শিশুটির দস্যিপনা থামাবার জন্য এইবার কেউ একজন বিরক্ত হয়ে বললেন, ওকে ঘুমপাড়া না বাপু। রাত তো অনেক হল।
সরোজবাবু বসতে বসতে বললেন, বাঃ বড় চমৎকার বসার ঘর।
পঙ্কজবাবু প্রশংসাটা স্ত্রীর দিকে ঠেলে দিলেন, সব এরাই করে। আমাকে বিশেষ ভাবতে হয় না।
সৌভাগ্যবান আপনি। বউদি, জল খাব, ভাল করে এক কাপ চা খাব, কিছু মনে করবেন না, আবদার করছি।
ওমা, সেকী! মনে করব কেন? আমাদের বাড়ি অষ্টপ্রহরই চা হচ্ছে।
আমাদের মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, হ্যাঁগা, সত্যি করে বলো তো, তোমরা কি শ্মশান থেকে এলে!
শ্মশান? পঙ্কজবাবু টোক গিললেন, ঠিক শ্মশান নয়, বলতে পারো মহাশ্মশান।
১.৩৮ মরণ মরিতে চায়
এই বাড়ির কোথাও একটা গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ি আছে। সময় চলে যাবার সময় বড় সুন্দর শব্দ করে যায়। রাত নটা বাজল। গ্রীষ্মকাল। শীতকাল হলে চারপাশ নিশুতি হয়ে যেত। সরোজবাবু বললেন, এ নিয়ে খুব একটা পরামর্শের দরকার আছে কি! ভদ্রলোক আপনাদের কীরকম আত্মীয়!
আমি বললুম, আমার বাবার বন্ধু। খুব ভাল, মনে হয় নামকরা তবলচি। বাড়ির নীচেটা খালি পড়ে ছিল বলে, উনি যেখানে থাকতেন সেখান থেকে উঠে এসেছিলেন।
আত্মীয়স্বজন কে কে আছেন?
মনে হয় কেউ নেই। স্বামী-স্ত্রীর সংসার। একজন মামা বোধহয় আছেন।
ব্যস, তা হলে তো কোনও সমস্যাই নেই। মামাকে খবর দিলেই হয়ে যাবে। তিনি এসে লাশ নিয়ে যান। আমি পুলিশকে বলে দিচ্ছি, যেন হ্যারাস না করে।
অক্ষয়বাবু বললেন, খুব ভাল বলেছ। এর চেয়ে ভাল কিছু ভাবা যায় না।
পঙ্কজবাবু বললেন, দি ওয়ে।
অপর্ণা এসে বাবার কানে কানে কী যেন “লল। পঙ্কজবাবু বললেন, ও হ্যাঁ, নিশ্চয় নিশ্চয়। উঠে দাঁড়ালেন। অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, কোথায় চললেন?
একবার অন্দরমহল থেকে ঘুরে আসি, ক পড়েছে। তোমার জন্যে একটা ধুতি নিয়ে আসি।
না না, পঙ্কজদা, ধুতির দরকার হবে না। এই বেশ আছি। আপনি তো আমাকে চেনেন। বউদি চা আনলে কুকুরের আঁচড় মাচড় একটু ওয়াশ করে দোব।
চা দিয়ে কেন? আমি অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে ড্রেস করিয়ে দিচ্ছি। আমার ছোটভাই রাখাল এইসব। ব্যাপারে ভীষণ এক্সপার্ট।
কথা বলতে বলতে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। কাঁধে হাত রেখে বললেন, চলো, ভেতর থেকে ঘুরে আসি। ভেতরে যেতে হবে শুনেই, নিজের আকার আকৃতি সাজপোশাক সম্পর্কে মনে মনে ভীষণ সচেতন হয়ে পড়লুম। মনের অদৃশ্য আয়নায় বারেবারে ভেসে উঠতে লাগল আমার অবিন্যস্ত চেহারা।
ঢাকা একটা বারান্দা এপাশ থেকে ওপাশ চলে গেছে। সুন্দর করে বাঁধানো একটা উঠোন। পাশে পাশে পাতাবাহার গাছের অপূর্ব শোভা। একপাশ দিয়ে একটা নারকেল গাছ সোজা আকাশের দিকে উঠে গেছে। চারপাশ তকতকে পরিষ্কার। পরিবেশটা এতই সুন্দর, দেখলেই মন ভাল হয়ে যায়। দূরে বাঁ পাশ দিয়ে চওড়া একটা সিঁড়ি ধাপে ধাপে উঠে গেছে কোনও স্বপ্নলোকের দিকে। পঙ্কজবাবু আমাকে বলতে লাগলেন, এসো বাবা এসো। চলে এসো, লজ্জা কীসের? এ তো তোমারই বাড়ি। উঠোনের শেষ প্রান্তে রান্নাঘর। রান্নার ঘঁাকছেক, টুকরো টুকরো কথা ভেসে আসছে। দোতলার ছাদে কুকুর ডাকছে গম্ভীর গলায়।
পঙ্কজবাবু হাঁকলেন, কই গো, কোথায় গেলে তোমরা!
স্বাস্থ্যবান একটি ছেলে, হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে, পাশের একটা ঘর থেকে হাতের গুলি ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে এল। পঙ্কজবাবু বললেন, এই যে, জনি উইসমুলার, তোমার বডি বিলডিং ওয়ার্কশপ এত রাতেও খোলা?
ছেলেটি হাসতে হাসতে বললে, জেঠু, কাল আমরা রাঁচি যাচ্ছি।
হঠাৎ এইসময় রাঁচি?
কলেজ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। সাত দিনের ক্যাম্প। তোমার জন্যে কিছু আনতে হবে?
রাঁচির পেঁপে খুব ভাল। পারিস তো কিছু বীজ নিয়ে আসিস।
তোমার কিটব্যাগটা কিন্তু নিয়ে যাব। জ্যাঠাইমাকে বলেছি।
ওটাতে বোধহয় একটা তাপ্পি লাগাতে হবে।
সে আমি ঠিকঠাক করে নোব।
দু’জনের কথার ফাঁকে ঘরটা দেখে নিলুম। মেঝেতে বারবেল, ডাম্বেল গড়াগড়ি যাচ্ছে। দেয়ালে ব্যায়ামবীরদের বিভিন্ন ভঙ্গির ছবি।
পঙ্কজবাবু বললেন, আমার বন্ধু অক্ষয়কে কুকুরে আঁচড়েছে, তুই একটু ড্রেস করে দিয়ে আসতে পারবি?
খুব পারব।
পঙ্কজবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এসো, সব ওপরে আছে মনে হচ্ছে। দোতলাটা একতলার চেয়ে আরও সুন্দর। জাফরি বসানো ঢাকা বারান্দা। ঝকঝকে মেঝেতে আলো ঠিকরোচ্ছে। জায়গায় জায়গায় জোড়া জোড়া সোফা পাতা। যুঁই ঝাড় জানলার বাইরে ফুলে ফুলে সাদা, বাতাসে দুলছে। মোড়ায় সৌম্যচেহারার এক বৃদ্ধা বসে আছেন। যার সবকিছুই শুভ্র। কেশ, অঙ্গবাস, দেহত্বক, এমনকী পায়ের চটি। পায়ের কাছে থেবড়ে বসে আছে সাদা একটা বেড়াল। পশমের গোলার মতো।
বৃদ্ধার হাতে একটি জপের মালা আপন মনে ঘুরছে। পঙ্কজবাবু বললেন, আমার মা। বয়েস অনেক। এমনি খুবই শক্তসমর্থ। কেবল কানে একটু কম শোনেন।
পঙ্কজবাবু গলা দু’ধাপ তুলে বললেন, মা, এই আমার সেই বন্ধুপুত্র, পলাশ।
জপের মন্ত্রে ঠোঁটদুটি নড়ছে। মুখ ভেসে গেল উদ্ভাসিত হাসিতে। পবিত্র মুখে হাসি খেলে কোজাগরী রাতের চাঁদের আলোর মতো চরাচর ব্যাপ্ত করে।
অদ্ভুত স্নেহজড়ানো সুরে বললেন, আয় আয়, কাছে আয়। তোকে একবার ভাল করে প্রাণভরে দেখি।
