বুকের ভেতর এমন চেঁকিপড়ার শব্দ হচ্ছে কেন? কণ্ঠতালু কেন শুকিয়ে আসছে?
তোর ঘোর লেগেছে। পৃথিবীতে এইরকমই হয়। এটা টপকাতে পারলেই মুক্তি। বড় শক্ত কাজ হে৷ এ যে বিশালাক্ষীর দ।
কাকিমা তখন সৌন্দর্য দেখাচ্ছিলেন, নাক চোখ মুখ গড়ন রং। আমি গড়ন দেখছি। মাথায় আমার মতোই লম্বা। কিন্তু কী সুন্দর! মেয়েটির খুব জীবন আছে। সেই বলে না, এ অনেক দূর যাবে, এই মেয়েটিও আরও অনেক বাড়বে। সবে তো মুকুলিকা! ফুল হয়ে ফুটবে যেদিন! সিল্কের শাড়ি শরীর বেয়ে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত নেমে গেছে। কোথাও ক্ষীণ হয়েছে, কোথাও গুরু। নদীর মতো। স্থানে স্থানে শীর্ণ, স্ফীত। মানুষ মারার কল তৈরি করেছেন ঈশ্বর। ফাঁদ পেতেছেন বিশ্বজুড়ে।
এক একটা শাড়িতে আলতো আঙুল বুলোত বুলোতে অপর্ণা বলছে, কী সুন্দর! কী সুন্দর! এসব আর দেখাই যায় না। সব আপনার মায়ের!
মেয়েটির গলাও কী সুন্দর। মৃদু বাতাসে যেন ঝাড়লণ্ঠনের কাঁচ দুলছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, সবই ছিল আমার মায়ের।
আমাকে আপনি বলছেন কেন?
বোকার মতো হাসলুম। চিরকালই আমি একটু বোকাবোকা। আমার পেটে খিদে, মুখে লাজ। বোকা বদমাশ।
আমাকে তুমিই বলবেন। ওমা! এটা কী? ছোট ছোট ঘন্টা লাগানো ভেলভেটের সেই হাতপাখাটা অপর্ণা খুঁজে পেয়েছে। কোন দেশে তৈরি তা জানি না। তবে বড় সুন্দর জিনিস। নাড়লে বহু দূর থেকে ভেসে আসা প্যাগোডার ঘণ্টার শব্দ ঘুম পাড়িয়ে দিতে চায়।
পাখা রেখে অপর্ণা বললে, উনি বললেন বটে, এসব শাড়ি আমি পরতে পারব না। সে যুগের দামি দামি শাড়ি পরলে নষ্ট হয়ে যাবে। আমার পরার অধিকার জন্মায়নি।
দাঁড়ান, আমি তলার ড্রয়ারটা খুলি। অনেক আটপৌরে আছে। একটু সরুন।
অপর্ণা একপাশে সরে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে নীচের ড্রয়ারটা টেনে খুললুম। আমার ডান পাশ দিয়ে রমণীয় বৃক্ষের মতো উঠে গেছে রমণী-শরীর। যেন বসে আছি গাছের ছায়ায়। মাথার কাছে ঝুলে আছে পাতার মতো আঁচল। ব্ৰহ্মতালু ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
ফিকে গোলাপি রঙের একটা শাড়ি তুলে নিয়ে অপর্ণার হাতে দিয়ে বললুম, এইটা আপনি পরুন। একেবারে নতুন।
শাড়িটা হাতে নিয়ে অপর্ণা বললে, আশ্চর্য সুতো। কত বছরের পুরনো, এখনও ঠিক আছে। তবে পরে বসতে গেলে ফেঁসে না যায়।
ফেঁসে যাবার কথায় ঘাড় তুলে, আড়চোখে অপর্ণাকে একবার দেখে নিলুম। সেদিন ঘর মোছার সময় বসতে গিয়ে আমার অন্তর্বাস ফেঁসেছিল। বসার সময় কোথায় চাপ পড়ে আমি জানি। একযুগ আগের শাড়ি, ফঁসতেও পারে। অপর্ণার আয়তন আর ওজন দুটোই আমার চেয়ে বেশি।
দরজার ওপাশ থেকে মুকু বললে, আমার একটা শাড়ি পরবে ভাই? কাঁচা পরিষ্কার।
হ্যাঁ, সেই ভাল।
মায়ের গোলাপি শাড়ি আবার স্মৃতির ভাণ্ডারে ফিরে এল। আমারও মন চাইছিল না। যাক, মেয়েতে মেয়েতে এবার বোঝাঁপড়া থোক।
পুবের বারান্দায় বসে, দুই বন্ধুর চা চলছে। রকমসকম দেখে মনে হচ্ছে, এঁরা দু’জনেই ঘড়িটড়ির ধার ধারেন না। চা শেষ হবে। মাংস বাছা হবে, ধোয়া হবে। মশলা পেষা হবে। তারপর কষা হবে, সেদ্ধ হবে। ভাত চাপবে। আজ বরাতে লাঞ্চ নেই। একেবারে সেই ডিনার?
ওপাশের ঘরে অপর্ণার চিৎকার শোনা গেল, ও মা গো, এটা কী রে বাবা? পিতা বললেন, দেখো দেখো, কী হল?
মুকু মৃদু গলায় বলছে, কী হল ভাই, দরজাটা খোলো না!
অপর্ণা তিড়বিড় করে বললে, মেঝেতে মালসার মতো কী একটা চলে বেড়াচ্ছে!
উত্তরের ঘরে দরজা দিয়ে অপর্ণা শাড়ি ছাড়ছিল। বুঝেছি, ভয়ের বস্তুটি কী। বলাইবাবু। বড় রসিক মানুষ। সাহস দেবার জন্যে বললুম, ভয় নেই আপনার, ওটা একটা কচ্ছপ। আমাদের পোষা।
ও মা, কচ্ছপ? কচ্ছপ আবার কেউ পোষে? কামড়াবে না?
ও কামড়ায় না, ভারী ভাল ছেলে।
ঘরের ভেতর দুদ্দাড় করে একটা শব্দ হল। বলাইবাবু অপর্ণা দেবীকে নাচ শেখাচ্ছেন। খটাস করে খিল খুলে উত্তরের ঘর থেকে অপর্ণা প্রায় ছুটে বেরিয়ে এল। মুকুর দেওয়া শাড়িটা কোনওরকমে গায়ে জড়িয়েছে। ছাড়া সিল্কের শাড়ি মেঝেতে ফুলে ফেঁপে পড়ে আছে। বলাইবাবু বেশ আরাম করে তার ওপরে চেপে বসেছেন। বলা যায় না,হঠাৎ যদি টেস্ট করে দেখার ইচ্ছে হয়। মুভুটি মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে।
শাড়িটাকে উদ্ধার করে এনে অপর্ণার হাতে দিলুম। এইসব মন-চঞ্চল করা কাজই তো আমাকে করতে হবে। এর নাম পরীক্ষা।
শাড়িটা হাতে করে নিয়ে অপর্ণা বললে, ইস, ছি ছি, আপনাকে তুলে আনতে হল? কী লজ্জা? কচ্ছপ পুষেছেন কেন? কচ্ছপ কেউ পোষে! কামড়ালে, মেঘ না ডাকলে ছাড়বে না।
বাজে কথা। কচ্ছপ নিরীহ প্রাণী। কখনও কামড়ায় না।
শাড়ি পরার ধরনে অপর্ণাকে আশ্রমবালিকার মতো দেখতে হয়েছে। বড় বড় চোখে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। না, আর এখানে থাকা উচিত নয়। মুকু যেভাবে তাকাচ্ছে! অপর্ণা একটু এলোমলো হয়ে আছে। ঠিক ততটাই এলোমেলো, যতটায় যুবকের মতিভ্রম হতে পারে। আমাকে চরিত্রহীন ভাবছে। চরিত্র আবার কাঁচের গেলাসের মতো। কখন যে ঠুন করে ভেঙে যায়, কোন আঘাতে!
মেসোমশাই গম্ভীর গলায় মেয়েকে ডাকলেন, মুকু।
আসি বাবা, বলে মুকু প্রায় দৌড়ে চলে গেল। অপর্ণা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, কে, কে?
মেসোমশাই। মুকুর বাবা।
মেসোমশাইয়ের গলা শোনা গেল। মেয়েকে বলছেন, বড় গোলমাল হচ্ছে। কীসের এই উৎসব! তুমি দরজাটা ভেজিয়ে দাও। আমার জ্বর আসছে। একটু শুয়ে পড়ি।
