দু’জনে মুখোমুখি বসলুম।
অপর্ণা বললে, মর্গে গিয়েছিলেন বলে চান করেছেন? হঠাৎ মর্গে গেলেন?
ওই যে কনক। একটা ছবি দেখে সন্দেহ হয়েছিল। তবে সে কনক নয়, কিন্তু আর একটা সাংঘাতিক জিনিস দেখে এলুম। কাকিমার স্বামীর মৃতদেহ।
যাঃ, তা কী করে হয়! তিনি ওখানে কী করতে যাবেন? তিনি তো কোথায় যেন বাজাতে গেছেন।
আমি স্বচক্ষে দেখলুম, তিনি ওখানে শুয়ে আছেন।
বলতে বলতে কাকিমার মতো একজন সুন্দর মহিলার অসহায় অবস্থার কথা ভেবে গলা ধরে এল। অপর্ণার দু’চোখে জল টলটল করছে।
ধরাধরা গলায় বললুম, কী হবে অপর্ণা!
অপর্ণার চোখের জল গালে নেমে এসেছে। অতি কষ্টে বললে, আপনি দেখলেন কেন?
ইচ্ছে করে দেখিনি, হঠাৎ বেরিয়ে এল।
ইস! ছিছি। এই তো একটু আগে রাঁধলেন, খাওয়ালেন। আমরা লুডো খেললুম বসে বসে। কী হবে তা হলে?
আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না, অপর্ণা। আমার কী করা উচিত ভেবে পাচ্ছি না। আচ্ছা, আমি কি ভুল দেখলুম, অপর্ণা?
হ্যাঁ, তাও হতে পারে। অনেক সময় একই রকম দেখতে দু’জন লোক থাকে। হয়তো যমজ নয়; কিন্তু চেহারায় অদ্ভুত মিল।
অপর্ণার মা এলেন। দু’জনকে পাশাপাশি দেখলে মনে হয়, ছোট অপর্ণা, বড় অপর্ণা। তাঁর পেছনে আর একজন মহিলা, হাতে ট্রে, একটা শরবতের গেলাস বসানো তার ওপর। যেন কুয়াশা তরল টলটল করছে গেলাসে। অপর্ণার মা অবাক হয়ে আমাদের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, কী হয়েছে রে? দু’জনে কাদোক্কাদো মুখে বসে আছিস?
অপর্ণা আঁচলে চোখ মুছে বললে, কিছু হয়নি, মা।
তোরা আমার চোখকে ফাঁকি দিবি? নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। প্রভা, ওটা আমার হাতে দিয়ে তুমি যাও।
প্রভা ট্রে-টা সাইড টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে চলে গেল। আমার স্বভাবটা আবার মেয়েদের মতো। পেটে কথা রাখতে পারি না। বেরোবার জন্যে দরজার কাছে মুখিয়ে বসে থাকে।
অপর্ণার মা আমার ডান পাশের সোফায় বসে বললেন, কী হয়েছে বাবা! তোমার চেহারা দেখে প্রথম থেকেই কেমন যেন মনে হচ্ছে। গেলে একরকম, ফিরে এলে আর একরকম। চুল উসকোখুসকো, জামা ভিজেভিজে। কী হয়েছে বলল, আমাকে লুকিয়ো না। বুড়ি, তুই ট্রে-টা এনে সামনে ধর।
এই প্রশ্নটার জন্যেই অপেক্ষা করেছিল আমার জমা কথা। হুড়হুড় করে বেরোতে লাগল। সব শুনে মা বললেন, কী সর্বনাশ! তুমি ঠিক দেখেছ তো!
অপর্ণা বললে, আমিও সেই কথাই বলছি, অনেক সময় দেখার ভুল হয়। দু’জন লোককে একই রকম দেখতে হয়। আর একবার ভাল করে দেখে এলে হয়।
না, ওখানে গিয়ে দরকার নেই। ও যদি হঠাৎ ওখানে না যেত, তা হলে কী হত?
কিছুই হত না।
ব্যস, সেইরকম কিছুই হবে না।
ওই কাকিমার কী হবে? তিনি তো কিছুই জানতে পারবেন না।
আর তুমি জানাবার পর যদি দেখা যায়, তোমার দেখার ভুল, তা হলে কী হবে? আজ রাতে আর হইচই করে দরকার নেই। ওঁদের ওপর ছেড়ে দাও। ধীরেসুস্থে সব খবর নিন।
অপর্ণা বললে, সেই ভাল। দুঃসংবাদ যত দেরিতে জানা যায়।
পঙ্কজবাবু ঘরে এলেন, বলতে বলতে আসছেন, রাত বাড়ছে, এখনও অনেক কাজ বাকি।
অপর্ণার মা বললেন, ছটফট কোরো না তো। এখানে স্থির হয়ে বোসো। আমি সব শুনেছি।
শুনেছ? পঙ্কজবাবু হাপ ছেড়ে বাচলেন। হাতপা ছড়িয়ে বসে পড়লেন খালি সোফায়।
বললেন, নীচে ওঁরা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
ব্যস্ত হলে তো চলবে না, ভেবেচিন্তে ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে। আজকের রাতটা চলে যেতে দাও। সরোজবাবু আর অক্ষয় ঠাকুরপোকে বলো সব খবর নিতে। পুলিশের খাতা দেখলেই বেরিয়ে পড়বে পরিচয়।
কিছুই বেরোবে না। আনোন ডেডবডিই মর্গে পড়ে থাকে। শেষে চলে যায় লাশকাটা ঘরে। কঙ্কালটা বিক্রি হয়ে যায়।
আঃ রাখো তো ওসব কথা। মনে করো তোমরা কিছু জানো না।
তোমার সেই ইংরিজি প্রোভাব, হোয়্যার ইগনোরেন্স ইজ ব্লিস, দেয়ার ইট ইজ ফলি টু বি ওয়াইজ।
ছেলেটার কী অবস্থা হয়েছে দেখেছ? গেল একরকম, ফিরে এল আর একরকম।
তুমি বলেছ ঠিক, আমরা না গেলে কী হত! কিছুই জানতে পারতুম না। আচ্ছা পিন্টু, তুমি কি সত্যিই তোমার প্রফুল্লকাকাকে দেখেছ?
একবার মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, আবার মনে হচ্ছে, না।
মনটাকে স্থির করে যে-কোনও একটা কিছু বলো, পজিটিভ নেগেটিভ একসঙ্গে দুটো কী করে হয়?
তা ঠিক। তবে, এ তো মনের ব্যাপার নয়, চোখের ব্যাপার।
তা হলে আজকের মতো চেপে যাও। বেশ রাত হয়েছে।
অপর্ণার মা বললেন, তুমি আজ থেকে যাও।
করুণ মুখে বললুম, উপায় নেই। বাবা কনকের খবরের জন্যে উদগ্রীব হয়ে বসে আছেন।
তা হলে কথা দাও, তুমি শিগগির আর একদিন আসবে।
পঙ্কজবাবু বললেন, আরে, তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন, সামনের রোববার আমি দু’জনকেই ধরে আনব।
অপর্ণা বললে, চলুন, দিদা ঠাকুরঘরে আপনার জন্যে বসে আছে। বাবা, তুমি নীচে নামো, আমরা এখুনি আসছি।
এবার আমরা বাড়িটার আরও রহস্যময় অংশে চলে এলুম। একেবারে বাগানের দিকে। ছাদ মন্দিরের চূড়ার মতো ওপর দিকে উঠে গেছে। মার্বেল পাথরের মেঝে সোজা চলে গেছে ঠাকুরের সিংহাসনে। আমাদের দিকে পেছন ফিরে বৃদ্ধা আসনে বসে আছেন। শুভ্র কেশ মৃদু বাতাসে উড়ছে। সামনেই রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি।
আমরা দু’পাশ থেকে দু’জনে হাঁটু গেড়ে প্রণামের জন্যে মাথা হেঁট করতেই, মাথার পেছন দিকে একটি স্নেহের হাতের স্পর্শ পেলুম। হাত যেন কত কথাই বলতে চাইছে। সময় যেমন কথা বলে ঘড়ির শব্দে। দু’জনে প্রায় একই সঙ্গে মাথা তুলেছি। বৃদ্ধার দুটি হাত আমাদের দুজনের মাথায়। দুটি অনড় চোখে জলের ধারা। রাধাকৃষ্ণের সঙ্গে এতক্ষণ কী কথা হচ্ছিল ভক্তই জানেন। তিনি যার কাছে আছেন, তার কাছে যোলো আনাই আছেন, যার কাছে নেই তার কাছেও আছেন, একজন দেখেন, আর একজন দেখেন না।
