পিতা বললেন, জয় রাম, জয় রাম।
মাতামহ শব্দ করে হাসলেন, যার অর্থ, জানতুম, জানতুম এইরকমই হবে।
মেসোমশাই কাকিমাকে দেখিয়ে বললেন, আর করলেন বটে ইনি! মাকেও হার মানিয়েছেন। আর কি সেঁকের দরকার হবে?
চেটো গরম হয়েছে?
কাকিমা বললেন, হ্যাঁ হয়েছে।
ব্যস, তা হলে ছেড়ে দাও। তোমরা খাওয়া সেরে নাও। বিনয়দাকে এখন একটু গরম দুধ খাওয়াতে হবে।
আমার কিন্তু বেশ ঝাল ঝাল একটা কিছু খেতে ইচ্ছে করছে।
না, আজ না, আজ আর অত্যাচারী কিছু চলবে না। আজ সব হালকা। সন্ধে হয়ে আসছে, তা না হলে ফলের রস দেওয়া যেত। আপনি খাবেন পরেশের বিখ্যাত নরমপাক, থিন অ্যারারুট আর গরম। দুধ। রাতে জ্বর না এলে, কাল সকালে মাছের ঝোল আর ভাত।
মাতামহ বললেন, জীবনে আর জ্বর হবে না। শেষ জ্বর হয়ে গেল।
মুকু আর অপর্ণাকে খেতে বসিয়ে কাকিমা এক অদ্ভুত কথা বললেন, তোমরা বসে বসে খাও। ভাই, ওদিকে আমার ভাত আর পুঁইডাটা কড়কড়িয়ে গেল।
অপর্ণা বললে, তার মানে? আপনি আমাদের সঙ্গে বসবেন না? তা হলে আমরাও উঠে পড়লুম।
কাকিমা বিব্রত মুখে বললেন, আমি যে ভাই আগেই আমার মতো বেঁধে ফেলেছি। না খেলে যে সব নষ্ট হয়ে যাবে।
পিতার প্রবেশ হল। জিজ্ঞেস করলেন, কী তোমাদের সমস্যা! সব হাত গুটিয়ে বসে আছে এখনও?
অপর্ণা বললে, ইনি খেতে চাইছেন না।
কেন? কেন বউঠান, তুমি খাবে না! আমি তোমাকে বলিনি বলে! যাও, বসে পড়ো। তুমি আমাকে দুঃখ দিতে চাও? তুমি আমাকে বিব্রত করতে চাও? আজ আমাদের বড় আনন্দের দিন। উৎসবের দিন। বিনয়দা তিনঘণ্টায় সেরে উঠলেন। কত বড় একজন মহাপুরুষ পায়ের ধুলো দিয়ে গেলেন। তুমি জানো না বউঠান, আজকের দিনটার কী অর্থ। এ এক দিন-ছাড়া দিন। আনন্দ করো আনন্দ করো। জীবন বড় ছোট, বড় দুঃখে ভরা। ওই যে মেয়েটি, ওর দিকে আমি তাকিয়ে আছি। জয় রাম, জয় রাম।
কাকিমার চোখে জল গড়াচ্ছে।
একী, তুমি কাঁদছ? দুঃখে, না আনন্দে!
কাকিমা ফিসফিস করে বললেন, আনন্দে। আমাকে কেউ কখনও এতটুকু স্নেহ করেনি। আপনি করলেন। আপনার কাছে কাছে সারাজীবন যদি থাকতে পারতুম!
পিতা চমকে উঠলেন, না না, খবরদার ও কামনা কোরো না। আমাকে যে চায় তাকে চলে যেতে হয়। এই আমার ভাগ্য, এই আমার গ্রহ।
কাকিমা এবার বেশ জোরে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অশ্রুমোচন করতে লাগলেন। মেয়েদুটি হাত গুটিয়ে আসনে বসে আছে হাঁ করে। বড়দের আবেগ বোঝার বয়স ওদের হয়নি। দু’জনেই সম্পন্ন ঘরের মেয়ে। দুঃখ কাকে বলে জানা হয়নি। পিতা ঘর ছেড়ে চলে গেছেন। আমার মনে পড়ছে। নৌকোয় দেখা সেই সতীমার কথা। বলেছিলেন, কিছু মানুষ আসে যারা কিছু পায় না। আগুনের গোলার মতো। তারা যে জায়গা দিয়ে যায়, সবকিছু পোড়াতে পোড়াতে যায়। তারা হল মানুষ-উট। মরুভূমিতেই যার চলাফেরা। এতটুকু ছায়া নেই। দগ্ধ, তাম্রবর্ণ, ধুধু বালির বিস্তার। যত দূরে তাকাও, মৃত্তিকা নেই, জল নেই, বৃক্ষরাজি নেই।
মাতামহ একটি সোফায় বুকের কাছে মাথা ঝুলিয়ে ঝিম মেরে বসে আছেন। পঙ্কজবাবু আর একটিতে বেশ আয়েশ করে বসে, সেদিনের খবরের কাগজটি পড়ার চেষ্টা করছেন। পিতা বসেছেন হোমিওপ্যাথি গৃহচিকিৎসার বই খুলে। মেসোমশাই উষ্ণ দুগ্ধপান করে অকাতরে ঘুমোচ্ছেন। কাকিমা উত্তরের বারান্দায় মুকুকে নিয়ে বসেছেন চুল বেঁধে দিতে। অপর্ণা বারান্দার রেলিং-এ কনুইয়ের ভর রেখে আকাশ, বাতাস, গাছ, পাখি দেখছে। যত বেলা বাড়ছে, রূপ যেন ততই খুলছে। মুখটা সিঁদুরপানা হয়ে উঠেছে।
আর আমি? দেয়ালে হিমালয়ের একটা ছবি ঝুলছে। সেই দিকে তাকিয়ে ভাবছি, কাল আবার বেরোতে হবে। ঢুকতে-না-ঢুকতেই চাকরিতে অরুচি ধরে গেল। সামনে পড়ে আছে। সারাটা জীবন! যেখানে বসে আছি, সেখান থেকে বারান্দার একান্ত দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। মুকু দু’হাত দিয়ে চেপে চেপে ঢাউস খোঁপা সঠিক স্থানে ঝোলাবার চেষ্টা করছে। কাকিমা চিরুনি থেকে চুল ছাড়াচ্ছেন। অপর্ণা একইভাবে স্বপ্ন দেখছে। মেয়েটি সুন্দরী, তবে স্বভাবটি কেমন বোঝা গেল না।
কাকিমা দরজার সামনে এসে ইশারায় আমাকে ডাকলেন। অবেলায় খেয়ে শরীরটা বেশ ভারী হয়ে উঠেছে। বারান্দায় যেতেই কাকিমা বললেন, বুড়োদের দলে বসে বসে কী করছ! তোমার ভীষণ বুড়োটে স্বভাব হয়ে যাচ্ছে। মাদুরটা নিয়ে চলো ছাতে যাই। একটু পরেই তো চায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তুমি মাদুর পাতো গে যাও, আমি নীচে থেকে লুডোটা নিয়ে আসি। চারজন আছি, এক চাল খেলা যাক।
সেরেছে! তিনজন মেয়ে, একজন ছেলে। ভাবতেও আতঙ্ক হচ্ছে। এদিকে বলাইবাবু বিকেলের বারান্দায় হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন। কাকিমা তো লুডো খেলবেন বললেন, মুকু কি রাজি হবে!
অপর্ণা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বললে, আপনাদের ছাদে অনেক ফুলগাছ আছে তাই না?
হ্যাঁ, অনেক গাছ। বাবা একেবারে নার্সারি বানিয়ে ফেলেছেন।
চলুন যাই, বেশ সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে।
ভেতরটা কেমন যেন ছলাক করে উঠল। অপর্ণা এইভাবে যেচে ছাদে উঠতে চাইবে, ভাবাই যায় । এ যেন সেই মেঘ না চাইতেই জল, নাকি, জল না চাইতেই মেঘ। সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সুন্দরীদের সাধারণত বড় তোষামোদ করতে হয়।
যা ভেবেছিলুম তাই হল, অপর্ণা আগে আগে উঠতে লাগল। পেছনে মাদুর বগলে আমি এক মাধাই। এইরকম পরিস্থিতিতে অল্পবয়সি মানুষদের বড় কষ্ট হয়। ভেতরটা হাঁপাঁক করতে থাকে। সিঁড়ি থেকে সিঁড়িতে পা তোলার সময় শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। পায়ের গোছ প্রকাশিত হয়। মাথা খারাপ হয়ে যায়। ধর্ম, দেবতা, বেদ বেদান্ত সব ভেসে যায়। হাত পা ছুঁড়ে, দাঁত মুখ খিঁচিয়ে, বীরেনদার সেই গানের মতো, ভেসে যায় ভাসিয়ে নে যায়।
