কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতেই, দু’হাতে মাথার চুল ধরে বেশ করে নেড়ে দিলেন। নাড়তে নাড়তে বললেন, চান করেছিস, ভাল করে মাথা মুছিসনি? সর্দি হবে যে রে ভাই! এত বড় বড় চুল করেছিস! ও খোকা, এর মাথাটা যে ভিজে সপসপ করছে। একটা কিছু দে আগে, ভাল করে
পঙ্কজবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, দিচ্ছি মা। কই গো কোথায় সব গেলে!
বারান্দা ধরে তিনি এগোতে লাগলেন। হঠাৎ বাড়িটা যেন জনশূন্য হয়ে গেছে। এই বারান্দা ওপাশে পাক মেরে কোথায় যে চলে গেছে। কোন স্বপ্নলোকে।
দূরে অপর্ণা আসছে। কী হল বাবা?
আরে তোরা কোথায় যে চলে যাস! এই আছিস এই নেই যেন মরীচিকা!
অপর্ণা বললে, ওদিকে যে এক কাণ্ড হয়েছে। বাবলু নাকে ন্যাপথালিনের গুলি ঢুকিয়েছে, আর বেরোচ্ছে না। মা কাকিমারা সবাই সেই নিয়ে ব্যস্ত।
অ্যাঁ, সেকী রে?
দু’জনেই বারান্দার বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। সার সার, সাদাসাদা আলোর ডোম বাতাসে দুলতে লাগল। যুঁই ফুলের ভিজেভিজে গন্ধ।
বৃদ্ধা মোড়া থেকে মেঝেতে নেমে বসলেন, আয়, আমার পাশে বোস। সারাদিন ওরা কী যে এত হইহই করে! বড় সংসার তো? কত লোক দেখ না? বাড়ি একেবারে গিজগিজ করছে।
ভেতরের হট্টগোলে ঢোকার চেয়ে এইখানে বসতে পেয়ে যেন প্রাণে বাঁচলুম। অনেক মহিলার মধ্যে নিজেকে কেমন যেন অসহায় মনে হয়।
বৃদ্ধা বললেন, কী করিস তুই?
এই তো সবে একটা চাকরি পেয়েছি।
চাকরিতে গেলি ভাই! ডাক্তার কি ইঞ্জিনিয়ার হতে পারলি না?
আমার যে তেমন বুদ্ধিসুদ্ধি নেই। বাবা বলেন, মানুষের খোলসে একটা গাধা পোরা।
বৃদ্ধা হাসলেন। বড় মাপা হাসি। অভিজাত মহিলারা এইভাবেই হাসেন। অপর্ণা একটা পাটভাঙা তোয়ালে এনেছে।
ওমা, একী! আপনি মাটিতে বসে পড়েছেন?
নাক থেকে সেই জিনিসটা বেরিয়েছে?
চেষ্টা চলছে। কাকা বলছেন, ভয় পাবার কিছু নেই, ও ধীরে ধীরে উড়ে যাবে। নিন মাথাটা মুছে ফেলুন। ভেজালেন কী করে?
ভিজে গেল।
কী করে ভিজল?
উত্তরে বোকার মতো হাসলুম।
বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন, বুড়ি কী বলছে?
অপর্ণা চিৎকার করে বললে, মাথা কী করে ভিজল?
চান করলে মাথা ভিজবে না? চান করে এসেছে। মাথা মোছর সময় পায়নি।
অনেক দূরে সমবেত উল্লাসধ্বনি উঠল। অপর্ণা বললে, যাক বেরিয়ে গেছে মনে হয়। চলুন, চলুন, এখানে দিদার কাছে বসে থাকলেই হবে?
মেঝে থেকে আমাকে ওঠাবার জন্যে অপর্ণা হাত ধরে টানতে লাগল। এই কাজটা মনে হয় সে ঠিক করছে না। একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। বৃদ্ধা দেখছেন দেখুন, অন্য কেউ দেখলে ভাববেন, বাবা, এখনই এত!
বৃদ্ধা বললেন, যাও ভাই ঘুরে এসো। যাবার সময় একবার আমার কাছে হয়ে যেয়ো। আমার ঠাকুরঘর দেখাব, একটু প্রসাদ খেয়ে যাবে।
অপর্ণার পেছন পেছন চলেছি। হাতে তোয়ালে। হঠাৎ মনে হল, ব্যাপারটা নিয়ে অপর্ণার সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়। বারান্দার নির্জন অংশে এসে মৃদু গলায় ডাকলুম, অপর্ণা! বেশ লাগল ডাকতে।
অপর্ণা প্রশ্নের মুখ নিয়ে ঘুরে তাকাল, কী বলুন?
শোনো, একটা খুব বিপদ হয়েছে।
কী বিপদ? দেয়ালে পিঠ রেখে থেমে পড়ল। মুখে আলো পড়েছে। নাকছাবি কানের দুল চিকচিক করছে। মনে হচ্ছে আমার ভীষণ কাছের মানুষ। আমার এই উতলা উৎকণ্ঠিত মন সামনে মেলে ধরতে পারলে একটু শান্তি পাব।
আমরা এইমাত্র মর্গ থেকে আসছি।
মর্গ?
আর কিছু বলার সুযোগ হল না। পঙ্কজবাবু আর অপর্ণার মা মার্চ করে আসছেন।
অপর্ণার মা এগিয়ে আসতে আসতে বললেন, কী বিপদ বাবা! ছিছি, তোমাকে একলা এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। চলো চলো, ঘরে চলো।
পঙ্কজবাবু বললেন, আজ কিন্তু বেশিক্ষণ আটকানো চলবে না। বেশ ঝামেলার একটা কাজ এখনও সারা হয়নি।
তোমাদের হঠাৎ এত কাজ কোথা থেকে এল। কাজের যেন বন্যা বইছে! তুমি একবার দেখো, ওঁরা চা পেলেন কি না?
সেকী, নীচে চা যায়নি!
পটাস পটাস চটির শব্দ তুলে তিনি চলে গেলেন। অপর্ণার মা বললেন, পিন্টুকে ঘরে বসা। আমি আসছি এখুনি। তিনিও নীচের দিকে চললেন। অপর্ণা বললে, আসুন।
আমার কথাটা!
ঘরে হবে। বসে বসে বলবেন।
বারান্দা ডান দিকে বাঁক নিয়ে আর এক মহলে ঢুকে পড়েছে। একজায়গায় তিনধাপ সিঁড়ি ভেঙে আমরা একটা উঁচু চাতালে চলে এলুম। অনেকের কথা শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না কাউকে। অদ্ভুত রহস্যময় বাড়ি। চাতালের তিন পাশ ঘেরা। মৃদু একটা আলো জ্বলছে মাথার ওপর, ঘেরাটোপের মধ্যে। সামনে একটা সুন্দর পালিশ করা দরজা। কোথা থেকে হুহু করে হাওয়া আসছে। এই বাড়িতে সারাজীবন আমি বন্দি হয়ে কাটাতে পারি।
অপর্ণা ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। একটু আগেও ধূপের গন্ধ পাচ্ছিলুম, এখন গন্ধ আরও বেশি পাওয়া গেল। হলঘরের মতো বিরাট একটা ঘর। ঐশ্বর্য দেখলে চোখ ঠিকরে যায়। মহিলাদের স্পর্শে এইভাবেই মনে হয় ইন্দ্রলোক তৈরি হয়! একেই বলে, ম্যাজিকটাচ। তা না হলে, সবই ছন্নছাড়া। সব থেকেও কিছু নেই।
ঘরের শেষ মাথায় একটি পালঙ্ক, যেন স্বপ্নে ভেসে আছে। ডান পাশে একটা অর্গান। সামনেই বাঁ পাশে জানলা ঘেঁষে একটি চৌকো কার্পেট। ধারে ধারে সোফা। ছিমছাম বইয়ের আলমারি। দাঁড়িয়ে লেখার ডেস্ক। বসে লেখাপড়া করার কাঁচ-পাতা ঝকঝকে টেবিল। বুকস্ট্যান্ড। শেড-লাগানো টেবিল ল্যাম্প। এ যেন রাজার ঘর।
