বড়া আমার বড় প্রিয়, না বলি কী করে?
তা হলে এসো, পিড়ে পেতে দিই, বোসো, গরম গরম ভাজি। বড়া ভাজতে ভাজতে কাকিমা বললেন, আমার বড় শখ ছিল।
কী শখ?
ওই সেই মাথা-খোলা ঘোড়ার গাড়ি চড়ে সারা কলকাতাটা একবার ঘুরব।
ঠিক আছে, ঘোরাব।
আরও একটা আছে।
কী, বলে ফেলুন?
লাজুক-লাজুক মুখ করে বললেন, কাপের আইসক্রিম খাব।
ঠিক আছে খাওয়াব।
আর একটা ভীষণ ইচ্ছে ছিল।
বলুন?
নাঃ, সেটা আর তোমাকে বলব না। সে ভগবানকে বলার জিনিস।
বুঝেছি।
হাসতে হাসতে বললেন, বুঝেছ তো? বড় একা লাগে। আমার তো কেউ নেই।
ঘুরঘুরে বাবার কাছে যাবেন? তিনি সব পারেন।
একদিন নিয়ে চলো না গো!
ঠিক আছে, পরের অমাবস্যায় নিয়ে যাব। সারারাত কিন্তু থাকতে হবে!
ও বাব্বা, তা হলেই তো বিপদ!
খানকতক বড়াভাজা খেয়ে ওপরে উঠে এলুম। শুনলুম কাকিমা গান গাইছেন, ওই দেখা যায় বাড়ি আমার চারদিকে মালঞ্চের বেড়া। গলাটি বেশ সুন্দর। কোথা থেকে এই গানটি শিখলেন কে জানে! মুকু এসে গম্ভীর মুখে বললে, বাবা একবার ডাকছেন।
মেসোমশাই মেঝেতে মাদুরের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছেন, হাল-ভাঙা তলা-হ্যাঁদা নৌকোর মতো। ঘরে ঢুকতেই নরম গলায় বললেন, বোসো।
ভদ্রলোকের ব্যারিস্টারি সুর পালটে গেছে। আহা, মাটিতে কেন, মাদুরে উঠে বোসো।
মেসোমশাই শয়ান থেকে অর্ধশয়ান হলেন। আমার মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, একটা কথা বলব?
হ্যাঁ বলুন না?
আমার আপত্তি নেই। বুঝলে, আমার আর কোনও আপত্তি নেই। তা ছাড়া তুমি চাকরিবাকরি করছ।
আপনি কী বলছেন, কিছুই বুঝতে পারছি না।
খুব পারছ বাবা। তুমি কি কম ছেলে, ওই যে মিটমিট করে, কলসা নাড়ায়, সে বড় সাংঘাতিক।
দেখুন, আমাদের এখন বিপদের দিন, দাগা মারা কথা নাই বা বললেন।
আমার মাথার ঠিক নেই বাবা, তুমি বাপ হলে বুঝতে। কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কীসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে! তুমি কনককে খুঁজে বের করো, আমি তোমার সঙ্গেই তার বিয়ে দেব।
আমার সঙ্গে? বোনের সঙ্গে ভাইয়ের বিয়ে?
আহা, তুমি তো সেরকম ভাই নও। রক্তের সম্পর্কে ভাই হলে কথা ছিল। তুমি তো ছেলে খারাপ নও। তা ছাড়া হরিদা, অমন মানুষ তুমি আর দুটি পাবে না। একজন মানুষের মতো মানুষ। অনেস্ট, সেনসিল, এ ম্যান অফ ক্যারেক্টার। যা শুনছি, তা ঠিক?
কী শুনছেন?
হরিদা একেবারে গঙ্গার ধারে একটা জায়গা কিনেছেন?
বোধহয়। আমি ঠিক জানি না।
চেপে যাচ্ছ?
সত্যিই জানি না। আমার সঙ্গে বৈষয়িক কথাবার্তা একেবারে হয় না।
আরে, তুমি বাপের এক ছেলে। সব খবর রাখবে। একটু একটু করে সব বুঝেসুঝে নেবে। মানুষের জীবন। কিছু বলা যায়? আজ আছে কাল নেই।
আর কিছু বলবেন?
কাছে সরে এসো, চুপিচুপি, বিটুইন ইউ অ্যান্ড মি। কনককে কোথায় রেখেছ? ওয়ার্ড অফ অনার কাউকে বলব না।
আশ্চর্য মানুষ আপনি! আমাকে কী করে আপনি কিডন্যাপার ভাবলেন?
না, তোমার সঙ্গে বেশ একটু ইন্টিমেসি গড়ে উঠেছিল। আর আমি একটু অন্য রাস্তায় চলতে চাইলুম। যদি জানো, বলে ফেলো বাপু।
আমি জানি না। তবে জানার চেষ্টা করছি। আমি কনককে দেখেছি। সে আছে আশ্রমে। মনে হয় সন্ন্যাসিনী হয়ে যাবে। এখনও অবশ্য গেরুয়া পরেনি।
মাথা ন্যাড়া করেছে?
না, এখনও করেনি।
কতরকমের গল্প যে তোমরা বানাতে পারো!
আপনাকে তো আমি বিশ্বাস করতে বলিনি। আমার বিশ্বাস আমারই থাক।
তোমার স্বভাবটি বড় উদ্ধত। আর হবে না কেন? বাবার এক ছেলে। আদরে আদরে খাস্তা হয়ে গেছ!
তা হবে।
পিতা সকাল থেকেই এক যান্ত্রিক উদ্ভাবন নিয়ে বড় ব্যস্ত। কয়েক টিন রং এসেছে। যত বাক্সপ্যাটরা আছে, সব নতুন অঙ্গসজ্জায় ডোল পালটাবে। হলদে নীল হবে, নীল কমলা হবে, সবুজ লাল হবে। যে রং এসেছে, সে রং বুরুশে লাগানো যাবে না। রং বড় তাড়াতাড়ি উড়ে যায়। টানা যায় না। প্রেগান চাই। সেই স্পে-গানের উদ্ভাবনে সকাল গড়িয়ে গেছে। মনে হয় দুপুরও পার করে দেবেন। খাওয়াদাওয়া মাথায় উঠল। কাপ কাপ চা চলছে। গোটা ছয়েক কাপ পড়েছে। সব। একবারে ধোয়া হবে।
রান্নাঘরের দিক থেকে তার কণ্ঠ ভেসে এল, যাঃ, হয়ে গেল। খেল খতম।
পেটামোটা গোলগলা একটা শিশির মুখে রবারের ছিপি। ছিপিতে দুটো গর্ত। একটা গর্তে সোজা একটি কাঁচের নল, অন্য গর্তে একটি বাঁকা নল। এই পর্যন্ত থিয়োরিতে কোনও গোলমাল ছিল না। সোজা নলে ফুঁ মারলেই বাঁকা নলে তরল পদার্থ তোড়ে বেরোবে। আধ শিশি রং ভরে পিতা যেই ফুঁ মেরেছেন, বাতাস ও তরল রঙের ঊর্ধ্বচাপে ফটাস করে ছিপি ছিটকে চলে গেছে। চতুর্দিকে রঙের স্রোত বইছে। মাতামহ দেখলেই গান গেয়ে উঠতেন, হোরি খেলত নন্দকুমার। সুপক্ক সিঙ্গাপুরি কলার ভুরভুরে গন্ধ বাতাসে। এই রঙে এমন একটা কিছু আছে, যার গন্ধটাই পাকা কলার মতো।
রঙের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গিয়ে, পিতা নেপোলিয়ানের মতো মুখ করে বসে আছেন। নাকের ডগা লাল টুকটুকে। দাড়িতেও রং লেগেছে। ছিপিটা পড়ে আছে চিতপাত হয়ে। কলার গন্ধ পেয়ে বলাইবাবু ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। কাকে সামলাই! রঙে ভাসমান পিতাকে না কচ্ছপটাকে! ওদিকে এই অবেলায় সিঁড়ি বেয়ে একটি কণ্ঠস্বর উঠে আসছে, হরি আছিস, হরি! পিতা বললেন, রিসিভ দেম, রিসিভ দেম।
১.৩৩ অধরের তাম্বুল বয়ানে লেগেছে
সিঁড়ি ভেঙে যিনি উঠে আসছেন, তাঁকে আগে আমি কখনও দেখিনি। গোলগাল, আদুরে আদুরে চেহারা। টকটকে গায়ের রং। ডান গালে বেশ বড় লাল একটি আঁচিল। কেঁকড়া চুল, একমাথা, বাতাসে এলোমেলো। গিলে করা মিহি পাঞ্জাবি। এত মিহি নয় যে গেঞ্জি দেখা যায়। দুধের মতো ধবধবে সাদা। কালোপাড় ধুতি। পায়ে কালো ভেলভেটের চটি। গৌরবর্ণ পায়ে কালো চটি বড় আচ্ছা মানিয়েছে। কপালে সিঁদুরের ফোঁটা, মুখের লাল আভার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
