শুধু ভাই নয়, বল যমজ ভাই। একটু চা হলে মন্দ হয় না, কী বল?
অফ কোর্স। চা ছাড়া জীবন অচল।
বাট ওয়ান থিং, চা কে করবে?
কেন আমি।
না, তুই নয়, করবে বুড়ি।
তোর মেয়ের কটা নাম?
আমি বাপু বুড়ি বলেই ডাকি। তোর মেয়ে নেই বুঝবি না। মেয়েই হল বুড়ো বাপের একমাত্র ভরসা। কী শাসন! সবসময় আগলে আগলে রাখে।
ভেতরের বারান্দায় অদ্ভুত এক দৃশ্য। দুটি মেয়ে দু’জনের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মুকু আর অপর্ণা। কারুর মুখে কোনও কথা নেই। বেড়াল যেন বেড়াল দেখেছে। এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে দু’জনকে মুক্তি দেবার জন্যে পরিচয়টা আমাকেই করাতে হল, ইনি আমার মেসোমশাইয়ের মেয়ে, নাম মুকুলিকা, আমরা ছোট্ট করে ডাকি মুকু। মুকু, এঁর নাম অপর্ণা, আমার বাবার বন্ধুর মেয়ে।
দু’জনেরই খুব সহবত। হাত তুলে নমস্কার বিনিময় হল।
পেছনের সিঁড়ি দিয়ে কাকিমা গুটিগুটি উঠে এসেছেন। পানের মতো মুখ ঘামতেলে চকচক করছে। আমার পাশে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, কে গো?
ফিসফিস উত্তর, বাবার বন্ধুর মেয়ে।
কী নাম?
অপর্ণা।
একটা চোখ ছোট করে কাকিমা বললেন, খুব সাবধান, তোমার উপযুক্ত ফাঁদ।
অপর্ণা কাকিমার দিকে তাকাতেই, কাকিমা বললেন, বেশ মেয়েটি।
মেয়েটির দিকে এগিয়ে গিয়ে কাকিমা চুলের বিনুনি নাড়তে নাড়তে বললেন, বাঃ, কী সুন্দর চুল! নাকটা নেড়ে দিয়ে বললেন, টিকোলো নাক। চোখদুটো দেখে বললেন, প্রতিমার মতো চোখ, ভুরু দেখে বললেন, ধনুকের মতো ভুরু, সবশেষে বললেন, গড়নটি কী সুন্দর! ভগবান তোমাকে। একেবারে ঢেলে দিয়েছেন।
কাকিমা যত প্রশংসা করছেন, অপর্ণা ততই কুঁচকে যাচ্ছে। কাকিমা বললেন, তুমি যার হাতে পড়বে তার রাজার ভাগ্য।
অপর্ণা অতি কষ্টে বললে, আপনি?
আমি পিন্টুর কাকিমা।
অপর্ণা প্রণাম করতে গেল। কাকিমা দু’হাত ধরে বুকের কাছে টেনে এনে বললেন, আমি ব্রাহ্মণ নই, মা।
পিতা আর পঙ্কজবাবুর গলা পাওয়া গেল। কাকিমা তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে নীচের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
পিতা বললেন, একী অপর্ণা, তুমি এখনও ডাঙা পাওনি, জলেই পড়ে আছ? কই হে অবতার?
আজ্ঞে বলুন।
যাও দেরাজ খুলে দাও। পছন্দ করে একটা শাড়ি বেছে নাও। একেবারে নতুন শাড়িও আছে। এর মা পরার সময় পায়নি। জীবনটা তো খুব ছোট ছিল। লজ্জা কোরো না, লজ্জা কোরো না। এ তোমার নিজের বাড়ি।
পঙ্কজবাবু বললেন, তুই জানিস না বুড়ি, আমরা দু’জনে হরিহর আত্মা। কত রাত এ বাড়িতে কাটিয়ে গেছি। হরি, তোর মনে আছে, সেই মহিষাদল রাজস্টেটের গাইয়ে অগস্তিমশাইকে। আঃ, কী গানই গাইতেন! এ বাড়িতে বহুকাল কোনও আসর বসেনি। জীবনটা কী হয়ে গেল!
আর জীবন? এই তো জীবন। যেতে যেতে সবই চলে যায়। যে শেষে যায় তার বড় জ্বালা। সব দোরতাড়া দিয়ে চাবি বন্ধ করে, বারেবারে পেছন ফিরে তাকাতে তাকাতে যাওয়া।
অগস্তিমশাই এখন কোথায়?
জানি না রে। আছেন না গেছেন তাও জানি না। শিল্পীরা বেশিদিন বাঁচেন না।
না না বেঁচে আছেন। বয়েস খুব বেশি নয়।
পঙ্কজবাবু হঠাৎ মুকুকে দেখলেন, মেয়েটি কে?
মেজদার ভায়েরাভাইয়ের মেয়ে, এখানে এসেছিল পরীক্ষা দিতে। ভেরি স্যাড, ভেরি স্যাড।
স্যাড কেন?
এর বড় বোনটি নিরুদ্দিষ্টা হয়েছে।
সেকী? তল্লাশ চলছে?
কিছু বাকি নেই, তোলপাড় চলছে।
আঃ, এইজন্যই সংসার করতে নেই। একটানা-একটা অশান্তি পেছনে ফেউয়ের মতো লেগে থাকবেই। একটু চা হলে মন্দ হত না, কী বল হরি?
অফকোর্স!
কাকিমা সিঁড়ির বাঁকে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললেন, আমি করে দোব বটঠাকুর? আমার উনুনে আঁচ গনগন করছে।
পিতা চমকে ফিরে তাকালেন, অ্যাঁ, তুমি, আচ্ছা করবে করো। সেই ভাল চা-টা নিয়ে যাও।
পঙ্কজবাবু বললেন, ইনি?
আমার বাল্যবন্ধুর স্ত্রী। নীচেটা নো-ম্যানস ল্যান্ড হয়ে ছিল, তাই থাকতে দিয়েছি। স্বামীটি গুণী, সুন্দর তবলার হাত, তবে স্বভাবটি তেমন সুবিধের নয়। উড়োপাখি।
সংসার কী জিনিস, হরি! দুটো পাখি কখনও এক ডালে বসতে পারে না। তোর বাগানের গাছগুলো বেশ বড় হয়েছে। বয়েস কীভাবে বাড়ছে, হরি?
শশিকলার মতো।
পঙ্কজবাবু আবার হইহই করে হেসে উঠলেন, দারুণ বলেছিস। তার মানে অমাবস্যা আসছে। ওটা কী গাছ রে? ওই যে কোণের দিকে। বিউটিফুল হলদে হলদে পাতা।
ও, ওটা হল রিঠে গাছ। কী হল তোমরা এখনও পঁড়িয়ে? যাও দেরাজটা খুলে দাও।
আজ্ঞে, ইনি গেলে তবেই তো খুলব?
পঙ্কজবাবু আবার হোহো করে হাসলেন, বুড়ি, তোর কী রেসপেক্ট! ইনি৷ দুর, বোকা ছেলে। ইনি কী? ইনি? শাড়ি পরেছে বলে এত সম্মান! তুমি বলো, তুমি।
দেরাজে থরে থরে সাজানো মায়ের স্মৃতি। বেনারসি, সিল্ক, ব্লাউজ, সোয়েটার, সোনা বাঁধানো পাশচিরুনি। ব্রহ্মদেশের বাঁশের তৈরি কারুকাজ করা গোল চৌকো বাক্স। সবই ছিল মায়ের। আর এক মা, আমার পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছে। ঘরে একটা আলোআঁধারের খেলা চলেছে। দেরাজ থেকে কেমন একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। স্মৃতির একটা সুন্দর মন-কেমন-করানো গন্ধ আছে।
অপর্ণা দেখার জন্যে মাথা সামনে নোয়াল। ওর শরীর থেকে কেমন একটা উত্তাপ বেরোচ্ছে, ফুলের গন্ধ। দেরাজের ভেতরটা ঠান্ডা। একগুচ্ছ চুল কপালের ওপর দুলছে। দু’কানে ঝুলে থাকা দুটো দুল, আর পারি না, আর পারি না, ছন্দে দুলছে। নাকের নাকছাবি মাঝে মাঝে শিউরে উঠছে। পরনের সিল্কের শাড়ি নানা ষড়যন্ত্রে খিসখিস শব্দ করছে। আমার মন বলছে, চেয়ে দেখ, তোর জীবনসঙ্গিনী হতেও পারে, শুধু তুমি ঘাড়টি একটু কাত করবে, মুখে একটু লাজুক লাজুক হাসি টেনে আনবে। ব্যবধান মাত্র এক হাত।
