কী হল? চেষ্টা করুন। যা দশে শেখেননি, তা ষাটে শিখুন।
আমি আর চা খেতে চাই না হরিশঙ্কর।
চোখের কোণদুটো ছলছলে। আলগা মুঠো থেকে মেঝেতে নিমকি খসে পড়ল। এতক্ষণ নিমকি নিমকি করে লাফাচ্ছিলেন। সেই নিমকির ওপরও আর তেমন টান নেই। সব ছেড়ে উঠে পড়লেন। প্লেটে নিমকি, আধ কাপ চা।
পিতা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় চললেন?
যাই, কোথাও তো যেতে হবে। বেলা বেড়ে যাচ্ছে।
বসুন। বেশ আদেশের সুর।
কখন কী অসভ্যতা করে ফেলি হরিশঙ্কর! তোমার মতো লেখাপড়া শিখিনি, তেমন সহবতও জানি না। রেলের মাল গুদামের বড়বাবু ছিলুম এককালে, পয়সাও অনেক কামিয়েছি; কিন্তু তোমার সামনে বসার মতো সভ্যতা তো আমাকে কেউ শেখায়নি হরিশঙ্কর। ছেলে বলে, ওল্ড ফুল, তুমিও
তো আমার আর এক ছেলে, তোমার মুখেও সেই এক কথা,
যাবদ্বিত্তোপার্জন শক্ত-স্তাবন্নিজপরিবারো রক্তঃ।
পশ্চাদ্ধাবতি জর্জরদেহে, বার্তাং পৃচ্ছতি কোছপি ন গেহে ॥
যতদিন রোজগার ছিল, বোলবোলা ছিল, ততদিন রাজনারায়ণের খুব খাতির ছিল হে। এখন গতায়ু বৃদ্ধ, জরা এসে চেপে ধরেছে, এখন কে কার! ভুলেও কেউ একবার জিজ্ঞেস করে না, বুড়ো কেমন আছ?
অঙ্গং গলিতং পলিতং মুণ্ডং দশনবিহীনং জাতং তুণ্ডম
বৃদ্ধা যাতি গৃহীত্বা দণ্ডং
বৃদ্ধ না কুত্র যাতি। পিতা হাত ধরে চেপে বসালেন। বসুন। অত অভিমান কীসের? সংসারে আপনার অভিমানের কে তোয়াক্কা করে! শঙ্করাচার্য পড়ে ঠোঁট ফোলাচ্ছেন? সাধনমার্গের দুটো পথ, জানেন তো? নেতি নেতি। ইতি ইতি। চায়ে চুমুক দিলে শব্দ হয়, অতএব চায়ে চুমুক দেব না, নেতির পথ। এমনভাবে চুমুক দেব শব্দ হবে না, এ হল ইতির পথ। নিন, স্টার্ট চুমুক, ওয়ান, টু, থ্রি।
মাতামহ উবু হয়ে বসে ছোট্ট একটু চুমুক ছাড়লেন ভয়ে ভয়ে। কী হরিশঙ্কর, কী বুঝলে?
পারফেক্ট। যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
মাঝারি ধরনের আর একটি চুমুক মেরে বললেন, এইবার?
শাবাশ!
নিমকির দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে টেনে নিলেন। মুখে নিমকি পড়লে যে একটু মুচমুচ শব্দ হবে।
মুচমুচ অ্যালাউ করা যায়, কারণ ওটা বস্তুর ধর্ম, কিন্তু তারপর যদি চ্যাকোর চ্যাকোর শব্দ হয় তখনই হবে অভ্যাস দোষ।
তা হলে থাক বাবা। দরকার নেই খেয়ে।
না না, ইতিবাচক সাধনা। খেয়ে প্রমাণ করতে হবে সিদ্ধপুরুষ।
মাতামহের ট্রেনিংপর্ব চলেছে। আমাকে উপলক্ষ করে সেই বীরত্বের কাহিনি ধামাচাপা রইল। সরে পড়াই ভাল। পিতার চোখ পড়ল এতক্ষণে, তুমি তা হলে কীভাবে সাহায্য করবে?
যেভাবে বলবেন!
যেভাবে বলব? বেশ, তা হলে একটা কর্মতালিকা তৈরি করা যাক। মুখুজ্যেমশাই হলুদ আর সরষে বাটার চেষ্টা করবেন আর যে-কোনও একটা পদ রাঁধবেন।
রান্না কি আমার আসবে হরিশঙ্কর?
বেঁধে প্রমাণ করতে হবে আপনি মহিলা নন, পুরুষ।
সে আবার কী কথা?
পৃথিবীর সমস্ত বড় বড় রাঁধিয়েই হল পুরুষ, গঞ্জালেস, আবু বকর, স্টুয়ার্টলয়েড, আমাদের হালুইকর বিচিত্রবীর্য। সব পুরুষ। রান্নার জগতে মেয়েছেলের স্থান নেই। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি বাছবে চাল। তোমার ওই রমণীমোহন চাচর চিকুরে ওই মেয়েলি কর্মটিই ভাল মানাবে।
আহা, তুমি আবার ওকে নিয়ে পড়লে।
পড়ব না! চুল ছাড়া ওর আর আছে কী? ভেবেছে চুল দিয়ে নারীচিত্ত জয় করবে! কৃষ্ণের হাতে শুধু বাঁশি ছিল না, সুদর্শন চক্রও ছিল। বুকের পাটা চাই। হাতের গুলি চাই। এই দেখো, তোমার সামনে তোমার পিতা, তোমার মাতামহ। সব ছেচল্লিশ ইঞ্চি।
সব ভুলে পিতার পাশে দাঁড়িয়ে সিমুলিয়ার ব্যায়ামবীরের মতো মাতামহ হাতের গুলি দেখাতে লাগলেন।
১.০৩ ছায়া, মায়া, কায়া
রান্নাঘরে এক ডেকচি জলের মতো ঝোলের তলদেশে ছাল-ছাড়ানো আস্ত একটা মাগুর কাঁচকলার বালিশ মাথায় দিয়ে শেষ শয্যায় শুয়ে আছে। জমাট অশ্রুবিন্দুর মতো গুটি পাঁচেক মরিচ শোকে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর একটি পাত্রে শ্রাদ্ধের পিণ্ডের মতো অতি পুরনো চালের এক ড্যালা ভাত। পিতাঠাকুর পেটরোগা ছেলের আহার প্রস্তুত করে রেখে, চোগাচাপকান চাপিয়ে অফিসে চলে গেছেন। খাখা বাড়ি। পৃথিবীর চাকা ঘুরছে। এখানে মুহূর্ত যেন স্থির। কিছুই করার নেই। মোটা মোটা ভারী ভারী বই আছে। দেয়ালে দেয়ালে জ্ঞানভাণ্ডার ঝুলছে ঝুলের আবরণে। পণ্ডিত হতে চাইলে হওয়া যায়। মগজে গোবর। দাঁতের জোর থাকলে ইঁদুরের মতো চিবোনো যেত। সেও তো পোকা খেয়ে ভাঙা, আধভাঙা হয়ে বসে আছে। প্রায়ই পিতার সামনে হাঁ করে দাঁড়াতে হয়। ভাগ্য ভাল, তার সঁতও তেমন সুবিধের নয়। আমার গেছে যত্ন না নিয়ে, তার গেছে অতি যত্নে। যখনই সময় পান শক্ত বুরুশে ইঞ্চিখানেক পেস্ট নিয়ে খসর খসর করে ঘষতে থাকেন। ঘর্ষণে পাথর খয়ে যায়, দাঁতের এনামেল তো কা কথা।
বিজয়দা বলেছিলেন, সাইকেল শিখতে চাস? তা হলে সাইকেল হাঁটাতে শেখ।
বিজয়দা একটা মোটা খাতা নিয়ে বাড়ি বাড়ি ট্যাক্স আদায় করতেন, আর আমি তার পেছন পেছন বিশাল ভারী এক র্যালে সাইকেল নিয়ে হেঁটে হেঁটে পায়ের খিল খুলে মরি। মাঝে মাঝে। লগবগে হয়ে নর্দমায় পড়ে যাবার মতো হয়। প্যাডেলের খোঁচা খেয়ে পায়ের ছালচামড়া উঠে যায়। মাঝে মাঝে সংশয় জাগে, এতে আমার কী লাভ হচ্ছে! বিজয়দার মতে, এ হল জোড়ে হাঁটা। অনেকটা বিয়ের মতো। গাঁটছড়া বেঁধে সাত পা হাঁটলেই বোঝা যায়, যার সঙ্গে ঘর করতে চলেছ, তার ধাতটি কেমন! তিনি কোন দিকে টাল খান, চলন কেমন? জোড়ে শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় আরও কিছুটা বুঝে গেলে। সঙ্গে সঙ্গে তোমার ব্যালে এসে গেল। বুঝে গেলে, কীভাবে চড়তে হবে, চালাতে হবে। দু’চাকার সাইকেল আর স্ত্রীজাতি একই জিনিস। নাড়াচাড়া না করলে, দূর থেকে ধাত কি স্বভাব বোঝা যায় না। চালাতে জানলে চলবে, নয়তো ফেলে দেবে নালায়।
