আর পেছনে যিনি উঠছেন? দেখেই বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল। ইনিই সেই বর্ষারাতের ছবি। জীবন্ত হয়ে উঠে আসছেন? সিল্কের শাড়িতে বসন্তের পুষ্পিত উদ্যান। পাখি নেই তবু পাখি ডাকছে। ঈশ্বর কী যে একটা জিনিস তৈরি করে ফেলেছেন। নাকে আবার হিরের নাকছাবি। কানে ঝাড়লণ্ঠন। ননির হাতে মিছরির ছিলে-কাটা কয়েক সার চুড়ি। গলায় সোনার ইঁদুর-দাত, সৃষ্টিকর্তার তৃপ্তির হাসির মতো হারে মূৰ্হিত। সেই হারের গতি উপত্যকা বেয়ে পর্বতচূড়ার দিকে চলে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন যেন মোলায়েম একটি ছন্দ! প্রতি পদক্ষেপে সিঁড়ির ধাপ রোমাঞ্চিত হচ্ছে। দু’পাশের দেয়াল যেন বলছে দেখো, দেখো। মানুষের পা কেমন করে এমন নিটোল হয়! নিতম্ব কেমন করে এমন দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। মানুষের মুখে দেবতা কীভাবে এমন করে হাসেন, শরীর কেমন করে এমন কবিতা হয়, হাত কেমন করে এমন মৃণালকাণ্ডের মতো মহাপ্রভুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
আমাকে আর রিসিভ করতে হল না। আমি হাঁ করা গঙ্গারামের মতো সিঁড়ির মাথায় বাক্যহারা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। মন বলতে লাগল, পালা ব্যাটা, বড় সুন্দরী, মনে গেঁথে গেলে, বঁড়শি-বেঁধা মাছের মতো অবস্থা হবে। পায়ে পক্ষাঘাত। পালাব কী, পা জমে গেছে। দুটো পাথরের স্তম্ভ।
হাঁ-করা আমার সামনে দাঁড়িয়ে, সেই সুগৌর গিরিগোপাল বালামচালের মতো মিহি গলায়, মুখ থেকে বিরিয়ানির আতরের সুবাস ছড়াতে ছড়াতে বললেন, বাবা কোথায়?
প্রশ্ন শুনে, শরীরের সাময়িক পঙ্গুভাব কেটে গেল। হঠাৎ মনে হল অতিশয় চাঙ্গা হয়ে উঠেছি। বললুম, বাবার এক্সপেরিমেন্ট ফেল করেছে। রং মেখে হতাশ হয়ে বসে আছেন।
অ্যাঁ বলো কী? হরি, ঘাবড়ানি, ফেলিয়োর ইজ দি পিলার অফ সাকসেস!
গলা যতটা তুলেছিলেন ঠিক ততটা নামিয়ে বললেন, রং নিয়ে কী করছে?
এ প্রশ্নের উত্তর আমাকে আর দিতে হল না। পিতৃদেব এসে গেছেন। দেবতার মতোই দেখাচ্ছে। একেবারে লালবাবা। হাতে সেইসব ভজঘট। ছিপি, কাঁচের টিউব, রবারের নল। বিশ্বকর্মা শেকড় সমভিব্যাহারে উঠে এলেন।
ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন, একেবারে ফ্রেশ ফ্রম গার্ডেন, কাশ্মীরি আপেলের মতো চেহারা। অ্যাঁ, তোকে ঠিক ড্যানি কে, বাস্টার কিটনের মতো দেখাচ্ছে যে রে!
মেয়েটি টুক করে পিতার চরণে প্রণাম নিবেদন করলেন। এসো মা এসো মা বলে চিবুক ছুঁতেই ব্যাপারটি বেশ মনোরম হল। অধরের তাম্বুল যেন শ্রীরাধিকার বয়ানে লেগেছে। পিতার হাতের লাল রঙে চিবুক লাল, গালের একাংশ লাল।
ভদ্রলোক বললেন, গিয়েছিলুম দক্ষিণেশ্বরে মেয়েকে নিয়ে। আঃ, দর্শন করে মন ভরে গেল। আহা মায়ের কী রূপ। নে মা, প্রসাদটা কোথাও রাখ। তা বুঝলি হরি, হঠাৎ তুই যেন টানলি। মনে হল, যাই একবার বিজ্ঞানীকে দেখে যাই। তা ভাই, তোমার হাতে এই জলকলমি, শাপলা, শালুকের মতো বস্তুগুলি কী?
আর বলিস কেন পঙ্কজ, কমপ্লিট ফেলিয়োর, টোটাল ডেস্ট্রাকশন, লস অফ মানি, মেটিরিয়েল, ম্যান পাওয়ার। খাওয়াদাওয়া?
মন যা বলছে বলব?
ইয়েস।
ভয়ে না নির্ভয়ে।
নির্ভয়ে।
এইখানেই হয়ে যাক।
হয়ে যাক।
একটা প্রস্তাব। আমি রাঁধব। এবং মাংস রাঁধব।
পাবে কোথায়?
এই যে আমার হাতে। হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই কি আমায় এতই মূর্খ ভাবিস?
ত্যাদোটা নয়।
নিজেদের রসিকতায় নিজেরাই হইহই করে হেসে উঠলেন। মরা ডালে যেন ফুল ফুটছে। কড়িকাঠের ঘুলঘুলিতে চড়াইছানা চমকে জেগে চিচি করছে।
তা হলে, পঙ্কজবাবু টেবিলে চাপড় মেরে বললেন, লেগে পড়া যাক। বুড়ি?
মেয়ে প্রসাদের ঠোঙা হাতে এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সামনে এসে বললে, বলো বাবা?
নাও মা, লেগে পড়ো। তোমার এই রাজবেশটি ছাড়ো। প্রসাদটা রাখো না, মা।
রাখার জায়গাটা যে কেউ দেখিয়ে দিচ্ছেন না আমাকে।
আহা, তুমি নিজে দেখে নাও।
অলরাইট।
অপর্ণা আপনজনের মতো সহজ ভঙ্গিতে ভেতরে চলে গেল। পিতা বললেন, যাও যাও, তুমি সাহায্য করো। কোথায় কী আছে দেখিয়ে দাও।
পঙ্কজবাবু বললেন, তোর ছেলেটিকে বেশ দেখতে হয়েছে, হরি। মায়ের মুখটি একেবারে কেটে বসানো। খালি গায়ে সের দশেক মাংস লাগাতে পারলে একেবারে মাউন্টব্যাটেনের মতো দেখতে হত।
কী আশ্চর্য মিল, পঙ্কজ। একবার ভেবে দেখেছিস?
ওই মুখের মিলের কথা বলছিস!
তোর মেয়ের মুখের সঙ্গে পিন্টুর মায়ের মুখ।
উঃ, একেবারে সেন্টপারসেন্ট। সেন্টপারসেন্ট মিল। পৃথিবী জুড়ে কী যে সব হতে থাকে। কোথা থেকে কী যে হয়ে যায়। আমার তো মাঝে মাঝে রাতে ঘুম হয় না। ভাবতে ভাবতেই রাত কেটে যায়। দেখ হরি, সব মানুষই দার্শনিক। যার যার নিজের মতো। একটু চা হবে না!
চা হবে না মানে! চা-ই তো আমাদের জীবন। একশো ফোঁটা রক্তে পঞ্চাশ ফোঁটা চা।
পঙ্কজবাবু অট্টহাসি হেসে বললেন, রাক্ষসের প্রাণ যেমন ভোমরায়, তোর আর আমার জীবন তেমনি চায়ের পাতায়। বুঝলি হরি, বড় দুঃখ হয় রে!
কীসের দুঃখ বল! তোর কীসের দুঃখ।
দেখ, তোর বউ মারা গেল, মানে বউঠান মারা গেলেন, তুই সংসারে বড় একা, আমার কিন্তু সবাই আছে, একেবারে পরিপূর্ণ সংসার। আমার সব থাকবে, তোর কিছু থাকবে না, এরকম কেন হবে? খোদার এ কী বিচার! তোর কথা ভাবলেই আমার ভীষণ লজ্জা করে। তুই যোগী, আমি ভোগী। আমি কত ক্ষুদ্র, তুই কত বিশাল।
দেখ পঙ্কজ, আমিও তোর কথা ভীষণ চিন্তা করি। আর যখনই চিন্তা করি, মনে ভীষণ বল পেয়ে যাই, ভাবি পঙ্কজ আমার পাশে আছে। সত্যি কথা বলতে কী, তুই আমার ভায়ের মতো।
