সিঁড়ির বাঁকের বড় ধাপে, পিতৃদেবের সেই তুলোধোনা যন্ত্র প্রহরীর মতো খাড়া। এটাকে দেখলেই আমার কনকের কথা মনে পড়ে যায়। যে-রাতে এটা এল সে রাতে শিল পড়েছিল। কনক পাঁপড় ভেজে মাতামহকে খাইয়েছিল। সেই রাতেই প্রথম আমার বুকে এসেছিল নারী নয়, নারীর পরিধেয় বস্ত্র। সেই রাতেই উচ্ছ্বসিত পিতা বলেছিলেন, তোমার মতো একটা মেয়ে পেলে এই সংসারে আবার আমি ফুল ফুটিয়ে ছেড়ে দিতুম। সুখের দিন যেন স্রোতের ভাসমান ফুলের মতো। এক ঘাট থেকে আর এক ঘাট হয়ে, ভাসতে ভাসতে কোথায় চলে যায়।
অপর্ণা সেই তুলোধোনা যন্ত্র দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল, এটা কী? বাজনা? বাজিয়ে দেখব!
তাতে টুসকি মারতেই, বুং করে খুব বোকাবোকা, বোদা একটা শব্দ হল। তাতটা মনে হয় বোকাপাঁঠার ছিল।
অপর্ণার খুব আনন্দ হয়েছে, আর একবার বাজাব?
বাজাও! অ্যায় তুমি বলে ফেলেছি। খেয়াল করেনি। যন্ত্রে বিভোর। করলেও কিছু করার নেই। এত পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, আপনি বলতে পারছি না। সবকিছুর একটা সীমা আছে। আমি তেমন বকাটে ছেলে হলে, যা-তা কিছু একটা করে ফেলতে পারতুম। যা ভাবা যায়, তা করা যায় না বলেই আমরা মানুষ। একে বলে চরিত্র। একে বলে সংযম।
আবার একবার বুং করে শব্দ হল। অপর্ণার খুব মজা। খিলখিল করে হেসে বললে, কেমন একটা শিং শিং আওয়াজ। এ যন্ত্র মনে হয়, সিঙ্গিমামার আসরে বাজে।
ধরেছ ঠিক। নাও চলো।
দাঁড়াও না।
বলেই অপর্ণা জিভ কাটল। আমার চোখে তার স্থির চোখ। মোটেই বিব্রত নয়। আদৌ লজ্জা পায়নি। শুধু মনে মনে একটু কাছাকাছি সরে আসার দুষ্টুমি। জিভ ঢুকিয়ে নিয়ে একেবারে ছেলেমানুষের মতো বললে, কী বলে ফেললুম?
বেশ করেছ। এখন ওপরে চলো। ওরা আসছে।
এটা কী বলো না? চেনাচেনা মনে হচ্ছে।
এ হল তুলোধোনা যন্ত্র। লেপ তোশক তৈরির সময় লাগে। ধুনুরির কাঁধে কাঁধে ঘোরে। কাকিমা মুকুকে নিয়ে পেছনে এসে পড়েছেন।
বাবা, কতক্ষণ ধরে তোমরা এই ক’ধাপ মাত্র উঠেছ? শাবাশ, নওজোয়ান!
এই গানটা এখন খুব শোনা যায়। আমরা নওজোয়ান। কাকিমাও শুনে থাকবেন। অপর্ণা বুং করে একটা শব্দ তুলে, উদ্ভাসিত মুখে বললে, কী সুন্দর!
কাকিমা বললেন, হ্যাঁ, তোমার বিয়েতে নবতের সঙ্গে বটঠাকুরকে এসরাজ ছেড়ে বাজাতে বলব। দুটিতে তো বেশ জোড়ে দাঁড়িয়েছ। কত্তাকে একবার ডেকে দেখাব?
অপর্ণা দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে বলতে লাগল, না না লক্ষীটি না।
কাকিমা বলতে লাগলেন, ওরে পাগলি, কাপড় জড়িয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবি। কী ডাকাত মেয়ে রে বাবা! ছাতে উঠে অপর্ণা হাঁপাচ্ছে। ভারী বুক উঠছে আর নামছে। মেয়েটার তো খুব প্রাণ আছে। কনকের মধ্যে একটা বড়দি-বড়দি ভাব ছিল। এ একেবারে ভিন্ন জাতের টগবগে মেয়ে।
ন্যাড়া ছাদের আলসেতে শাড়ি গুটিয়ে বসে অপর্ণা বললে, উঃ হাঁপিয়ে গেছি। এক গেলাস জল খেয়ে আসি।
কাকিমা বললেন, দয়া করে তুমি ওই আলসে থেকে নেমে বোসো। মাথা ঘুরে টাল খেয়ে ওপাশে পড়ে গেলে সর্বনাশ হবে, মা।
হ্যাঁ পড়লেই হল। আমি কি বুড়ি হয়ে গেছি? আঃ কী সুন্দর ছাদ!
হ্যাঁ, সুন্দর ছাদ। তুমি নেমে মাদুরে বোসো।
অপর্ণা আলসে থেকে নেমে মাদুরে পা ছড়িয়ে বসল রানির মতো। কাকিমা বললেন, এমন টুকটুকে পা, একটু আলতা পরো না কেন?
অপর্ণা নিজের পা দুটো ভাল করে দেখতে দেখতে বললে, বড় ছটফটে, বড় অবাধ্য।
আপনারা বসুন, আমি এক গেলাস জল নিয়ে আসি।
কাকিমা বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, নিয়ে এসো, সেবা করতে শেখো।
অপর্ণা বললে, না না, আমি নীচে গিয়ে খেয়ে আসছি।
তুমি চুপ করে বোসো তো। একদম ছটফট করবে না।
তা হলে আমি একটু শুয়েই পড়ি।
অপর্ণা মাদুরে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। চারপাশে কড়ার মতো উপুড় হয়ে পড়েছে ঘন নীল আকাশ। কসমস গাছে অজস্র ফুল এসেছে, সাদা, বেগুনি। অপর্ণার হলদে শাড়ির জমিতে খয়েরি ডুরে। ওপর-বাহুর তলার দিক, কোমরের কিছু অংশ, আর দুটো পা, নতুন আবিষ্কারের মতো মাদুরে সাজানো রয়েছে। মেয়েরা জানে না, মেয়েদের কোন কোন জিনিস কতটা মারাত্মক! বহু উঁচুতে আকাশের চাঁদোয়ায় চিল ঘুরপাক খাচ্ছে। রায়সায়েবদের বাড়ির এরিয়েলের তারে বসে দুটো দোয়েল খুব শিস দিচ্ছে, আর ন্যাজ নাচাচ্ছে। মুকু গোবদা মুখে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
কাকিমা বললেন, এসো, একপাশে বোসো। মহারানি তিন কাঠা জায়গা নিয়ে শুয়েছেন। অবেলায় আলসে লেগেছে। ভাব এসে গেছে।
মুকুর মনে হয় হিংসে হয়েছে। মেয়েদের হিংসে কি ছেলেদের চেয়ে বেশি?
জল আনতেই অপর্ণা উঠে বসল। আলগোছে কলকল করে জল খাচ্ছে। মুখের হাঁ ছোট্ট এতটুকু। ভেতরটা লাল টকটকে। ইঁদুরের মতো ছোট্ট ছোট্ট সাজানো দাঁত। জিভটা যেন সাপের মতো হিলহিল করছে। এ সাপ অন্য সাপ, বড় অমৃত, বড় অমৃত।
খুব ভাল করে ভেবে দেখো তুমি, এখনও রয়েছে
ফিরিবার অবসর,
শুধু নিমিষের ভুলের লাগিয়া কঁদিবে যে তুমি,
সারাটি জনম ভর।
কাকিমা বললেন, রানি এইবার এক-এক খিলি পান। ঠোঁটদুটো লাল টুকটুকে হবে। টুকটুকে লাল ঠোঁট চুষে চুষে খাই।
যাঃ অসভ্য, বলে অপর্ণা কাকিমাকে ঠেলা মারল। আমি ভালমানুষের মতো মুখ করে, আকাশের চিল দেখতে লাগলুম, যেন আমি চিল-বিশারদ। মনে ভাবছি একটি লাইন, ঘঁচিপান দিয়ে ঠোঁটেরে রাঙালে, তখনই তা মোছে ঠোঁটেরই হাসির ঘায়ে।
