সাধুজি মৃদু হেসে বললেন, হে সেকতা। জয় রাম।
মাতামহ বললেন, দীক্ষা হোগা গুরুজি?
হোগা বেটা, লেকিন হিয়াসে নেহি।
নিজের শরীর আঙুল দিয়ে দেখালেন।
তব হোগা ক্যায়সে, হোগা ক্যায়সে? মাতামহ ভীষণ উতলা হলেন।
হ্যায়, হ্যায়, ইসকা গুরু হ্যায়, সময় হোনেসে আ যায়গা, মিল যায়গা। জয় রাম, জয় রাম।
মুকু উদভ্রান্তের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এল, একজন ডাক্তার পাওয়া যাবে, ডাক্তার? জ্বরটা ভীষণ বেড়েছে। ভুল বকছেন।
মাতামহ জিজ্ঞেস করলেন, কার জ্বর? কার আবার জ্বর হল, শঙ্কর!
আজ মাতামহ পিতাকে সেই তখন থেকে শঙ্কর শঙ্কর বলে ডাকছেন। আদরের ডাক ছোটই হয়।
পিতা বললেন, বিনয়দার ভীষণ জ্বর। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে– ব্রেনফিভার।
মেয়ের কোনও খবর নেই, শঙ্কর?
নাঃ, কোথায় খবর?
আশ্চর্য, পুলিশ কি ঘুমিয়ে পড়েছে? গুরুজি, আপনি একবার দেখবেন? বহত আফসোস কি বাত, লেড়কি খো গিয়া। বেমার হো চুকা।
কাঁহা হায় বেটা! চলিয়ে।
সাধুজিকে নিয়ে সদলে আমরা মেসোমশাইয়ের ঘরে গেলুম। তিনি তখন জ্বরের ঘোরে অনেকটা গানের মতো করে বলছেন, জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো। পুরো লাইনটা একবারে বলা সম্ভব হচ্ছে না, ভেঙে ভেঙে, থেমে থেমে বলছেন।
সাধুজি মেসোমশাইয়ের মাথার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মহাপুরুষদের শরীর থেকে সুন্দর একটা গন্ধ বেরোয়। ওঁরা নিশ্চয়ই সেন্ট মাখেন না। হোমের আগুনে ঘৃতাহুতি পড়লে যেরকম গন্ধ বেরোয় ঠিক সেইরকম। ঠাকুরঘরে ঢুকলে যেরকম গন্ধ বেরোয় অনেকটা সেইরকম।
মেসোমশাই জ্বরের ঘোরে দুবার, মি. লর্ড, মি. লর্ড করলেন।
মেসোমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। সংসার মানুষকে কীভাবে দগ্ধ করে দেয়! চেহারা কেমন যেন ঝামার মতো কালো হয়ে গেছে। এক একবার চোখ খুলছেন, রং দেখলে চমকে যেতে হয়। ঘোর রক্তবর্ণ। বড় ব্যারিস্টার, যথেষ্ট পসার, প্রচুর অর্থ, কিন্তু কেমন যেন হাতপা বাঁধা কয়েদির মতো জীবন। অথচ মাথার কাছে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন? সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, কোনও ঐশ্বর্যই নেই, আপনি আর কপনি, তিনি যেন রাজা! অসীম আকাশ যাঁর প্রজা। মুক্ত পুরুষ আর বদ্ধ পুরুষে এই হল তফাত?
ঘরের বিভিন্ন জায়গায় আমরা সব থমকে থমকে দাঁড়িয়ে আছি। সাধুজি চোখ বুজিয়ে, হাত জোড় করে মাথার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন দেবদূতের মতো। ঠোঁটদুটো অনবরতই কাঁপছে। বেশ কিছুক্ষণ স্থির থেকে তিনি মেসোমশাইয়ের কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন। জয় রাম, জয় রাম বললেন বার তিনেক। শেষে বললেন, সব কুছ ঠিক হো যায়েগা।
আমরা সদলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলুম। সাধূজি কম্বল-পাতা চেয়ারে আসন নিলেন। মাতামহ প্রশ্ন করলেন, বাবা, ডাক্তারের কি আর প্রয়োজন হবে?
জরুর। বোলাইয়ে।
মাতামহ বললেন, মেয়ে কি ফিরে আসবে বাবা?
মুছে মালুম নেহি, বেটা। কেইসে বোলেগা?
না, আপনি সাধক মানুষ, সাধকরা অনেক কিছু জানতে পারেন, দেখতে পান, বলতে পারেন!
বিভূতি? সাধুজি অনন্তের দিকে তাকালেন। বিভূতি? মেরা কুছ নেহি হ্যায় বেটা। মেরা সিরিফ রামজি হয়। চলতি চক্কি সব কোই দেখে, কীল না দেখে কোই। যো কীলকো পাকড়কে রহে, সাবেৎ রহা হেয় ওই ॥ হামারা বিভূতি নেহি বেটে। হামারা কুছ নেহি।
সাধুজির মুখচোখ কেমন যেন করুণ হয়ে এল। উদাস চোখদুটি যেন জলে ভরে আসছে। হায় রাম বলে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। কী সুন্দর ভাব! কোথায় যেন নিয়ে চলেছেন আমাদের।
মাতামহ জিজ্ঞেস করলেন আবার, বোখার সারবে তো বাবা?
সাধুজি বললেন, রামকৃপা নাশহি সব রোগা।
আমার কানের কাছে অপর্ণা ফিসফিস করে বললে, আপনাকে আপনার কাকিমা ডাকছেন।
কোথা থেকে কোথায় ফিরে এলুম! এই পতন এড়াবার জন্যেই মানুষ সংসার ছেড়ে পালায়। চলতি চকি ছেড়ে, কীলকে জাপটে ধরে। কাকিমা গরমমশলা খুঁজে পাচ্ছেন না। গরমমশলা না দিলে মাংস বেতার হয়ে যাবে।
কাকিমা বললেন, তোমরা এখনও কী করছ বলো তো? বেলা কত হল জানো? তোমাদের সবই অদ্ভুত! মেয়েটার মুখটা শুকিয়ে গেছে।
অপর্ণা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সন্ন্যাসী দেখে কেমন যেন হয়ে গেছে। বসার ঘরে ভাবের বন্যা বইছে।
আমি বললুম, আজ আবার খাওয়াদাওয়া কীসের? জানেন কত বড় সাধু এসেছেন!
কাকিমা লাফিয়ে উঠলেন, অ্যাঁ, সেই ঘুরঘুরে বাবা?
না না, ইনি আমার দাদুর গুরুদেব। হিমালয়ে থাকেন।
আমি একবার যাই। বটঠাকুর রাগ করবেন?
রাগ করবেন কেন?
তা হলে আমি একবার যাই। আমি কেবল একটা জিনিস চাইব। পয়সাকড়ি নয়, সুখটুখ নয়, শুধু একটা জিনিস। বুঝতে পেরেছ?
কাকিমা ফোঁসফোঁস করে চোখ মুছতে লাগলেন। আজ যেন দিকে দিকে কান্নার মহোৎসব পড়ে গেছে।
আপনি যেতে পারেন, তবে একঘর লোকের সামনে কেমন করে আপনি সেই জিনিস চাইবেন। তবে হ্যাঁ, মহাপুরুষরা সব বুঝতে পারেন। সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই মনের কথা পড়ে ফেলবেন।
তুমি বলো আমি তা হলে কী করব! একবার বলছ এগোতে, একবার বলছ পেছোতে। ঠিক করে বলল, কী করব?
যান, ঘুরে আসুন। সাধু দর্শনের পুণ্যটা তো হবে!
কিন্তু শুধু হাতে যাই কী করে! তুমি আমাকে একটু মিষ্টি কিনে এনে দাও।
আপনি তা হলে নীচে যান, আমি আসছি। হয়তো আমাদেরও কিছু আনতে হবে।
অপর্ণা বললে, আমি যাব আপনার সঙ্গে নীচে? একটা যা হয় কিছু আমাকেও করতে দিন।
