল। মনে হল আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে দেখি, সাহস হল না। নিজের ভেতরে ডামাডোলের শব্দ পেলুম। বুকে যেন ঢাক বাজছে।
নীচের ঘরে তিনজনে ঝিমিয়ে পড়েছেন। আরও পড়তেন, যদি না অপর্ণার মা কথায় কথায় বেশ মশগুল করে রাখতেন।
সরোজবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, কী করবে তা হলে?
কিছুই ভেবে না পেয়ে বললুম, আজ থাক।
সেটা কি ঠিক হবে? তুমি অত ভয় পাচ্ছ কেন? ওনার স্ত্রীকে একবার নিয়ে এলেই তো হয়।
না, না।
না, না আবার কী? স্বামী মারা যেতে পারে জেনেই তো মেয়েরা বিয়ে করে। প্লেন ভেঙে পড়তে পারে জেনেই তো মানুষ বিমানে চড়ে। স্টোভ ফাটতে পারে জেনেই তো মানুষ পাম্প করে।
তা হলেও যতটা দেরিতে জানা যায়।
যা ভাল বোঝো করো।
সরোজবাবু বেশ অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সেইভাবেই উঠে দাঁড়ালেন, আমি তা হলে চলি।
পঙ্কজবাবু বিনীতভাবে বললেন, প্রয়োজন হলে যেন সাহায্য পাই।
সেই ঘড়ি, কোথায় আছে জানি না, গম্ভীর সুরে বাজতে লাগল। রাত এগারোটা।
পঙ্কজবাবু বললেন, সর্বনাশ! অনেক রাত হয়ে গেল। ইস, হরি ভীষণ ছটফট করছে। এই তোমার জন্যেই দেরি হল।
অপর্ণার মা বললেন, কী এমন রাত! গ্রীষ্মকাল, এই তো সবে সন্ধে।
পঙ্কজবাবু বললেন, চলো চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
আমি বললুম, না, না, আপনাকে আর কষ্ট করে যেতে হবে না। আবার এতটা পথ একা একা ফিরতে হবে।
অক্ষয়বাবু বললেন, কোনও প্রয়োজন নেই। ভাববেন না। ছেলেদের একটু সাহসী করুন। আমি ওই পথেই ফিরব, পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছি।
বাগানের পথ দিয়ে হেঁটে চলেছি। রাতকা রানি গন্ধে একেবারে পাগল করে দিচ্ছে। কোথাও কেউ ঠুমরি গাইছে।
১.৩৯ রক্তের অক্ষরে অবিশ্রাম
শেষ বাস চলে গেছে। অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, হাঁটতে পারবে পিন্টু?
খুব পারব, কাকাবাবু।
সবে সাবালক হয়েছি, ধরা তো আমার কাছে এখন সরা বিশেষ। পারলে বিশ্বটাকে অ্যাটলাসের মতো বুকে চেপে ধরে, তার ঘোরাটাও বন্ধ করে দিতে পারি।
কাকাবাবু বললেন, তা হলে পা চালাও। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাব। হরিদা ভীষণ ছটফট করছেন। আমি দেখতে পাচ্ছি, তিনি একবার করে ঘরে ঢুকছেন, একবার করে বারান্দায় বেরিয়ে আসছেন।
প্রায়-নির্জন রাস্তায় দু’জনে হনহন করে হাঁটতে লাগলুম। কাকা ভাইপোতে যেন ওয়াকিং : কম্পিটিশন হচ্ছে। আমি হাঁটছি সামান্য সামনে ঝুঁকে, কাকাবাবু হাঁটছেন খাড়া সোজা হয়ে, অনেকটা নেচে নেচে। দম ফুরিয়ে যাবে বলে আমরা কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলছি না। সামনে পড়ে আছে। ট্রামলাইন। লকলক করে চলে গেছে দূর থেকে দূরে। অনেকটা মানুষের লাভের মতো, মানুষের আকাঙ্ক্ষার মতো।
রাস্তা ক্রমশই পেছিয়ে পড়ছে। একটু আগে কারা বোধহয় শ্মশানের দিকে মৃতদেহ নিয়ে গেছে। কালো পিচের রাস্তায় সাদা সাদা খই ছড়িয়ে আছে। বাতাসে উড়ে উড়ে যাচ্ছে এপাশ থেকে ওপাশে। চলে-যাওয়া মানুষের ফেলে-যাওয়া অসংখ্য দিনের মতো। ওড়া খই দেখে আবার সেই মর্গের কথা মনে পড়ল। সাধুবাবু এক একটা ট্রে টানছেন, এক একটি মৃতদেহ বেরিয়ে পড়ছে। বিভিন্ন বয়েস, বিভিন্ন আকৃতি। মুখে লেগে থাকা বিভিন্ন প্রকারের মৃত্যুযন্ত্রণার চিহ্ন। কেউ মরেছেন আতঙ্ক নিয়ে, কেউ গেছেন বিষণ্ণতা নিয়ে, কেউ যেন হাসিমুখে মায়ের কোলে উঠে গেছেন। আমি ঠিকই দেখেছি। ও মৃতদেহ প্রফুল্লকাকা ছাড়া আর কারুর নয়। আর কারুর হলে কাকিমার দুঃখের ষোলোকলা পূর্ণ হবে কী করে! সেই মারনেওলা ভগবান বসে আছেন কোন ওপরে। অসংখ্য তারার চোখে সৃষ্টিকে দেখছেন, ঝুলিয়ে দিচ্ছেন ফরমান, একে মারো, ওকে আধমরা করে রাখো। একে হাসাও ওকে কাঁদাও।
চলতে চলতে কী করতে চাই, পরিকল্পনা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। অভিশপ্ত বাড়ি। কোনও সন্দেহই নেই। যে আসে সেই ভোগে। একটানা-একটা কিছু তাকে দিতেই হবে। হয় নিজেকে, না হয় নিজের কোনও আপনজনকে। অদৃশ্য মহাকাল সিংহাসনে বসে আছেন। রক্তের অক্ষরে অবিশ্রাম লিখিতেছে বৃদ্ধ মহাকাল বিশ্বপত্রে জীবের ক্ষণিক ইতিহাস। হত্যা অরণ্যের মাঝে, হত্যা লোকালয়ে, হত্যা বিহঙ্গের নীড়ে, কীটের গহ্বরে, অগাধ সাগরজলে, নির্মল আকাশে, হত্যা জীবিকার তরে, হত্যা খেলাচ্ছলে, হত্যা অকারণে, হত্যা অনিচ্ছার বশে, চলেছে নিখিল বিশ্ব হত্যার তাড়নে, ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রাণপণে, ব্যাঘ্রের আক্রমণে, মৃগসম মুহূর্ত দাঁড়াতে নাহি পারে। মহাকালী কালস্বরূপিণী, রয়েছেন দাঁড়াইয়া তৃতীক্ষ লোলজিহ্বা মেলি, বিশ্বের চৌদিক বেয়ে চির রক্তধারা, ফেটে পড়িতেছে, নিষ্পেষিত দ্রাক্ষা হতে রসের মতন, অনন্ত খৰ্পরে তাঁর। এই মহাকালকে ফাঁকি দিতে হবে। প্লটের যেমন কাউন্টার-প্লট। এসপিয়নেজের যেমন কাউন্টার-এসপিয়নেজ। কাকিমাকে কিছুই। বলা চলবে না। ইচ্ছে করেই বলব না। একজন মানুষ যদি না ফেরেন, তা হলে তার জন্যে চোদ্দো বছর অপেক্ষার বিধান আছে শাস্ত্রে। যা হবার হবে তার পর। চোদ্দো বছর দীর্ঘ সময়। এই সময়টুকু কাকিমা অপেক্ষায় অপেক্ষায় কাটিয়ে দিন। বৈধব্য স্পর্শ করবে না। একটা উদ্বেগ থাকবে, ক্রমশই শূন্যতা সহনীয় হয়ে উঠবে। শোক আর কাবু করতে পারবে না। ভরণপোষণ? একজন মানুষের দায়িত্ব আমরা নিতে পারব না! খুব পারব। পিতাপুত্রের রোজগারে হেসেখেলে চলে যাবে।
