মেয়ে বললে, চলো বাবা, আমরা ফিরে যাই। এখানে পড়ে থাকার কোনও মানে হয় না। যা করার ওখানে বসেই করা যাবে।
হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছি। শুধু শুধু এঁদের কষ্ট দিয়ে লাভ কী?
মুকু দরজাটা ভেজিয়ে দিল। অপর্ণা অপরাধীর মতো মুখ করে বললে, আমি কি খুব জোরে চিৎকার করে ফেলেছি?
না না। খুব আস্তে কথাও ওঁর এখন অসহ্য লাগে। বুঝতেই পারছেন, মনের অবস্থা খুব খারাপ।
আমরা খুব বাজে দিনে এসে পড়েছি। বাবা যখন কোনও কিছু নিয়ে মেতে ওঠেন, তখন যেন
সামলানোই দায়। যাই বলে আসি, অত হইচই করছ কেন?
না না। অপর্ণার হাতটা প্রায় চেপেই ধরেছিলুম, খুব জোর সামলে নিয়েছি। একেই বলে সংযম!
অপর্ণা বললে, মেসোমশাইয়ের জ্বর আসছে বলছেন, ওঁকে কিছু খাইয়ে দিলে হত না? এঁদের রান্না হতে তো সেই বিকেল পাঁচটা। যেমন আমার বাবা, তেমনি কাকাবাবু!
আমার বাবার জীবনে তো কোনও আনন্দ নেই। শুধুই কর্তব্য। আজ আপনার বাবাকে পেয়ে তবু একটু মেতে উঠেছেন। এ মাতন তত বেশিক্ষণ থাকবে না। ম্যালেরিয়ার মতো, এই ছাড়ে, এই আসে। কী হবে বলে! সব আয়োজন এখুনি থেমে যাবে!
মুকুকে তা হলে ডাকুন না। মেসোমশাইকে যা হোক কিছু খাইয়ে দিক।
মুকুকে আমি ডাকতে পারব না, আপনি ডাকুন। আমার সঙ্গে কথা বলে না।
কেন, ঝগড়া হয়েছে?
না, ঝগড়া নয়। বড়লোকের মেয়ে। বেশ একটু গরব আছে।
কই, আমি তো তেমন কিছু বুঝলুম না। আচ্ছা, দাঁড়ান দেখছি।
অপর্ণা ভেজানো দরজা ঠেলে খুলতে খুলতে ডাকল, মুকু, মুকু। ঘরে একটা পা রেখেছে। মেসোমশাই চিৎকার করে উঠলেন, কে, কনক এলি, কনক? কনক?
বড় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মুখ দেখলেই বোঝা যায়, মেসোমশাইয়ের বেশ জ্বর এসেছে। চোখদুটো ঘোর লাল। কনক, কনক করে, দু’হাত সামনে বাড়িয়ে এগিয়ে আসছেন। অপর্ণা এক পা এক পা করে পিছু হটছে।
১.৩৪ আরে সত্যঘাতী মন
অপর্ণা পায়ে পায়ে পিছু হটছে। মেসোমশাই পায়ে পায়ে এগোচ্ছেন। মুকু বলছে, বাবা, বাবা, ও দিদি নয়, এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছে।
মেসোমশাই দরজা ধরে পঁড়িয়ে পড়লেন। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। অপর্ণা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বেচারা ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। ফিসফিস করে বললে, এমন জানলে, আমি সামনে যেতুম না। কনককে কি আমার মতো দেখতে ছিল?
অনেকটা। তবে আপনি আরও সুন্দর।
মেয়েদের মুখের ওপর সুন্দর বললে, বড় লজ্জা পেয়ে যায়। খুব পরিচিত হলে, ধ্যাত বলে চড় মারতে আসে। ধরতে পারলে খামচে দেয়। অপর্ণা মুখ নিচু করল।
আমাদের দুই পিতাই ছুটে এসেছেন। আমার পিতা বলছেন, কী হল বিনয়দার! বিনয়দার কী হল!
পঙ্কজবাবু বললেন, ভদ্রলোককে ভীষণ অসুস্থ মনে হচ্ছে।
মুকু মেসোমশাইকে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। পিতা জিজ্ঞেস করলেন, কী, হয়েছিল কী?
উনি অপর্ণাকে কনক ভেবে ছুটে এসেছিলেন। তা ছাড়া খুব জ্বর এসেছে।
পঙ্কজবাবু বললেন, জ্বর এসেছে? তা হলে তো ডাক্তার ডাকতে হয়!
পিতা বললেন, উনি বড় বেশি ভেঙে পড়েছেন।
পঙ্কজবাবু বললেন, তুমি কী বুঝবে বলল ভাই! তোমার মেয়ে থাকলে বুঝতে! কী যে করা যায়, আমার মাথায় আসছে না। এত বড় একটা দেশে মেয়ে হারানো মানে, খড়ের গাদায় ছুঁচ হারানো। কীভাবে হারাল হরি?
সে একটা স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার। পুরো ঘটনা তোকে দুপুরে বলব।
অপর্ণা বললে, বাবা, এঁদের মন, মেজাজ, শরীর, কোনওটাই যখন ভাল নেই, তখন তোমার ওই রান্নাটান্না আজ থাক। পরে আর একদিন হবেন।
ঠিক বলেছিস মা। চল, আজ আমরা চলে যাই।
কাকিমা দরজার ওপাশ থেকে নিচু গলায় বললেন, আমি একটা কথা বলব?
পঙ্কজবাবু ঘুরে গিয়ে বললেন, নিশ্চয় বলবেন।
মাংসটা আমিই বেঁধে দিই। সহজে হয়ে যাবে। আপনারা ততক্ষণ চানটান করে নিন। আমি খুব একটা খারাপ রাঁধি না।
পিতা সার্টিফিকেট দিলেন, না না, তুমি ভালই রাবধা। বরং পঙ্কজ রাঁধলে কী হত, বলা শক্ত।
অপর্ণা বললে, না না, বাবা খুব ভালই রাঁধে। মা বলেন, আগের জন্মে তুমি ছিলে বাবুর্চি। আর মা ছিলেন মুরগি।
পঙ্কজবাবু বললেন, এঃ, বেটি আমার সব সিক্রেট আউট করে দিলে।
কাকিমা বললেন, আমি তা হলে লেগে যাই?
পিতা বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, লেগে যাও। আমরা ততক্ষণ রুগির সেবার ব্যবস্থা করি। দূর থেকেই মনে হচ্ছে, জ্বরটা বেশ ফুটেছে। মুখ দেখে বোঝা যায়–এ হল ব্রেনফিভার। ভগবান করুন, খারাপ দিকে না চলে যায়।
পঙ্কজবাবু বললেন, ভূতের মুখে রাম নাম? তুমি তো বাবা নাস্তিক!
ও আমার কথার কথা। ভগবান কি আর কিছু করবেন! করবে মানুষ। ভাল ডাক্তার চাই। তেমন বুঝলে, টেলিগ্রাম করে স্ত্রীকে এখানে আনাতে হবে। সেবা চাই।
মেসোমশাই ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ওই উপকারটি আর করবেন না, হরিদা। তাকে আমি কিছুই জানাইনি। এই অবস্থায় জানাতেও চাই না। তার শরীর খুবই খারাপ। আপনাদের আমি খুব বেশি ভোগাব না। আজ বড় কাবু। কাল সোজা হয়ে যাব। সোজা হতে পারলেই আমি চলে যাব।
পিতা বললেন, আপনি বড় অভিমানী। আমি তো সে ভেবে বলিনি। তুমি একবার থার্মোমিটারটা নিয়ে এসো ততো! আঃ মনটা বড় ছটফট করছে।
পঙ্কজবাবু বললেন, কেন, ছটফট করছে কেন?
ওর দাদুকে একবার খবর দিতে পারলে বড় শান্তি পেতুম। শাক্ত মানুষ, মাংস হচ্ছে।
তা দিলেই হয়! যাবে কে?
