পিতারও সেই এক কথা। এ জীবনটা বইয়ের ধুলোটুলো ঝেড়ে নাও, নেড়েচেড়ে দেখে যাও, আসছেবার ভেতরে ঢুকতে পারবে। মানুষের মতো চেহারা হলেই মানুষ হয় না। জন্ম হল অঙ্কের। ব্যাপার, ফ্রিকোয়েন্সির ব্যাপার। এককোষী প্রাণী থেকে বিবর্তনের ধারা অনুসরণ করে বহুঁকোষী। প্রাণী, ভেড়া, ছাগল, গাধা, ঘোড়া, বাঁদর, প্রথম মানুষ জনম। দেহ আকৃতি মানুষের মতো, ভেতরটা গাধা-বাঁদর কম্বিনেশন। গাধা যুক্ত নর ইজ ইকোয়াল টু গানর। গাবানর। সেই গল্পের মতো, মনুষ্যচর্মাবৃত একটি গর্দভ, লাস্ট বেঞ্চে বসে পেনসিল চিবোচ্ছে। দিনের অর্ধেক কেটে গেল নিলডাউন হয়ে হাতে থান ইট নিয়ে। এইবার জন্মে যাও। জন্মাতে জন্মাতে জন্মাতে নিউটন কি। রাসেল, র্যাফেল কি রোদেনস্টাইন। লাখখাবার জন্মালে তবেই আকৃতি আর প্রকৃতি দুটোতেই মানুষ। হবে। তার আগে নয়। দু’জন পাশাপাশি বসে আছে, ট্রেনে কি ট্রামে। দু’জনই মানুষের মতো। দেখতে। হলে হবে কী? একটু নাড়াচাড়া করে দেখলেই বেরিয়ে পড়বে, একজন মানুষ আর একজন কোটপ্যান্ট পরা বনমানুষ।
সোম থেকে শনি, বইয়ের ধুলো ঝাড়ার ক্যালেন্ডার তৈরিই আছে। রবিবার যেন লিপ ইয়ার। কাজের ওপর কাজ। সারা বাড়িতে গোটা চোদ্দো মোগলাই আলমারি। তার মাথা আছে, তলা আছে, দেয়ালের দিকে পিছন করা পৃষ্ঠদেশ আছে। চেয়ারের ওপর টুল ফিট করে মাথা সাফ করো। টুলের চারটে পায়াই স্ট্যান্ড-অ্যাট-ইজের ভঙ্গিতে ছেতরে থাকে। চেয়ারে তিনি কোনওক্রমে খাড়া হবেন। সবসময়েই ভয়, সীমানা ছেড়ে যে-কোনও একদিকে ঝুলে না পড়েন। জয় তারা বলে সেই মনুমেন্টে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, রাখে কেষ্ট মারে কে, মারে কেষ্ট রাখে কে! হাতে একটি ঝাড়ন। ঝাড়ো ধুলো। প্রথম ঝাঁপটাতেই নাকে কিছু ঢুকবে। সঙ্গে সঙ্গে গোটাতকত হাচি গেট-খোলা কুকুরের মতো তেড়ে বেরিয়ে আসবে। স্বর্গের কাছাকাছি জায়গায় দাঁড়িয়ে সেই বিপুল হাঁচির বেগে টুলচ্যুত হয়ে দেবতার মর্তে পপাত হবার সম্ভাবনা যোলো আনার জায়গায় আঠারো আনা হবে। পিতা তখন হয়তো এমরি পেপার ঘষে পোর্টম্যানের মরচে তুলছেন। কমলালেবু রং পালটে এবার নীল রং হবে। নিত্যনতুন রূপে সংসারকে সাজাতে হবে। নয়তো জীবনরসে ভাটা পড়বে। মাই ডিয়ার স্যার, স্ট্যাগনেশন ইজ ডেথ। শূন্যে তাকিয়ে পিতা বললেন, নাক টিপে, নাক টিপে।
সময় সময় নাকে রুমাল বেঁধে রঘু ডাকাতের বাচ্চা হয়ে ধুলো ঝাড়া চলে। সে বড় অসুবিধের। ডাকাতি আর ডাস্টিং, ডকারান্ত হলেও আকাশ পাতাল প্রভেদ, এক নয়। মাথা সাফাইয়ের পর তলা সাফ। সারা সপ্তাহের মালমশলা তলদেশে তরিবাদি করে জমিয়ে রাখা হয়েছে। হাঁটু গেড়ে বসে, ঘাড় হেঁট করে, খাটো ঝাটা দিয়ে টেনে টেনে বের করো। ইঁদুরের ডাইনিংরুম। শালপাতার ঠোঙা, পাউরুটির খোল, ভঁটার ছিবড়ে, মাছের কাটা, যখন যা পেরেছে, টেনে টেনে নিয়ে গেছে। ভোজের পর বিয়েবাড়ির বাইরের আঁস্তাকুড়ের অবস্থা। তকতকে পরিষ্কার চাই। মনে রাখবে, ক্লিনলিনেস ইজ নেক্সট টু গডলিনেস। দেয়াল আর আলমারির মাঝখানের অংশ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাঘা বাঘা এক্সপ্লোরারদেরও অজানা, ডার্কেস্ট আফ্রিকা। মানচিত্রে স্থান নেই। ঝুল, মাকড়সা, আরশোলা। ড্রাকুলা, এমনকী ভ্যাম্পায়ার বেরোলেও অবাক হবার কিছু নেই।
সব শেষ, ভেতর। মাল নামাও, ঝাড়ো, আবার মাল তোলো৷ ওঠ বোস। বোস ওঠ। তখনই ভাবনা আসে, সংসার এক বিচিত্র পুতুলখেলা। কিছু বই, কিছু বাক্সপ্যাটরা, কৌটোকাটা, ন্যাকড়াচোপড়া, গোটাকতক শাল, আলোয়ান, জাম্পার, মাফলার, পুলওভার। সব নিয়ে ন্যাজেগোবরে। একবার এদিকে রাখছে, ওদিকে রাখছে। হিয়া কামাল হুয়া, হুয়া কা মাল হিয়া। তালা, চাবি, হিসেবের খাতা, ক্যাশবাক্স। রাবিশের হিসেব সামলাতে চুল পড়ে মাথায় মসৃণ টাক।
ভব পান্থবাসে এসে
কেঁদে কেঁদে হেসে হেসে
ভুগে ভুগে কেশে কেশে
দেশে দেশে ভেসে ভেসে
জীবনটা যে এত হিসেবের, আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না। সবসময়েই যেন যুদ্ধ চলেছে। একটু তালে ভুল হলেই ছিটকে চলে গেলে। আর ফেরার পথ নেই। শুধু এগিয়ে চলল, এগিয়ে চলো। কোথায়? আর কোনও জবাব নেই। থাকলেও, খুব হেঁয়ালির উত্তর। কেন? জীবনের লক্ষ্যে। কে যে কীসের লক্ষ্যে পৌঁছোচ্ছে। সবাই যেন সুকুমার রায়ের সেই লড়াই-খ্যাপা। কখনও যায় সামনে তেড়ে, কখনও যায় পাছে। উৎসাহেতে গরম হয়ে তিড়িং বিড়িং নাচে। মাতামহের কাছ থেকে পিতাঠাকুর একটি কথা শিখেছেন, ভোগ একপ্রকার রোগ বিশেষ। উঠতে বসতে এখন সেই নয়া বিধানের প্রয়োগ। ওই এক ব্ৰহ্মাস্ত্রে সব চাওয়া-পাওয়া ওঠাবসা খারিজ।
কেউ এসে বললেন, আহা ছেলেটার শরীর বড় খারাপ, একটু মেটের ঝোল, সঙ্গে একটি গুর্দা। দিতে পারলে গত্তি লাগত। সঙ্গে সঙ্গে খারিজ, ভোগ একপ্রকার রোগ বিশেষ। একটা করে নরম পাকের শাঁখ সন্দেশ? সঙ্গে সঙ্গে সেই এক খারিজ মন্ত্র। এর ওপর কোথা থেকে পাড়ায় এক মেনিদা নামক ভদ্রলোক এসেছেন! এসব মানুষের খবর পিতার বীর ভাণ্ডারে আসবেই। তিনি দশমাইল পথ হেঁটে অফিসে যান, হেঁটে ফিরে আসেন। অভাব নয়, স্বভাব। সব অসুখই তার প্রাকৃতিক চিকিৎসায় সারে। সর্দি-জ্বর! নাসে, মাসে, বাসে। তিনি প্রথম দুটি রেখে মাঝের মাংস দাওয়াইটি বাতিল করে দিয়েছেন। এ বেলা একটু সরষের তেল দু’নাকে সাঁ করে টেনে নাও, মেরে দাও এক গেলাস জল। ও বেলাও তাই। নাস আর উপবাস। তারপর ছোট্ট একটি গালাগাল সহ উপসংহার, সর্দিজ্বরের বাবা সারবে শালা। পেটের গোলমাল? তলপেটে মৃত্তিকার প্রলেপ। প্রথমে উলঙ্গ। দ্বিতীয় ধাপে, মাটি ফাইন করে মেড়ে সেরটাক তলপেটে চাপিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকো। শুকোতে শুকোতে একসময় ঝরতে থাকবে। পেটে তিনবার চাটি মেরে উঠে পড়ো। এই সর্বনেশে মানুষটি আমার বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছেন। চেহারা শুষ্কং কাষ্ঠং। মানুষের পক্ষে এর চেয়ে রোগা হওয়া সম্ভব নয়। এই বস্তুটির সঙ্গে একজন স্ত্রীজাতি আছেন। তার তৈরি প্রায় আধ ডজনের মতো ভবিষ্যতের স্ত্রী-পুং মেনি আছে। আমার বন্ধু সুখেন একটু অকালে পেকেছে। নরনারীর যৌন জীবন নিয়ে তার নিত্যনতুন আলোকপাতে আমরা সময় সময় বেসামাল হয়ে পড়ি। সে বলে পুং মেনি আর স্ত্রী মেনির ঘর্ষণে রাতে ওঁদের উত্তরের ঘরে আগুন জ্বলে। কাঠে কাঠে ঘষা লাগলে কী হয় রে ব্যাটা? দুটোই তো চকমকি? ডজন কমপ্লিট করে রিটায়ার করবে। সে যাই হোক। কে কী করবে, তা নিয়ে সুখেনের মাথাব্যথা থাকলেও আমার নেই। সেদিন গভীর রাতে মেনিদা বাড়ি ফিরে শোবার ঘরের জানলার গরাদে হাত আলুলায়িত করে মিসেস মেনিকে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করছেন। গলা প্রেমরসে টসটসে। ঘুমচোখে স্বামীর মুখ দেখে স্ত্রী বুবু করে অজ্ঞান। মুখে গাজলা। ছোট্ট পাড়া। তা ছাড়া যে-পাড়ায় সুখেনের মতো প্রতিভা, সে পাড়ায় এমন একটা ঘটনা, কাগজে ছাপা না হলেও, ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয় না।
