পঙ্কজবাবু আর আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলুম। এরকম অন্ধকার-অন্ধকার গলিতে যে-কোনও সময়েই খুন হতে পারে। রক্তনদীর ধারার খোকাগুন্ডার গলি।
অক্ষয়বাবু হেসে বললেন, ভয় নেই, চলে আসুন। নাটকের মহলা হচ্ছে।
গলির মধ্যে সবচেয়ে যেটা চটকদার বাড়ি, সেই বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে অক্ষয়বাবু ডাকতে লাগলেন, সরোজ, সরোজ। দু’ডাকে সাড়া না পেয়ে নাম বদলে ডাকতে লাগলেন, পটোল, পটোল।
মানুষের কী দুর্গতি! যার ভাল নাম সরোজ, তার ডাক নাম পটোল।
দোতলার জানলায় একটা বিরাট মুখ ঘরের আলোয় কালো হয়ে দেখা দিল। হেঁড়ে গলায় উত্তর এল, কে?
আমি অক্ষয়।
কে অক্ষয়?
আরে আবলুস।
ও হোঃ, অক্ষয়দা? দরজা ঠেলে ওপরে চলে আসুন।
ভেতরে মার্বেল পাথর বাঁধানো একটা উঠোন। সামনেই ঠাকুরদালান। দালানে মা কালীর বিশাল মূর্তি। একটু আগেই পুজো হয়েছে। ধুনোর ধোঁয়ায় আলো এখনও ঝাঁপসা। সেই ঝাঁপসা পরদায় মা কখনও স্পষ্ট, কখনও অস্পষ্ট। হঠাৎ দেখলে চমকে উঠতে হয়।
বাঁ পাশ দিয়ে বেশ একটা চওড়া সিঁড়ি, দোতলায় উঠে গেছে। পালিশ করা কাঠের হাতল ঝকঝক করছে। সিঁড়ির ওপরের মাথায় অসম্ভব সাজগোজ করা এক মহিলা হাসিহাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের দেখে বললেন, আসুন দাদা, আসুন।
মহিলার একটু স-এর দোষ আছে। বাঙালি বলে মনে হল না। ইরানি হতে পারেন, ভূপালি হতে পারেন।
লম্বা ঝকঝকে একটা দালান সোজা উত্তরে চলে গেছে। ডান পাশে একটা কাঠের স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে স্টাফ-করা বাঘ। জীবন্ত। মাঝরাতে ঘুমচোখে দেখলে, বাপ বলে দৌড় মারতে হবে। চোরেদের কী খোয়র।
একপাশে জুতো খুলে, পালিশ করা মেঝের ওপর দিয়ে প্রায় হড়কাতে হড়কাতে, আমরা যে-ঘরে এলুম সেটাকে হলঘর বলা চলে। বিশেষ কোনও ফার্নিচার নেই। মাঝখানে একটা লাল কার্পেট। সেই কার্পেটে লাল লুঙ্গি, আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে সরোজবাবু বসে আছেন। দেয়ালে। খাপ সমেত একটা রিভলভার ঝুলছে। আর এক দিকে ঝুলছে একটা রাইফেল।
আসুন দাদা আসুন দাদা বলে আমাদের অভ্যর্থনা হল।
অক্ষয়বাবু বললেন, নাও, আসন ছেড়ে উঠে পড়ো। পরোপকার করতে হবে। এঁরা আমার। আত্মীয়ের মতো। বড় বিপদে পড়েছেন।
কী হয়েছে? কারুর অসুখ? ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না? না, পকেট মারা গেছে?
ওসব তো তোমার কাছে সামান্য জিনিস।
আমরা তিনজনেই বসে পড়েছি।
একটি মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
একটা কী দাদা! কলকাতায় কত মেয়ে যে বেপাত্তা, আপনাদের কোনও ধারণাই নেই। মিসিং পার্সনস ডিপার্টমেন্টে মেয়ের বাপেদের দু’বেলা হাহাকার। সব দেখবেন, বোম্বাই গিয়ে বসে আছে। সব ফিমস্টার হবে। আপনার মেয়ে?
প্রশ্নটা পঙ্কজবাবুকে। অক্ষয়বাবু বললেন, না না, ওনার মেয়ে নয়। আমার এক পরিচিত ভদ্রলোকের মেয়ে। আজকের কাগজে একটা আন-আইডেন্টিফায়েড ডেডবডির ছবি বেরিয়েছে। ভাল বোঝা যাচ্ছে না। সেইটাই আমরা একবার দেখতে চাই।
সারা সকাল কী করছিলেন অক্ষয়দা? এই শেষরাতে এসব ঝামেলা?
একটু উপকার করো ভাই। তোমার তো সবে সন্ধে। তুমি একবার গিয়ে দাঁড়ালে, কারুর বাপের ক্ষমতা নেই না বলে।
বসুন তা হলে, তৈরি হয়ে আসি। কিছু খাবেন?
না না, আমরা খেয়েই এসেছি।
কাগজটা সঙ্গে এনেছেন?
উত্তর আমিই দিলাম, আজ্ঞে হ্যাঁ, এনেছি।
ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে সরোজবাবু বললেন, দেশে প্রেমের বন্যা বইছে রে বাবা!
ভেতর থেকে অর্গানের সুর ভেসে এল। রবীন্দ্রসংগীত বাজছে। পঙ্কজবাবু বললেন, কে বাজাচ্ছে অক্ষয়? বড় মার্ভেলাস হাত।
সরোজের স্ত্রী। মারাঠি মেয়ে। ভীষণ ভাল নাচে। লোকে টিকিট কেটে দেখতে যায়।
মারাঠি মেয়ে বাঙালিকে বিয়ে করেছে? স্ট্রেঞ্জ!
স্বাধীনতার পর সবেতেই স্বাধীনতা এসেছে, পঙ্কজদা।
দু’জনের বয়েসের অনেক ডিফারেন্স!
ওসব কিছু না। মনের মিল হলে বয়েসফয়েস কিছু না।
সরোজবাবু বেশ পালটে ঘরে এলেন। ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো চুল। সাদা প্যান্ট, সাদা জামা। প্রায় ফুট ছয়েক লম্বা। ক্রিকেট ক্যাপ্টেনের মতো দেখাচ্ছে। দেয়াল থেকে রিভলভারটা নিয়ে কোমরের বেল্টে খুঁজছেন, অক্ষয়বাবু বললেন, তুমি কি যুদ্ধে যাচ্ছ? রিভলভার কী হবে?
সরোজবাবু হাসলেন, অক্ষয়দা, কয়েক হাজার শত্রু এই শহরে ঘুরছে। মরার আগে একটু বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। অর্গানে বাজতে লাগল, খর বায়ু বয় বেগে, চারিদিক ছায় মেঘে, ওগো নেয়ে নাওখানি বাইয়ো।
১.৩৭ লাখোঁ সুনন্দার সপ্নোভিতে
সরোজবাবু কাগজের বিজ্ঞপ্তিটা দেখে বললেন, ইউনিভার্সিটির পেছনের সেই মর্গেই আমাদের যেতে হবে। দেখি যদি সাধুকে পেয়ে যাই, কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
পঙ্কজবাবুর গাড়ি এখন বেশ ভারী হয়েছে। তাই যেন গুড়গুড় করে চলেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় দারুণ দেখাবে। জনতার মাথার ওপর দিয়ে হুড়হুড় করে উড়ে চলেছে কিংকং-এর মতো এক দৈত্য। সঙ্গে তার ছানাপোনা। গাড়ি কলুটোলায় এসে ডান দিকে বাঁক নিল। বাঁ পাশে রাস্তা ঘেঁষে গাড়ি দাঁড়াল। সরোজবাবু নামতেই গাড়ি আধ হাতটাক ওপরে উঠে গেল।
ফুটপাথের ধারে ভলভল গঙ্গার জল বেরোচ্ছে ফোয়ারার মতো। মেয়ে-পুরুষের ভিড়। মনেই হয় না, এর উলটো দিকের বিমর্ষ চেহারার লম্বাটে ঘরে সারি সারি শুয়ে আছে প্রাণহীন দেহ। সরোজবাবু সাধুর খোঁজে গেছেন।
