লুডোর ছক পড়েছে। চারটে মাথা চারদিক থেকে সামনে ঝুঁকে আছে। ঘাড়ের কাছে খোঁপা লদলদ করছে। ছক নাড়ার খুড়শুড় শব্দ হচ্ছে। অপর্ণার এন্তার ছয় পড়ছে। সব খুঁটি বেরিয়ে ছকের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। দোর্দণ্ড প্রতাপে এগিয়ে চলেছে। অপর্ণার লাল। কাকিমার নীল। আমার সবুজ। মুকুর হলদে। কাকিমার কেবল এক পড়ছে নয়তো তিন। আমার যেমন বরাত, বলে ক্রমশই হতাশ হয়ে পড়ছেন। আমার তিনটে বেরিয়েছিল। দুটোকে অপর্ণা পত্রপাঠ ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। মুকুর দুটো বেরিয়েছে। বেরোলে কী হবে? অপর্ণার নাগালের মধ্যে। ও তো বলে বলে কাটছে। ছককা যেন ওর হাত ধরা! পড় পাঁচ তো পাঁচই পড়ল। আর কচাত করে মুকু উড়ে গেল। অপর্ণার গলায় গান গুনগুন করছে, মায়াবন বিহারিণী হরিণী, গহন স্বপন সঞ্চারিণী।
কানের পাশ দিয়ে বাতাস ঢালছে ফুরফুরিয়ে। লম্বা লম্বা চুল উড়ছে দিশাহারা হয়ে। আমার একপাশে অপর্ণা, আর একপাশে কাকিমা। অপর্ণার দিক থেকেই বাতাস বইছে। মাঝে মাঝে চুল উড়ে এসে আমার গালগলা ছুঁয়ে যাচ্ছে।
পড় তো তিন। ব্যস, আমার একটা খুঁটিই বাইরে ছিল, ঘরে ফিরে গেল। অপর্ণা আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, কী, মন খারাপ হয়ে গেল!
বলতে পারতুম, তোমার কাছে পরাজয়, সে তো আমার জয়। বড় বেশি নাটকীয় হয়ে যাবে। বীরের উক্তি, আবার আমি শুরু করছি, তোমায় নতুন করে পাব বলে, হারাই বারেবারে।
অপর্ণা বললে, সে কি লুডোর খুঁটি? সে তো ভালবাসার ধন!
কাকিমা বললেন, হ্যাঁ রে বুড়ি, সে তো ভালবাসারই ধন।
মুকু দান ফেলছে, চাল দিচ্ছে, কিন্তু কেমন যেন অন্যমনস্ক! পশ্চিম আকাশে সূর্যদেব পাটে নেমেছেন। আকাশ একেবারে কুমকুম-লাল। তালচটকা পাখি উড়ছে নেচে নেচে। কাকিমা বললেন, চায়ের সময় হল। যাই ব্যবস্থা করি। বটঠাকুর আবার চা-খোর মানুষ।
অপর্ণা বললে, আমার বাবাও তাই। মাঝে মাঝেই মায়ের সঙ্গে লেগে যায়। চা নিয়ে দক্ষযজ্ঞ। ছক গুটিয়ে কাকিমা নীচে চললেন। মুকু আর অপর্ণা বসে রইল মুখোমুখি। মুকুর মনে হয় অপর্ণাকে খুব ভাল লেগে গেছে। দু’জনেই ছাত্রী।
নীচের ঘরে বিশেষ একটা কিছু নিয়ে তিনজনেই ভীষণ ব্যস্ত। টেবিলে ল্যাম্প জ্বলে উঠেছে। তার আলোয়, ছড়ানো খবরের কাগজের পাতা। তিনটে মাথা তিন দিক থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। যা কথা হচ্ছে, সবই ফিসফিস করে। তিন মেজর জেনারেল যেন, রাতের আক্রমণের পরিকল্পনায় মশগুল।
পায়ের শব্দে তিনজনেই চমকে ফিরে তাকালেন। আমাকে দেখে বললেন, অ, তুমি? তাও ফিসফিস করে।
পিতা ফিসফিস করে ডাকলেন, এদিকে এসো।
আলোর বৃত্তে কাগজের যে-অংশ, সেই অংশে একটি ছবি।
দেখো তো। ভাল করে দেখো।
পুলিশের বিজ্ঞাপন, অশনাক্ত মৃতদেহ। ধেবড়ে কালো হয়ে আছে। একটি মেয়ে।
পিতা খুব চাপা স্বরে বললেন, সেই নাক, সেই কপাল, অনেকটা সেইরকমেরই মুখ। কী, তাই না?
১.৩৬ খরবায়ু বয় বেগে
পুলিশের ছাপা ছবি থেকে কাউকে শনাক্ত করা খুব সহজ কাজ নয়। তবু কোথাও সামান্য মিল খুঁজে পেলে বুকটা কেমন যেন হুঁত করে ওঠে। হাতপা অবশ হয়ে আসে। পিতা কাগজটা সরিয়ে ফেলতে ফেলতে বললেন, খুব সাবধান, বিনয়দা বা মুকু কারুর কানে যেন না যায়।
খুব চাপাস্বরে কথা হচ্ছে। পিতা মাঝে মাঝে দরজার দিকে তাকাচ্ছেন।
পঙ্কজবাবু বললেন, পুলিশের একজন ওপরঅলার সঙ্গে আমার খুব আলাপ আছে। বলিস তো আজই যা হয় একটা কিছু করা যায়।
ডাক ভেসে এল, হরিদা আছেন, হরিদা!
সব আলোচনা থেমে গেল। গলাটা খুবই চেনাচেনা। আর একবার ডাক আসতেই পিতা বললেন, হ্যাঁ, আছি। এসো, এসো অক্ষয়, এসো অক্ষয়।
পিতার সেই সহকর্মী বন্ধু, অক্ষয়কাকা, যিনি ভীষণ ভাল হাত দেখেন।
পঙ্কজবাবু বললেন, আরে, কী আশ্চর্য! ত ক্ষয়, তুমি এইসময়?
ভদ্রলোকের সেই এক পোশাক। খালি পা, বুক খোলা হাফহাতা মোটা পাঞ্জাবি, মোটা ধুতি। ঝাকড়া ঝাকড়া চুল। বড় বড় লাল চোখ।
পা দুটো পাপোশে ঝেড়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, কাছাকাছি একজনের হাত দেখতে এসেছিলুম, ভাবলুম একবার ঘুরে যাই।
পিতা বললেন, বোসো বোসো, তোমাকে ভাবান পাঠিয়েছেন।
কাকিমা আর অপর্ণা চা নিয়ে এসেছেন। পিতা বললেন, আর এক কাপ চাই। কিছু খাবার আছে?
অক্ষয়বাবু বললেন, এখন শুধু চা-তেই হবে। আছি তো, যাবার সময় হবে।
পঙ্কজবাবু বললেন, এই আমার মেয়ে, অক্ষয়। অপর্ণা।
অপর্ণা হাত তুলে নমস্কার করল।
বাঃ একেবারে লক্ষ্মী প্রতিমা। চন্দ্র তুঙ্গী। বুধ প্রবল। আপনি অতি ভাগ্যবান। মনে আছে, এই মেয়ে হবার পরই আপনার চড়চড় করে উন্নতি হতে লাগল। বউদিও অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন, আপনিও সুন্দর। তবে ইদানীং একটু মোটা হয়েছেন।
সে অক্ষয়, তোমার বউদির যত্নে। তা ছাড়া বয়েসও তো বাড়ছে।
সে তো হরিদারও বাড়ছে। দেখুন তো কেমন পাথর-কোঁদা শরীর। একচ্ছটাক মেদ নেই।
আহা, ও হল সাধক। ওর সঙ্গে তুলনা চলে না।
চা আসার পর, পিতা নিজে উঠে গিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিলেন। ভেতরের কথা যেন বাইরে না। যায়।
শোনো অক্ষয়, ঈশ্বরই আজ তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।
কেন বলুন তো? বেশ সশব্দে চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে, অক্ষয়বাবু সামলে নিলেন। মৃদু চুমুক মেরে বললেন, আজ আপনার মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন দেখছি। থেকে থেকেই ঈশ্বরের নাম করছেন। যা আগে কখনও করতেন না।
