মৃতদেহনাড়াচাড়া করে সাধুবাবুর নেশা ছুটে গেছে। তিনি প্রসন্ন মহাদেবের মতো এসে বললেন, কই আসুন। আপনাদের মাল দেখে যান।
চলুন চলুন, বলে সরোজবাবু আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে, মৃত্যুর মতো শীতল সেই ঘরে ঢুকলেন। মৃত্যু যে এত দুর্গন্ধময় কে জানত। কোথায় মানুষের গৌরব! জীবনের সুগন্ধ ছড়ায় কই! মৃত্যু এসে দুর্গন্ধ মাখিয়ে দিয়ে যায়। সাধুবাবু একটা ট্রে টানলেন। একজন কিশোর। ভুল নম্বর টেনেছেন। ছিলিম এখনও ছাড়েনি। দ্বিতীয় ট্রে। একজন বৃদ্ধ। দাঁত খিঁচিয়ে আছেন। সাধু বললেন, অ্যাঃ, শালা সেই বুড়ো। কেউ নিতেই আসে না। থাক শালা, এখানে আজন্ম শুয়ে।
সরোজবাবু ধমক লাগালেন, আবার মার খাবি সাধু, মুখ সামলে।
মুখ আর কী সামলাব হুজুর, এখানে কিছু মাল আছে, যারা চিরকাল থাকবে, কোনওদিন নড়বে না। এই বুড়োকে গলা টিপে মেরেছে। মেরেছে মেরেছে…
সাধু এটা গল্প করার জায়গা নয়। মাল টানো।
টানি হুজুর, আমি আদার বেপারি।
তৃতীয় ট্রে-টা টেনেই সাধু বললে, অ্যায় যাঃ আবার ভুল হয়ে গেল।
ট্রে-টা ভেতরে ঠেলতে যাচ্ছে, আমি চিৎকার করে উঠলুম। না করে পারলুম না, এ যে প্রফুল্লকাকা!
সাধু বললেন, কী হল? আপনারা তো বললেন, মেয়েছেলে, পুরুষ দেখে চিল্লে উঠলেন?
আরে এ যে আমাদের প্রফুল্লকাকা!
কে তোমার প্রফুল্লকাকা? তিনজনেরই এক প্রশ্ন।
ওই যে আমাদের বাড়িতে এসেছেন, কাকিমার স্বামী।
অ্যাঁ, সেকী? পঙ্কজবাবু চিনেছেন, ওই যে মহিলা, যিনি আজ রাঁধলেন, পরিবেশন করে খাওয়ালেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমার বুকের ভেতর কাঁপতে শুরু করেছে। হাতপা অবশ হয়ে আসছে। আমি ঠিক দেখলুম তো?
সরোজবাবু বললেন, তুমি ভাল করে একবার দেখো। সাধু বের কর।
ট্রে টানার শব্দ হল। চিত হয়ে শুয়ে আছেন। সেই পরিচিত মুখ। ছুঁচোলো গোঁফ। আমাদের প্রফুল্লকাকা। আর দাঁড়াতে পারছি না। সারাশরীর কাঁপছে। এ কী হল! বেশ বুঝতে পারলুম, আমি ধীরে ধীরে পড়ে যাচ্ছি।
সময়ই জানে সময়ের উজানে আমাকে কোথায় এনে ফেলেছে। তিনটি উদ্বিগ্ন মুখ তিন দিক থেকে ঝুঁকে আছে। মাথার ওপর বাড়ি-ঘেরা কলকাতার আকাশ। পঙ্কজবাবুর হুডখোলা গাড়ির পেছনের আসনে পা দুমড়ে চিত হয়ে আছি। মাথাটা ভিজেভিজে। সরোজবাবুর হাতে একটা তালপাতার পাখা। অল্প দূরেই একজন দেহাতি মহিলা। ফুটপাথের বাসিন্দা, আমাকে সুস্থ করার জন্যে পাখা এগিয়ে দিয়েছেন।
তিনজনেরই এক প্রশ্ন, কেমন বুঝছ বাবা!
দুঃস্বপ্ন দেখে যেন জেগে উঠলুম, যা দেখলুম, তা কি সত্যি!
পঙ্কজবাবু বললেন, সে তো তুমিই জানো বাবা।
সরোজবাবু বললেন, একেই বলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোনো।
অন্ধকারে সাধুবাবুর গলা, মেয়েটাকে একবার দেখবেন না?
অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, যা, দেখতে তো হবেই, সেইজন্যেই তো আসা।
সরোজবাবু সাধুকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ওই লোকটিকে কোথায় পেলে?
কে জানে? কোথায় যেন মরে পড়ে ছিল। ওসব আমি জানি না। খাতায় আছে।
সরোজবাবু আমার কপালে একটা হাত রেখে বললেন, কী বুঝছ? একটু শক্ত হও। বেঁচে থাকলে কত মৃত্যু দেখবে! অত সহজে টাল খেলে চলে?
দেহাতি মহিলা বললেন, পানি?
তুমি জল খাবে?
আজ্ঞে না। চলুন আমি ঠিক হয়ে গেছি।
ধীরে ধীরে আবার আমরা সেই লাশঘরে এলুম। সাধুবাবু এক টানে সেই ট্রে-টা বের করে ফেললেন। যা দেখার জন্যে আমাদের ছুটে আসা। অক্ষয় কাকাবাবু কাঁধে হাত রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, পাছে পড়ে যাই বা মরে যাই। ধরে রাখলেই যদি ধরে রাখা যেত!
এতক্ষণ চোখ বুজিয়ে ছিলুম। শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় বন্ধ। চোখ খুললেই তো কনককে দেখতে পাব। প্রথমে পিটপিট করে তাকালুম। না দেখলেই যেন ঘটনা অঘটনা হয়ে যাবে, সত্য মিথ্যা হয়ে যাবে। সরোজবাবু বললেন, ভাল করে তাকাও।
ভাল করেই তাকালুম। আনন্দে বুক ছলাত করে উঠল। কনক নয়। অন্য কেউ। যৎসামান্য মিল। সে মিল মুখে। ইনি অনেক ময়লা। বয়েসেও বেশি। মাথার চুল কনকের মতো নয়। শুধু এই ভেবে অবাক হচ্ছি, একটু আগে শোকে, আতঙ্কে, জ্ঞানশূন্য হয়েছিলুম, এখন আনন্দে একেবারে ভোরের পাখি।
এ নয় এ নয় বলে, প্রায় চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলুম। পাখির মতো ডানা ঝটপটিয়ে গলা নামিয়ে নিলুম। মৃতের মঞ্জিলে উল্লাস অশোভন।
পঙ্কজবাবু বললেন, এ নয়? আ গড সেভ দি কিং।
অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, এ নয়, আঃ, বাঁচালে।
সরোজবাবু বললেন, যার গেল, তার গেল। নাও সাধু তুলে রাখো।
এতক্ষণ যেন শাড়ির দোকানে কাপড় পছন্দ করা হচ্ছিল। পঙ্কজবাবু বললেন, কিন্তু!
আর কিছু বললেন না। আমাদের সকলের মুখই গম্ভীর হয়ে গেল। ছায়া নামল মনে।
সরোজবাবু বললেন, তুমি আর একবার ভাল করে দেখো তো। তোমার চিনতে ভুল হচ্ছে না তো!
আজ্ঞে না, ভুল হয়নি। খুব ভাল করেই দেখেছি।
কিন্তু কী করে তা হয়! ভদ্রলোক ছিলেন কোথায়? আছেন কোথায়? এখানে কী করে এলেন?
সাধু বললেন, মরে গিয়ে এসেছেন স্যার! এঁরা সবাই যমরাজের অতিথি।
সরোজবাবু থেমে থেমে, কেটে কেটে বললেন, তুউমি চুউপ কঅরো!
পকেট থেকে পাঁচটাকার একটা নোট বের করে সাধুর হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুই আছিস কতক্ষণ?
সারারাত হুজুর।
আমরা হয়তো আবার আসব, বুঝেছিস শয়তান? এসে যদি দেখি তুই সুঁই নিয়ে পড়ে আছিস, কেউ তোকে বাঁচাতে পারবে না।
বেঁচে থাকলে তো বাঁচার কথা আসে হুজুর, আমরা তো মরেই আছি। মড়া ঘাঁটতে ঘাঁটতে ভূত হয়ে গেছি। মর্গের বাইরে এসে, চুপ করে আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলুম মুক্ত আকাশের তলায়। সরোজবাবু একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, এখন তা হলে কী করা যায়!
