আমরা সবাই তো ব্যস্ত!
সিঁড়িতে ভরাট গলায় কে যেন তিনবার বললেন, জয় রাম, জয় রাম, জয় রাম। সঙ্গে সঙ্গে মাতামহের গলা পাওয়া গেল, শঙ্কর, দেখো দেখো, কে এসেছেন! কাকে এনেছি একবার দেখো।
মাতামহ পাখির আনন্দে উড়ে এসেছেন। সন্ধেবেলা ডালে বসে পাখি বাসায় ফেরার এমনই আনন্দে কিচির মিচির করতে থাকে। মাতামহের আগে আগে উঠে আসছেন এক সন্ন্যাসী। মুখে মৃদু ধ্বনি, জয় রাম, জয় রাম। বড় সুন্দর, সাত্ত্বিক চেহারা। নাতিদীর্ঘ শরীর। গৌরকান্তি। মুখে একটা জ্যোতি খেলছে। চোখে অদ্ভুত এক প্রেমিকের দৃষ্টি। তাকিয়ে আছেন, অথচ দৃষ্টি কাউকে স্পর্শ করছে না। খেলে যাচ্ছে সুদূরে। যেন দিগন্তের পারে কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। বিষয়ীভূত নয়।
আমরা তিনজনেই ছুটে গেলুম। অপর্ণা সবার পেছনে। মুখ-গোমড়া মুকু ধারে কাছে নেই। না থাকুক। ও এক আলাদা স্বভাবের মেয়ে। পিতার দিকে গেছে। সন্ন্যাসী দেখলে বড় আনন্দ হয়। কেন হয় তা জানি না। মন বলতে থাকে, ওরে, সংসারেই মুক্তি আছে। কায়দাটা ওঁদের কাছে শিখে নে।
পিতা বললেন, আসুন আসুন, আপনার কথাই হচ্ছিল, ভাবছিলুম, একে পাঠাব ডাকতে।
সত্যি! মাতামহের গলায় কীরকম এক ধরনের আবেগ এসে গেল, আমাকে ভাবার মানুষ, আমাকে ডাকার মানুষ এখনও আছে! রাজা, আরও কয়েক বছর বাঁচা চাই। রাজা, এখনও সব ডাল শুকোয়নি।
উচ্ছ্বাসের মধ্যেই সন্ন্যাসীর কথা মনে পড়ল, বইঠিয়ে গুরুজি, ও হ্যাঁ, একটা আসন চাই, কম্বলের আসন।
আসন এল। সেই আসন পেতে, গুরুজি চেয়ারে বসলেন। বসার ধরনটি বড় সুন্দর। একেবারে খাড়া। আমার নজর তার বুকের দিকে। ধীরে ধীরে সমান তালে বুক উঠছে আর নামছে। খাস যতটা দীর্ঘ, প্রশ্বাসও ততটা দীর্ঘ। আমার দৃষ্টি তার চোখের দিকে। সকলের মাঝে থেকেও, কী অদ্ভুত নিঃসঙ্গ। কীসের আনন্দে যেন মশগুল। যে-আনন্দ এখানে নেই, অন্য কোথাও আছে, অন্যভাবে।
মাতামহ বললেন, শঙ্কর, ইনি আমার গুরুদেব, হৃষীকেশে থাকেন।
হঠাৎ পঙ্কজবাবুর দিকে দৃষ্টি পড়ায়, এতক্ষণে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে?
পিতা বললেন, আমার একমাত্র বন্ধু, সহকর্মী পঙ্কজ।
মাতামহ পরিবেশ সচেতন হয়েছেন। চোখ বেড়াতে বেড়াতে অপর্ণাকে ধরে ফেলেছে। দুষ্টু হাসি হেসে বললেন, বুঝেছি, বুঝেছি, আন্ডারস্ট্যান্ড, আন্ডারস্ট্যান্ড, ওই যে বঁড়শি বেটি দাঁড়িয়ে আছে। এক যায়, এক আসে, পাখি তুই ঠিক বসে থাক, ঠিক বসে থাক, হরি নামের মাস্তুলে। ব্যাটার আমার কপাল ভাল।
বয়েস বাড়লে, মানুষের রসের ভাণ্ডার যেন উপচে পড়ে। এমন করলেন অপর্ণা সরে পড়ল। মাতামহ এইবার অপূর্ব হিন্দিতে সন্ন্যাসীর সঙ্গে আমাদের পরিচয়পর্ব শুরু করলেন, বাবা, এ মেরা জামাই, হরিশঙ্কর, বহুত চরিত্রবান, যৌবনমে দোনো এক সাথ ব্যায়াম কিয়া। ও দিন তো চলা গিয়া। আভি, আঁধার আ রাহা হই, সুর্য অস্ত হো যায়ে গা। আশীর্বাদ কিজিয়ে, কী, সামনা জনমমে, ফির দোনো এক সাথ মিলে। লীলা এইসি চলে, জনম জনম মে।
বাবার ঠোঁট কাঁপছে। তার মানে জপ চলছে।
পিতা কখনও কারওকে প্রণাম করেন না। আজ করলেন। করলেন বড় ভক্তিভরে।
সন্ন্যাসী পিতার মাথায় হাত রেখে শুধু বললেন, জয় রাম, হো যায়ে গা।
সামান্য ব্যাপার, সামান্য কথা, কী জানি কী হয়ে গেল, আমার কঠোর পিতা ঝরঝর করে কাঁদতে লাগলেন। আর আমার মাতামহ উল্লাসে বলতে লাগলেন, ভাঙছে, ভাঙছে, নামছে নামছে। বলতে বলতে তিনিও কেঁদে ফেললেন। কাঁদছেন আর বলছেন, আবার আমাদের দেখা হবে, লীলা লীলা।
সন্ন্যাসী আবার বললেন, জয় রাম, জয় রাম। দৃষ্টি সুদূরে। পিতার মাথায় আবার স্নেহের হাত রেখে বললেন, দীক্ষা মিলা বেটা?
মাতামহ বললেন, নেহি হুয়া। উ সব মানতাই নেহি, আতাই নেহি, বিজ্ঞানী হো।
সন্ন্যাসীর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলে গেল। তিনি বললেন, জয় রাম, সব কুছ আ যায়েগা।
পিতা প্রণামের জন্যে অবনত হয়েছিলেন, এতক্ষণ সেইভাবেই ছিলেন। সোজা উঠে দাঁড়ালেন।
মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছে, এখনও ফিরে আসেননি। চরিত্রে চরিত্র আসেনি। আমার অভিজ্ঞতায় জানি, মানুষ কীভাবে মানুষের ভেতর থেকে বেরিয়ে চলে যায়। কেমন করে অনন্তের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায়। যখন আবার ফিরে আসে তখন অন্য মানুষ। নাম যা ছিল তা রইল, কর্মও একই রইল, মানুষ কিছু জানল না, বুঝল না। আমি বদলে গেলুম। আমার বিষয়, ধ্যান-ধারণা সব বদলে গেল।
পিতা বললেন, আপনি আমাকে দীক্ষা দেবেন?
জয় রাম। হোগা, হো যায়েগা।
মাতামহ বললেন, কব হোগা গুরুজি?
একদিন হোগা।
কোন দিন গুরুজি?
বেটা, তুমহারা বোখার হোগা। বহত ভারী, ঘাবড়াও মাত। আরোগ্য মিল যায়েগা। তুম তো বেটা বিজ্ঞানী হো। দেহ শুধ হো যায়েগা। কভি ঘুমতে ঘুমতে হাম আ সেকতা, তুম ভি হামারা পাশ আ সেকতা। রামজিকা মর্জি।
মাতামহ আকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, বোখার কাহে হোগা?
হোগা, ওইসাই হোগা।
সন্ন্যাসীকে আমার ভীষণ ভাল লেগে গেল। অসম্ভব শান্ত। বড় কম কথা বলেন। কম কথা বলেন। বলেই, সব কথার অসম্ভব ওজন। সুযোগ পেয়ে প্রণাম করলুম। মাতামহ পরিচয় করালেন, হামারা নাতি, কন্যাকা লেড়কা।
সাধুজি প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালেন। শুধু বললেন, জয় রাম।
আমি ভয়ে ভয়ে বললুম, আমাকে দীক্ষা দেবেন?
মাতামহ সার্টিফিকেট দিলেন, বহুৎ শুদ্ধ আত্মা।
