অক্ষয়বাবু বললেন, অনেক পাপ করলে, মানুষকে মর্গে আসতে হয় মৃতদেহের খোঁজে।
পঙ্কজবাবু জিজ্ঞেস করলেন, দুর্গন্ধ আছে?
একটু পরেই দেখতে পাবেন। নাকে বেশ করে রুমাল জড়িয়ে নেবেন। এখানে যে আমার কত অভিজ্ঞতা আছে, শুনলে আপনার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে।
কীরকম?
একদিন একটি মেয়ের হাত দেখব বলে হাতটা টেনেছি। আত্মহত্যার কেস। পোকামারার ওষুধ খেয়ে সুসাইড করেছে। তখনও কাটাই ভেঁড়াই হয়নি। হাতটা আমার হাতের তালুতে ফেলে, খাতায় সবে আঁকতে আরম্ভ করেছি। আঙুলগুলো অল্প অল্প নড়ে উঠল। মরার পর মানুষের শরীরে টান ধরে, আমি ভাবলুম সেইরকম কিছু। চাপার কলির মতো আঙুল। একেবারে দুর্গা প্রতিমার মতো চেহারা। হাতে আত্মহত্যার যোগ যেমন স্পষ্ট, তেমনই আবার দীর্ঘ জীবন, প্রচুর ঐশ্বর্যের যোগ আছে।
পঙ্কজবাবু জিজ্ঞেস করলেন, তা কী করে হয় অক্ষয়?
কেন হবে না? খুব হয়। একটা ট্রেন ধরুন, বেনারসের কাছে অ্যাকসিডেন্ট থেকে বেঁচে গেল, তারপর সোজা চলে গেল হরিদ্বার। জীবনও সেইরকম, একটা ধাক্কা কাটাতে পারলেই, রয়ে গেল সত্তর কি আশি বছর। এ তো আপনার আর আমার জীবনের দেখা ঘটনা। মনে আছে। আমাদের সেই প্রিভেনটিভ অফিসার ঘোষের কথা। মোটরসাইকেলে রেড রোডে অ্যাকসিডেন্ট করল। শরীর চুরমার। গেল গেল অবস্থা। সেই ঘোষ এখন ডেপুটি কালেক্টর।
উলটো দিকের ফুটপাথ থেকে সরোজবাবু ডাকলেন, চলে আসুন।
অক্ষয় কাকাবাবুর গল্পের শেষটা আর শোনা হল না। উলটো দিকের ফুটপাথে সরোজবাবুর পাশে, সরোজবাবুর হাফ সাইজের একটি মানুষ খাকি জামা পরে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে বিড়ি।
সরোজবাবু বললেন, অ্যায় সাধু?
সাধু যেন স্বপ্নের ঘোরে পঁড়িয়ে আছে। ফুকফুক বিড়ি টানছে, আর ফুসফুস ধোঁয়া ছাড়ছে। কোনও হুঁশ আছে বলে মনে হচ্ছে না। এ আবার মানুষের কী ব্যামো!
অ্যায় সাধু, বলে সরোজবাবু ঘাড় ধরে এক ঝাঁকুনি মারলেন।
সাধু বললে, বলুন। শুনতে পাচ্ছি।
ক’ ছিলিম টেনেছিস?
কার বাপের কী?
সরোজবাবু সঙ্গে সঙ্গে সপাটে এক চড় কষালেন।
পঙ্কজবাবু আর অক্ষয়বাবু দুজনেই হাহা করে উঠলেন, আহা, কয়রা কী? কয়রা কী?
সরোজবাবু হুংকার ছাড়লেন, তোমার নেশা আমি ঘুচিয়ে দোব। কার সঙ্গে কথা বলছিস জানিস?
সাধু সঙ্গে সঙ্গে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল, মারুন মারুন। গরিবলোক তো বড়লোকের তবলা। তেহাই সাধার জায়গা। এক চড় কেন? তিন চড় মারুন। এই তো গাল পেতে দিচ্ছি। মহাত্মাজির চেলা।
সাধুবাবু যা করছেন সবই ঘুমের ঘোরে। অক্ষয়কাকাবাবু বললেন, সরোজ, একে দিয়ে হবে না মনে হচ্ছে।
খুব হবে, দু-চার ঘা পড়লেই হবে।
না, না, মারধরে দরকার নেই।
সাধুবাবু অমনি মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, না না মারধরে হবে না। প্রেম বিলাও, দিল। দিলাও।
সরোজবাবু এবার সাধুর দুধ ধরে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিলেন। রোগা মানুষটার হাড় ক’খানা খুলে পড়ে যায়। চুচুকে মাথা কামানো, ঘাড়ে গর্দানে একটি লোক এগিয়ে এসে বললেন, আরে এ সাধু, দেখা হামারা হাতমে কেয়া হ্যায়।
লোকটির হাতে একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ। সাধুর চোখদুটো চকচক করে উঠল। চোখ বড় বড় করে সরোজবাবুকে বললেন, বলুন স্যার, কী করতে হবে?
এতক্ষণ আমার সঙ্গে ইয়ারকি হচ্ছিল, রাসকেল? চল ঘর খুলবি চল।
মর্গের সামনে গোটা দুই ছোট লরি দাঁড়িয়ে। একদল লোক। সবাই ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছেন। সাধুর একজন ওপরওয়ালা সাধুকে দেখেই ফায়ার হয়ে গেলেন, ব্যাটা তোর চাকরি এবার আমি খাব।
সাধু অম্লানবদনে বললে, সেই ঢোকার প্রথম দিন থেকেই শুনে আসছি। ছাড়ালে, নতুন লোক আর পাবে না। এ হল ভূতের চাকরি।
যাঁরা ভিড় করে আছেন তারা লাশ নিতে এসেছেন। একজন পুলিশের লোক দাঁড়িয়ে আছেন। ঠান্ডাঘর থেকে হুকুম মিলিয়ে দেহ বের করে দেবেন। লরির ওপর থেকে দুটো খাঁটিয়া, ফুল, ফুলের মালা নেমে এল। গোছ গোছ ধূপে আগুন পড়ল। দড়ি নামল। প্রিয়জনকে বাঁধা হবে।
খাকি জামা পরা আরও দু-চারজন কর্মচারী এপাশ ওপাশ থেকে এসে গেলেন। অন্ধকারে ফিসফাস কথাবার্তা, টাকার লেনদেন চলতে লাগল। পুলিশের সেই লোকটি এক ফাঁকে এসে সরোজবাবুকে বলে গেল, কিছু মনে করবেন না স্যার! যেখানকার যা নিয়ম!
সরোজবাবু যেন দেখেও দেখছেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, তাড়াতাড়ি ঝামেলা হাটান, আমি এসেছি একজনকে আইডেন্টিফাই করতে।
এই তো স্যার, এক্ষুনি হয়ে যাবে।
একধরনের ধাতব শব্দ হতে লাগল। লোহার ট্রে নামছে বাঙ্ক থেকে। মৃত্যু চলেছে ঝনঝনিয়ে, মল বাজিয়ে। আমি আর পঙ্কজবাবু তাকিয়ে আছি উলটো দিকে। এ দৃশ্য যত কম দেখা যায় ততই ভাল। জীবনের আতঙ্ক!
একবার আড়চোখে তাকিয়েই ভয়ে আতঙ্কে চমকে উঠলুম। একটি মহিলার মৃতদেহ ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে চলেছেন। বেশ সম্পন্ন চেহারার কয়েকজন ভদ্রলোক রয়েছেন সঙ্গে। মহিলা পুড়ে একেবারে কাঠকয়লার মতো হয়ে গেছেন। কয়লার হাত, কয়লার পা, কয়লার মুখ। মাথার চুল পুড়ে গিয়ে, গুঁড়িগুঁড়ি হয়ে আটকে আছে।
আতঙ্কে পঙ্কজবাবুকে জড়িয়ে ধরেছিলুম। তিনি বললেন, ওদিকে তাকিয়ো না। অক্ষয় কাকাবাবুর কোনও কিছুতেই দৃকপাত নেই। সরোজবাবুরও তাই। দু’জনেই গল্পে মশগুল। ডোমজুড়ে বাগানবাড়ি বিক্রি হবে। সরোজবাবু দরদস্তুর করছেন। দু’হাত দূরে মৃত্যু পাকার, এঁরা জীবনের আয়োজনে ব্যস্ত।
