তুমি কিছু বলছ না বলেই, আমাকে বকবক করতে হচ্ছে। তোমার বাবা বলছিলেন, তোমার নাকি উড়ুউড়ু সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসী ভাব।
অক্ষয়বাবু সামনের আসন থেকে বললেন, ওর হাত আমি দেখেছি পঙ্কজদা, সন্ন্যাসযোগ আছে। সংসার ছাড়লে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
অপর্ণা বললে, সন্ন্যাসী হতে হলে কী করতে হয় বাবা?
উত্তর দিলেন অক্ষয় কাকাবাবু, সব ছেড়ে চলে যেতে হয় মা।
কোথায়?
কোনও আশ্রমে, পাহাড়ের গুহায়।
পঙ্কজবাবু বললেন, গৃহী সন্ন্যাসীও হওয়া যায়। আমাদের গুরুদেব গৃহী সন্ন্যাসী।
হ্যাঁ, তারা হলেন অবধূত।
অপর্ণা বললে, গৃহী সন্ন্যাসী হওয়াই ভাল।
অক্ষয় কাকাবাবু শব্দ করে হাসলেন।
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে সোজা গিয়ে, গাড়ি বাঁয়ে বাঁক নিয়ে যে রাস্তায় চুল, সেটা হল বিডন স্ট্রিট। সাবেক আমলের বড় বড় থাম-অলা বিশাল বাড়ি। গেট আছে। গেটের বাইরে একটি প্রস্তর ফলক। সেই ফলকে ডক্টর বি. ডি পর্যন্ত পড়া যায়, বাকি সব ধুয়েমুছে গেছে।
বিশাল বাড়ি মানেই ভাঙা বাড়ি হওয়া উচিত। এ বাড়ি কিন্তু সেরকম নয়। বেশ ভালই আছে। দেখলে মনে হয় লক্ষ্মীছাড়া হয়নি। বাগান, গাড়িবারান্দা, বাগানঘর, সাবুগাছ, ঝিলমিল লাগানো– গভীর বারান্দা, ঝাড়লণ্ঠন। অতীত এখনও আঁকিয়ে বসে আছে, হিসেবি বৃদ্ধের মতো।
গেটে চাকা লাগানো আছে। ঠেলতেই ঘড়ঘড় করে খুলে গেল। গম্ভীর গলায় কুকুরের ডাক। পুরুষকণ্ঠের ধমক, অ্যাস্টার, অ্যাস্টার। মেয়েদের দমকা হাসি। রেডিয়ো থেকে উপচে-পড়া বেহাগে খেয়াল। সাবুগাছের পাতায় রাতের বাতাসের পাখা নাড়া-শব্দ। সব যেন কেমন স্বপ্নের মতো। এই বুঝি নিয়ম। এই বুঝি তার খেলা। কোথাও স্বপ্ন, কোথাও বাস্তব।
বসার ঘরে গোল একটা শ্বেতপাথরের টেবিল। কোণে কোণে ছোট ছোট টেবিল। কোনওটায় পাথরের মূর্তি, কোনওটায় পোর্সিলেন ভাস। এলাহি ব্যাপার। দেয়ালে বিশাল বিশাল ছবি। মনটা কেমন যেন করে ওঠে। ফিনফিনে গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি পরে, সুন্দর চেহারার এক ভদ্রলোক জুতো মসমঁসিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, দাদা এলে? তোমার দেরি দেখে বউদি ছটফট করছে।
ভদ্রলোক চলে গেলেন। বাতাসে একটা সুবাস ঘুরপাক খেতে লাগল।
ঘরে এইবার যে-মহিলা এসে ঢুকলেন, তাঁর কাছে ঘরের বাতিও ম্লান হয়ে গেল। জীবনে অতবড় খোঁপা আমি দেখিনি। মহিলা ভীষণ আবেগে কিছু বলতে গিয়েছিলেন, আমাদের দেখে রাশ টানলেন। মাথায় এক চিলতে ঘোমটা টেনে দিয়ে বললেন, এত দেরি হল?
পঙ্কজবাবু বললেন, কী এমন দেরি গো, এই তো সবে সন্ধে হল। ছোটবাবু ইভনিং ওয়াকে গেলেন। ছোটবাবুকে দেখে ঘড়ি মেলাতে যেয়ো না।
অক্ষয় কাকাবাবু আগেও মনে হয় এ বাড়িতে এসেছেন। মহিলা বললেন, কী অক্ষয় ঠাকুরপো, পথ ভুলে!
অক্ষয়বাবু উত্তরে শুধু হাসলেন। হেসে বিশাল একটা সোফায় শরীরের ভার ফেলে দিলেন। স্প্রিং তাকে দোলাতে লাগল। যেন ঢেউয়ে ভাসছেন।
আমি পড়েছি মহা বিপদে। এত বড় ঘর, সুন্দর সুন্দর চেহারা। নিজেকে মনে হচ্ছে লেড়ি কুকুর। হঠাৎ তাড়া খেয়ে ঢুকে পড়েছি।
পঙ্কজবাবু বললেন, তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। এই সেই বালক, মায়ের মৃত্যুর পর যাকে তুমি দত্তক নিতে চেয়েছিলে।
অ্যাঁ, এই সেই পিন্টু। ও মা কত বড় হয়ে গেছিস রে তুই?
মহিলা আবেগে উচ্ছ্বাসে, আমাকে বুকে টেনে নিলেন। মাথাটা বুকের ওপর। যে-চোখটা খোলা, সেই চোখের সামনে হারের লকেটে লাগানো লাল একটা পাথর, আলো পড়ে ধকধক করছে।
মহিলার একটা হাত আমার মাথার চুলে খেলা করছে।
তুই আমার কাছে থাকলে এতদিনে আরও সুন্দর করে দিতুম।
পঙ্কজবাবু বললেন, সুধা, ওকে ছাড়ো। এখন আমাদের অনেক কাজ। তুমি চট করে গাড়ির চাবিটা এনে দাও।
এখন আবার বেরোবে?
হ্যাঁ, আমাদের ভীষণ একটা কাজ পড়েছে। ফিরতে রাত হলে ভেবো না।
পিন্টুও যাবে?
হ্যাঁ, ওকে তো যেতেই হবে।
ওমা। ছেলেটাকে একটুও বসতে দেবে না?
ফিরে এসে বসবে। আগে কাজ।
টুক করে একটা প্রণাম সেরে নিলুম ফাঁক পেয়ে। ভাবাই যায় না, ইনি আমাকে মায়ের স্নেহে মানুষ করতে চেয়েছিলেন। মরুভূমি আর নদী একই পৃথিবীর দুটি দিক।
অপর্ণা কেমন টুক করে ভেতরে চলে গেছে। কী জানি কেমন মেয়ে। চালিয়াত বলে তো মনে হল না। তবে এঁরা বেশ বড়লোক। বড়লোকি চাল থাকলে কিছু বলার নেই।
পঙ্কজবাবুর গাড়িটা বেশ মজার। মাথাটা খোলা যায় আবার বন্ধ করা যায়। কী যেন একটা নাম বললেন, সান বিম। মাথার ওপর শহর ছুটে চলেছে হুহু করে। বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। আকাশও ছুটছে। পঙ্কজবাবুই গাড়ি চালাচ্ছেন। অক্ষয়বাবু পাশে বসে আছেন দৈত্যের মতো। আমি এক লিলিপুট পেছনের আসনে।
পঙ্কজবাবুর কবজিতে সোনার চেনে বাঁধা সোনার হাতঘড়ি চিকচিক করছে।
আমরা প্রথমে তা হলে কোথায় যাব! লালবাজারে?
অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, অসময়ে লালবাজারে গিয়ে শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই।
তা হলে ভবানীপুরে আমার সেই আত্মীয়ের বাড়ি যাব?
আগে মলঙ্গা লেনে আমার সেই বন্ধুর ডেরায় যাওয়াই ভাল। এখন তাকে পাবই।
সরু গলি। গাড়ি ঢুকবে না। একটা তিনকোনা পার্কের পাশে গাড়ি রেখে, আমাদের পদযাত্রা শুরু হল। ভাঙাভাঙা একটা বাড়ির দোতলা থেকে আর্ত চিৎকার উঠল, খুন খুন।
