দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মুকু বললে, বাবা ভীষণ ঘামছেন।
পিতা লাফিয়ে উঠলেন, জ্বর ছাড়ছে। জয় রাম! চলো দেখি।
কাকিমা হাতায় করে গরম ভাত তুলছিলেন। পিতাকে উঠতে দেখে বললেন, আপনি বসুন, আমরা দেখছি। ভাতটা দিয়ে নিই।
না না, আগে দেখাই ভাল। ওনার জন্যে মন ভীষণ চঞ্চল হয়ে আছে। যদি ছেড়ে গিয়ে থাকে, জয় রাম, জয় রাম!
পিতার কী সুন্দর ভক্তি এসে গেছে। অপর্ণার হাতে হাতা ধরিয়ে দিয়ে কাকিমা উঠে গেলেন। মেয়েটিও কম কাজের নয়! পঙ্কজবাবু বলতে লাগলেন, বুড়ি, গাদা গাদা দিসনি। বেলা হয়ে গেছে। কম কম দে।
মাতামহ বললেন, আমাকে মা যা দেবার তাই দিয়ো। খাওয়ার ব্যাপারে আমার বেলা-অবেলা নেই। পারলে একদিনেই দু’দিনেরটা মজুত করে নোব। কাল কী জুটবে কালই জানে।
অপর্ণা বললে, আপনি বাবার কথায় লজ্জা করে কম খাবেন কেন? বাবা তো পাশেই রয়েছেন, শেষে দু’জনে না কমপিটিশন লেগে যায়!
কাকিমা দরজার কাছে এসে বললেন, বটঠাকুর, একবার আসবেন?
পিতা উঠে গেলেন উদ্বিগ্ন মুখে। আমার পক্ষেও আর বসে থাকা সম্ভব হল না। মেসোমশাই মানে কনক। কনক সত্যিই ভাবিয়ে তুলেছে। মেয়েটা গেল কোথায়? কনক সত্যিই কি আর পৃথিবীতে নেই? হঠাৎ একেবারে উবে না গিয়ে, সে তো স্পষ্ট বললেই পারত, না বাবা, প্রতাপকে আমি বিয়ে করব না। মেসোমশাই কি জোর করে, নিজের কথায় মেয়ের বিয়ে দিতে পারতেন! এর পেছনে গভীর কোনও রহস্য, গভীর কোনও পাপ আছে। আমি গোয়েন্দা হলে নিজেই লেগে পড়তুম।
মানুষ যে এমন করে ঘামতে পারে আমার দেখা ছিল না। জ্বর তো আমাদেরও হয়, ঘাম দিয়েই ছেড়ে যায়। এ যেন এক অদ্ভুত ব্যাপার! মেসোমশাইকে কে যেন বিছানায় ফেলে চান করিয়ে দিয়েছে। কাকিমা একটা পাখা নিয়ে মাথার কাছে দাঁড়িয়েছেন। মুকু একেবারেই ছেলেমানুষ। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
পিতা বললেন, এখন একেবারেই হাওয়া করা চলবে না। কপালে একবার হাত দিয়ে দেখো তো!
কাকিমা বললেন, বরফ।
পায়ের চেটো?
বরফ।
তোয়ালে আনো, তোয়ালে আনন। শিগগির একটা হ্যারিকেন জ্বালার ব্যবস্থা করো।
তোয়ালে এনে পিতার হাতে দিতেই কাকিমা বললেন, আমার হাতে দিন, আমি জানি, কী করতে হবে। আপনি চট করে যা হয় দুটি খেয়ে আসুন। ওঁরা সব বসে আছেন।
তুমি পারবে সব? গা মোছাতে হবে, পায়ে সেঁক দিতে হবে।
সব পারব। আমাতে, মুকুতে সব করতে পারব। অপর্ণাকে বলবেন, ও যেন পরিবেশন করে। আমি তো এদিকে আটকে গেলুম।
পিতা যেতে যেতে বললেন, সেই অতিপ্রাকৃত গন্ধে ঘর ভরে আছে। সেই স্বর্গীয় গন্ধ।
সত্যই তাই। সেই সন্ন্যাসী যে যে ঘরে ছিলেন, সেই সেই ঘরে, সেই সেই জিনিস যা তিনি স্পর্শ করেছিলেন, সবেতেই এমনি এক ঈশ্বরীয় গন্ধ। কেমন করে এসব হয়! বিজ্ঞান কী বলে? অবিশ্বাসী কী বলেন!
অপর্ণা পাকা গৃহিণী। ওদিকে অসুস্থ মানুষ, তবু ভেবে হাসি পাচ্ছে, বিয়ের আগে অনেক মেয়েই অনেক ভাবে দেখা দেয়, এমন হাতেনাতে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে আসরে নামে ক’জন! প্রতিটি ব্যাপারেই ফুলমার্ক পাচ্ছে। হাত একটুও কাঁপছে না। যেখানকার জিনিস ঠিক সেইখানেই পড়ছে। জাপানি বিমান যেন পার্লহার্বারে বোমা ফেলছে! বুঝেছি, এ মেয়ে এ বাড়ির জন্যেই তৈরি।
মাতামহ বললেন, দেখো তো মা, একটুকরো মেটে পাও কি না! নীচের বউমা যা বেঁধেছে না, একেবারে মাতোয়ারা করে দিয়েছে। এমন হাতে পড়ার ভাগ্য হলে, পাঁঠা হয়ে জন্মেও সুখ!
পঙ্কজবাবু বললেন, আমাকে হারিয়ে দিয়েছে। সবাই আমার মাংসের তারিফ করে, এ রান্না খেলে তারা আমার রান্না ছোঁবে না। হরি!
বল?
ভদ্রলোক সুস্থ সবল হয়ে উঠুন, তারপর আবার একদিন সাংঘাতিক ভাবে হবে। কী বলিস?
বেশ, তাই হবে। একেবারে মোলোকলা পূর্ণ করে হবে।
সেদিন কালীঘাট থেকে মাংস আনব।
মাতামহ আহার করেন চোখ বুজিয়ে। মাঝে মাঝেই একটি গান করেন, সেই গানের একটি লাইন হল, আহার করো মনে করো আহুতি দিই শ্যামা মাকে। চোখ বুজিয়ে বললেন, সে ভার আমার। আমি এনে দোব।
চাটনি মুখে দিয়ে পঙ্কজবাবু আহা, আহা করে উঠলেন। এমন চৌকস হাত খুব কম দেখা যায়। একেবারে আলাউদ্দিন খাঁ সায়েব, যেমন সেতারে, তেমনি সরোদে, তেমনি বেহালায়। এনার ট্রেনিং-এ বুড়িকে কিছুদিন রাখতেই হবে। মেয়েছেলে যদি রাঁধতে না জানে, তা হলে শি ইজ অ্যান ইনকমপ্লিট ওম্যান।
ওদিকে কাকিমা একেবারে পাকা নার্সের মতো কাজ করে বসে আছেন। মেসোমশাইয়ের গা। মুছিয়ে দিয়েছেন। গেঞ্জি বদলে দিয়েছেন। বিছানার চাদর পালটে দিয়েছেন। তিন থাক বালিশে পিঠ দিয়ে ক্লান্ত, শ্রান্ত মেসোমশাই বসে আছেন সামনে পা ছড়িয়ে। হ্যারিকেন জ্বলছে। সেঁক চলছে। তার আগে পাউডার দিয়ে পা ঘষা হয়েছে।
পিতা স্নেহমাখানো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, বিনয়দা, কেমন বুঝছেন এখন?
ক্ষীণ গলায় মেসোমশাই বললেন, এত ঝরঝরে মনে হচ্ছে, জীবনে কখনও এত সুস্থ বোধ করিনি। আর তেমনি খিদে। জ্বরের ঘোরে, বুঝলেন হরিদা, কত কী যে দেখলুম! দেখলুম মহাদেব। এসে মাথার সামনে দাঁড়িয়েছেন। হাতে ইয়া বড় এক ত্রিশূল। ত্রিশূলটা কপালে ঠেকিয়ে কী যেন সব বললেন। কিছুই আর মনে নেই। সারাশরীর যেন চড়চড় করে পুড়ে যেতে লাগল। মনে হল আমি যেন আগুনে শুয়ে আছি। এখন নিজেকে মনে হচ্ছে, যেন হোমের পোড়া কাঠ। হরিদা, সে আমি। আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। মনে হল শরীরে হাই ভোলটেজ ইলেকট্রিসিটি খেলে যাচ্ছে।
