চলো না মা, তবে নীচেটা বড় অন্ধকার। তোমাকে এতক্ষণ ভয়ে বলিনি।
অপর্ণা বললে, অন্ধকার! তাতে কী হয়েছে? সব জায়গায় কি আলো থাকে?
দুই মহিলা নীচে নামতে লাগলেন। অপর্ণা না ভেবেই বড় ভাল কথা বলে ফেলেছে। বসার ঘরে পঙ্কজবাবু আর এক মহাপুরুষের মতো বসে পড়েছেন। খালি গা, চাপাফুলের মতো রং। বুকের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি চলে গেছে মোটা পইতে। সবাই চুপচাপ, কেউ কোনও কথা বলছেন না। প্রকৃত সন্ন্যাসীর এই ঠিক লক্ষণ। মুখে বাক্য সরে না, ভাবেই বিভোর।
পঙ্কজবাবু হাতের ইশারায় আমাকে কাছে ডেকে, ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, ধূমপান করা যায়?
দাঁড়ান, দাদুকে জিজ্ঞেস করে আসি।
ভাবস্থ অবস্থায় মাতামহ এক শুনতে আর এক শোনেন, না না, সন্ন্যাসীরা ধূমপান করেন না। তবে বাবার কিছু সেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি সাধুজির ধূমপানের কথা জিজ্ঞেস করিনি। পঙ্কজবাবু ধূমপান করতে পারেন কি না জিজ্ঞেস করছেন।
অ, উনি, না করলেই ভাল হয়। তুই একচামচে ভাল দই আর এক চামচে মধুর ব্যবস্থা কর। এই হল বাবার সারাদিনের আহার।
দই আমি দোকানে পাব, মধু কোথায় পাই? নীচে বেশ উঁকিয়ে মহিলামহল বসেছে। দু’জনকে দেখে মনে হচ্ছে কতকালের পরিচয়। অপর্ণা শিলে কী একটা বাটছে। কাকিমা বসেছেন পেঁয়াজ নিয়ে। দু’চোখে হাপুস হুপুস জল। মাঝে মাঝে হয় এ হাতের ওপর বাহু, না হয় ও হাতের ওপর বাহু দিয়ে চোখের জল মোছার চেষ্টা করছেন। বেশ অন্তরঙ্গ কোনও আলোচনা চলেছে নিচু গলায়। মানুষ ইচ্ছে করলে সংসারকে কত সুখে রাখতে পারে, কিন্তু করবে না। এই কাকাবাবু এসে হাজির হবেন দু-একদিনের মধ্যে। কাকিমার মুখের হাসি শুষে নেবেন ব্লটিং পেপারের মতো। উট যেমন কাটাগাছ খায়। মুখ রক্তারক্তি তবু খেয়ে চলেছে। কোনও কোনও মানুষের অশান্তিই পরম প্রিয় খাদ্য হয়ে ওঠে। তাইতেই ধৃতি, তাইতেই পুষ্টি।
কাকিমা বললেন, দেখে নাও, অপর্ণা বউ হলে কীরকম দেখাবে! এমনি করে শিলে ফেলে নোড়া দিয়ে থেঁতো করবে। বুঝেছ ছোকরা!
কাকিমার কথা শুনে অপর্ণা লজ্জায় মুখ নিচু করে রইল। মেয়েদের জগতে বিয়ের চেয়ে বড় ঘটনা যেন আর কিছু নেই।
আপনার কাছে একটু মধু হবে কাকিমা?
মধু! বাবা, তুমি যে একেবারে ভবিষ্যতে চলে গেলে। আগে হোক, তারপর তো মধু লাগবে।
এখনই তোমার মধু কী হবে!
অপর্ণা নোড়াটাকে শিলের ওপর ঠকাস করে নামিয়ে রেখে, দ্রুত পায়ে আমার পাশ দিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। যেতে যেতে বললে, ধ্যাত, আপনি বড় অসভ্য।
কীসের যে কী অর্থ, কিছুই বোঝা গেল না। মধুর সঙ্গে ভবিষ্যতের কী সম্পর্ক! অপর্ণাই বা অমন করে চলে গেল কেন? কাকিমা খিলখিল করে হাসছেন আর বলছেন, ভারী সুন্দর মেয়ে, বড় সুন্দর মেয়ে।
১.৩৫ ছাঁচিপান দিয়ে ঠোঁটেরে রাঙালে
এক চামচে দই, এক চামচে মধু, এই হল হরিদ্বারের সন্ন্যাসীর সারাদিনের আহার! কী করে শরীর থাকে! আমরা এত খেয়েও বলছি, খাওয়া ঠিক হচ্ছে না, শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে। প্রোটিন চাই, ভিটামিন চাই। পিতৃদেবের প্রশ্নে মাতামহ মৃদু হাসলেন।
বুঝলে শঙ্কর, এই হল সাধনা। ক্ষয় নিবারণের জন্যেই আহার। যার ক্ষয় নেই তার আর আহারের কী প্রয়োজন বলো?
বড় হলঘরে কাকিমা ভেলভেটের আসন পেতে দিয়েছেন। চকচকে ঝকঝকে গেলাসে গেলাসে জল। পঙ্কজবাবু স্নান করে আরও যেন ঝকঝকে হয়েছেন। গুরুজি চলে যাওয়ায় মাতামহ একটু শোকার্ত। আবার কবে দেখা হবে, কে জানে। ছোড়ো এ সংসার। ঝুটি মায়া, ঝুটা কায়া। মাংসের গন্ধে বাড়ি মম করছে। কাকিমার রান্নার হাত সাংঘাতিক। কেবল একটাই যা দুঃখ, অতি বড় ঘরনি ঘর না পায়, অতি বড় যোগী দর্শন না পায়।
পিতা বললেন, বসার ঘরে এমন সুন্দর এক অতিপ্রাকৃত গন্ধ বেরুচ্ছে! জীবনে বহু সেন্ট নাড়াচাড়া করেছি, এমন গন্ধ কখনও নাকে আসেনি।
মাতামহ বললেন, কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হলে এমনই গন্ধ বেরোয়। মৃগের যেমন কস্তুরী, সাধকের তেমনি কুণ্ডলিনী।
পিতা বললেন, আমি আর মাংস খাব না। আজ থেকে মাংস খাওয়া ছাড়লুম।
পঙ্কজবাবু বললেন, সেকী! খাওয়ার সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই, হরি। ধর্ম হল মনের জিনিস। ঠাকুর বলেছেন মনে, বনে আর কোণে।
দেখ পঙ্কজ, জীবনে যত পাঁঠা আর মাছ খেয়েছি, সব যদি লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়, সেই ফোর্ট পর্যন্ত চলে যাবে।
তুই দেখছি বার্নার্ড শ’র মতো কথা বলছিস। আর বাবা, বছর পাঁচেক অপেক্ষা কর, অটোমেটিক মাংস ছাড়তে হবে। দাঁতই বলবে, ছোড়ো মুসাফির, মায়া নগরকো। যদ্দিন আছ তদ্দিন খেয়ে নাও। আপনি কী বলেন?
প্রশ্নটা মাতামহকে।
মাতামহ কী এক ধরনের ভাবে ঝুঁদ হয়ে বসে আছেন। এত সুন্দর দেখাচ্ছে! সারা ঘরটাকেই বড় সুন্দর দেখাচ্ছে আজ। সব অমাত্যদের মতো চেহারা। কাকিমা সবে একটি পাটভাঙা সাদা শাড়ি পরেছেন। কপালে সিঁদুরের টিপ আঁচলের আর হাতের ঘষায় এপাশ ওপাশ হয়ে, এই মায়ার সংসারকে যেন আরও মায়াময় করে তুলেছে। আজ থেকে আমি কাকিমাকে মনে মনে মা বলব। কাকিটা খুব আস্তে, মা-টা খুব জোরে। অপর্ণাও খুব খাটছে, নুন, লেবু, জল আসছে যাচ্ছে। শাড়ির শব্দ হচ্ছে। চুড়ি বেজে উঠছে। অবেলায় যে-হাট ভেঙেছিল, অবেলাতেই সে হাট যেন জমে উঠেছে। সবই নিখুঁত। কেবল মুকু যদি যোগ দিত। মেসোমশাই যদি সুস্থ থাকতেন।
