প্রশ্ন আছে উত্তর নেই। কী করব আমি! জীবনেও ভাবিনি, এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। একটা বাতি জ্বলছে, আমি গিয়ে ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে দোব! এই তো সেদিন, দু’জনে হইহই করতে করতে এলেন। সংসার সাজিয়ে বসলেন। কত আশা, আকাঙ্ক্ষা। একটি সন্তানের জন্যে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা। দুপুরে হেসে খেলে রান্না। পাত পেতে খাওয়া। ছাদে লুডো খেলা। চোখের জল, হাসি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জীবন ধুয়ে সাদা৷ সিঁদুর মুছে ফেলো, শাখা ভেঙে ফেলোশাড়ি ছেড়ে, থান পরো।
না, এ আমি পারব না।
সরোজবাবু উলটো দিকে মুখ ঘুরিয়েছিলেন, ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন, কী পারবে না!
আমি গিয়ে বলতে পারব না, কাকাবাবু মারা গেছেন।
এ কী বোকার মতো কথা, বলতে তো হবেই। ঘটনা ঘটিয়ে সময় চলে গেছে। সময়কে তো ফিরিয়ে আনা যাবে না ভাই। ঘড়ির কাটাকে ঘোরাবে কী করে? তা হলে শোনো।
পঙ্কজবাবু বললেন, এখানে না দাঁড়িয়ে, কোথাও গেলে হয়।
হ্যাঁ, তা হয়। চলুন তা হলে, গাড়িতে চলুন।
ওঁদের মনে কী হচ্ছে আমার বোঝার ক্ষমতা নেই। নিজের মনের কথা বলতে পারি। অন্ধকার সমুদ্রে ঢেউ উঠছে, পড়ছে, ভাঙছে, চুরছে। শ্যাম আকাশের তলায়, ফসফরাসের খলখল হাসি। ভয়ংকর সুন্দর। ওই সাধু গাঁজা চড়িয়ে অসাড়, ঘটনার অ্যানেসথেসিয়ায় আমার চেতনা বিকল হয়ে আসছে।
পৃথিবীতে দুঃখ মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। জল যখন গড়ায় তখন একজনের চোখেই বয়। তা না হলে এই বিভ্রান্তির মধ্যে এমন ঘটনা ঘটবে কেন? একটা কেলে ভুসো কুকুর, পেছনের আসনের তলায় ঠ্যাং ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল। আরাম করার আর জায়গা জুটল না! অক্ষয় কাকাবাবু যেই পা রেখেছেন কুকুরটা কেঁউ করে লাফিয়ে উঠে কাকাবাবুর কাছাচোর সঙ্গে জড়িয়ে, ওই অল্প পরিসরে এমন এক কাণ্ড বাধিয়ে বসল! সরোজবাবু আর পঙ্কজবাবু হেই হেই করছেন, আর বলছেন, খুব সামলে, খুব সামলে। কামড়ালেই জলাতঙ্ক। কে শুনবে? কাকাবাবু সাংঘাতিক বেকায়দায় পড়ে গেছেন। পা দুটো যথেষ্ট ট্র্যাক করতে পারলে কুকুরটা বেরিয়ে যেতে পারত।
যাই হোক সবকিছুরই একটা শেষ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও শেষ হয়েছিল। রাস্তার কূটকচালে ট্রাফিক জটও একসময় খুলে যায়। শেষমেষ একটা রফা হল। কাকাবাবুর কোঁচা গলায় জড়িয়ে, খামচাখামচি করতে করতে কুকুর ফুটপাথে লাফিয়ে পড়ল। অর্ধেক বস্ত্র দান করে ভদ্রলোক রেহাই পেলেন। কামড়ায়নি। কামড়াতে পারেনি, কারণ নিজের মুখ নিজেই খুঁজে পায়নি। কাপড়ে জড়িয়েছিল। যা করে গেছে, সবই পায়ের কাজ।
অক্ষয় কাকাবাবু রাস্তায় নেমে এলেন, কাছা গলায় দিয়ে কুকুর বসেছে গিয়ে যেখানে ভলভল করে গঙ্গার জল বেরোচ্ছে। কাপড়ের যতটুকু কুকুর দান করে গেছে, সেই অংশটুকু লুঙ্গির মতো করে পরে নিলেন। সংসারে কীভাবে যে মানুষের কাছা খুলে যায়!
সরোজবাবু বললেন, হুডখোলা গাড়ি কলকাতায় চলে না। এ এক ভাগাড়ে শহর। অক্ষয়দা, কামড়ায়নি তো!
কামড়ায়নি, তবে আঁচড়েছে।
চলুন তা হলে, ডাক্তার ভবরঞ্জনের কাছে যাই।
আরে দুর, এ অতি সামান্য ব্যাপার। এর চেয়ে কত বড় বড় চোট হয়ে গেছে তাই যাইনি!
গাড়ি চলতে শুরু করল। কুকুর কুকুর গন্ধ বেরোচ্ছে। সরোজবাবু আবার একটা সিগারেট ধরালেন। ভদ্রলোক মনে মনে উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, এবার তা হলে কী হবে।
এবার?
দু’জনে একই কথা বললেন, বলেই চুপ করে গেলেন। পৃথিবীতে এইরকম বহু এবার আছে, যে-বারের পরে আর কিছু থাকে না। থাকে এক ধরনের ঘোলাটে শূন্যতা।
সরোজবাবু বললেন, কেসটা জানা দরকার। হঠাৎ একটা লোক মারা গেল, নিরীহ লোক।
পঙ্কজবাবু বললেন, এখন, এ সময় জানব বললেই কি আর জানা যাবে?
যেতে পারে, যদি বিশুকে ধরা যায়।
এতক্ষণ আমরা কথায় কথায় কেউই লক্ষ করিনি। গোয়ালের গোরুর মতো গাড়ি ঘুরঘুর করে। বিডন স্ট্রিটের দিকেই চলেছে। কোথাও তো একটা যেতে হবে! যে যার ঘরের দিকেই চলে।
পঙ্কজবাবুর বাগানে ভুরভুর করে ফুলের গন্ধ ছাড়ছে। রাত-রানিরা ফুটে বসে আছে। ঢোকার মুখের উঁচু রকে এক সার সুন্দরী বসে আছেন। একটা ফুটফুটে বাচ্চা, চোখে ঘুম নেই, সবে হাঁটতে শিখেছে। টলে টলে বেড়াচ্ছে। দু’পা যায়, ধুপ করে বসে, আধো আধো গলায় বলে, এই দাঃ। আমাদের ঢুকতে দেখে, সকলেই একটু সংযত হলেন। অপর্ণা বাচ্চাটাকে কোলে টেনে নিতেই, মুক্তি পাবার জন্য ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে চিল চিৎকার ছাড়তে লাগল।
অপর্ণার মা বললেন, ওরে ওকে ছেড়ে দে না বাপু, কানের পোকা বের করে দিলে।
বাচ্চাটা ছাড়া পেয়েই অপর্ণাকে চড়, চাপড়, ঘুসি সব একসঙ্গে চালাতে লাগল। শেষে কচি কচি মুঠোয় চুল ধরে টান। সামনের দিকে মাথা নিচু করে অপর্ণা বলছে, উ, ঊ, ছাড় ছাড় দস্যি ছেলে।
অপর্ণার মা উঠে এলেন। নতুন মানুষ দেখে অভ্যর্থনা জানালেন নতুনভাবে, আসুন আসুন। পঙ্কজবাবুকে হাসিহাসি মুখে বললেন, কী, তোমাদের কাজ হল? কী করে এলে, ডাকাতি?
আমাদের মনের অবস্থা জানবেন কী করে! পঙ্কজবাবু যেন একটু বিরক্তই হলেন। সেইভাবেই বললেন, বড় বিপদ, বড় বিপদ।
কী বিপদ? মহিলা যেন কেমন হয়ে গেলেন। বিপদের চেয়ে বিপদের ছায়া অনেক বেশি ভয়াবহ।
চলো চলো, ভেতরে চলো, সব শুনতে পাবে।
