তেল সাবান স্নো পেয়ে কাকিমা কী খুশি। একবার এর ছিপি খোলেন, ওর ঢাকনা খোলেন, গন্ধ শোকেন আর বারেবারে বলেন, এই সব তুমি আমাকে দিলে? তুমি আমাকে একেবারে দিয়ে দিলে? কখন মাখি বলো তো! একদিন এইসব মেখেটেখে, বেশ সেজেগুঁজে কোথাও গেলে হয়! যাবে একদিন?
কাকাবাবু রাগ করবেন।
তাও তো বটে! আমি এক ক্রীতদাসী, হেঁশেল ঠেলার জন্যেই জন্মেছি। জন্ম আঁতুড়ঘরে, মৃত্যু রান্নাঘরে। যাই বলল, তোমাকে আজ বেশ ঠাকুর ঠাকুর দেখাচ্ছে।
তাড়াতাড়ি বলুন, কী করতে হবে। এখুনি ওপরে হাঁকাহাঁকি শুরু হয়ে যাবে।
তুমি ওই কুলুঙ্গির পরদাটা সরাও। ধূপ জ্বালো, বাসি ফুল ফেলে নতুন ফুল দাও, কৌটোয় বাতাসা আছে, পুজোর থালায় গোটাকতক সাজিয়ে দাও, ছোট এক গেলাস গঙ্গাজল ধরে দাও। পরদা টেনে চোখ বুজিয়ে আসনে বসে বলল, মা খাও, মা খাও।
কাকিমা বড় গোছানে। এই এঁদো ঘরেই কী সুন্দর আয়োজন! পরদাটি একপাশে সরাতেই তেত্রিশ কোটি দেব-দেবতার বেশ কয়েকজনের দর্শন মিলে গেল। পরিচ্ছন্ন পটে হাসিহাসি মুখ মা কালী, দশভুজা দুর্গা, গণেশ, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী, সুদর্শন চক্রধারী নারায়ণ, মাটির মহাদেব, পেতলের রাধাকৃষ্ণ।
চেয়ারের ওপর গোল করা ছিল কম্বলের আসন। মেঝেতে পেতে চোখ বুজিয়ে বসলুম। সবই মায়ের খেলা। কেমন ফাঁদে ফেলে দিলেন। কাকিমা না বললে, এমন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের মতো। আসনে বসতুম কি! কার পুজো কে করে! চোখ বুজোতেই, প্রথমে ভেসে উঠল কাকিমার মুখ। সেদিনের সেই ছবি, হাতে জবাফুল নিয়ে বেরোবার সময় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সে মুখ চোখের সামনে থেকে সরতেই চায় না। অতি কষ্টে যদিও বা সরানো গেল, সামনে এসে দাঁড়ালেন ঘুরঘুরে বাবা। আমি বললুম, বাবা খাও। কী আর করব, দেবী যখন দর্শনে দুর্লভ, দেবতার প্রতিনিধিকেই নৈবেদ্য নিবেদন করি।
বাবা হাসলেন। বলতে চাইলেন, সামান্য ফুল বাতাসা কী খাব রে শালা! আমার ভোগ আলাদা। বাবা দুই চোখের মাঝখানের অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন। এসে দাঁড়ালেন ঊষাদি। বাঃ বেশ মজা! জয়ামাতার আসতে কী হয়েছিল! ঊষাদির হাতদুটো আমার মুখের দিকে এগিয়ে আসছে। এখুনি উঁচু করে তুলে ধরে ঠোঁটে ভিজেভিজে চুমু এঁকে দেবেন। শরীরে রোমাঞ্চ হচ্ছে। মনে মনে বললুম, না না, আর না।
ঊষাদি সরলেন বটে, এসে গেলেন চিত্রাদেবী। ঘনঘন রুমাল নাড়ছেন আর বলছেন, বাব্বা, কী গরম! ব্যর্থ চেষ্টা। কোনও দেবীই এই পোড়া চোখে আসবে না। দৃষ্টি দূষিত হয়ে গেছে। আসন। গুটিয়ে উঠে দাঁড়ালুম। কাকিমা বললেন, ‘উঃ তোমার কী ভক্তি গো। খাড়া বসে আছ তো বসেই আছ। তোমার মতো ভক্তি পেলে আমি নির্ঘাত স্বর্গে যেতুম। নাও, প্রসাদ তুলে নাও। একটা বাতাসা মুখে ফেলো, আমি জল এনে দিচ্ছি।
ঝকঝকে মাজা গেলাসে জল খাচ্ছি, কাকিমা বললেন, আহা রে গরমে পিঠটা ঘেমে গেছে। মুক্তোর দানার মতো ঘাম ফুটেছে, এসো মুছিয়ে দিই।
শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার পিঠের ঘাম মোছাতে লাগলেন। এবার গায়ে কাঁটা দিল ভয়ে। পিতৃদেব একবার যদি দেখতে পান, বলবেন, যাও, চান করে এসো। আঁচলে অশুদ্ধ হয়েছে।
আমি তা হলে এবার আসি কাকিমা!
না, আর তোমাকে আটকাব না। কাল সকালে তুমি আমার পুজোটা করে দেবে!
সময় পাব! কাল তো আমার অফিস!
ওই তো চান করে ওপরে ওঠার আগে।
ঠিক আছে। কাকাবাবু কোথায় গেছেন?
কাকিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তবলা বাজাতে।
কোথায়? দূরে?
মহিষাদল রাজবাড়িতে।
কবে ফিরবেন?
যবে সেই মেয়েমানুষটা ফিরবে।
মেয়েমানুষ?
সে তুমি বুঝবে না। তুমি এখনও বড় সরল। মানুষের বয়েস বাড়লে তার সব চলে যায়। তোমাকে একটা জিনিস দেখাব, একটু দাঁড়াও।
কাকিমা নিচু হয়ে চৌকির তলা থেকে একটা টিনের বাক্স বের করলেন। ডালা খোলার সময় কোচ করে একটা শব্দ হল। নাকে এসে লাগল অতি পরিচিত, সুখ-সুখ সঞ্চয়-সঞ্চয় সংসার-সংসার একটা গন্ধ। এ গন্ধে ত্যাগ নেই, সন্ন্যাস নেই, অনেকটা মেয়েদের অঙ্গের গোপন গন্ধের মতো। বহু দূর থেকে ভেসে আসা, বহু দূরে চলে যাওয়া। কিছু কিছু ব্যাপার আছে, যা আমার কাছে ভারী অদ্ভুত। গোলাপি রং, বাক্সের ডালা খোলার শব্দ, ভেতরের ন্যাপথলিন আর সেন্ট মেশানো গন্ধ, ঝুলনের পুতুল, কালীয়দমন, বকাসুর বধ, উত্তরা অভিমন্যু, রথের চাকা বসে-যাওয়া বীর কর্ণ, সুভদ্রা হরণ, বর্ষাকাল, রথ, একই সঙ্গে পেঁয়াজি আর কঁঠালের গন্ধ। মনের ভেতর মঞ্জিল তৈরি হয়।
কী গো তোমার ঘোর লেগে গেল নাকি? কোন জগতে চলে গেছ? তখন থেকে তোমার পেছনে। দাঁড়িয়ে আছি।
আপনার বাক্স খোলার শব্দে ছেলেবেলায় চলে গিয়েছিলুম?
ইস, তুমি একেবারে ঠিক বলেছ। বাক্সটা খুললে আমারও তোমার মতোই মনে হয়। কোথায় যে চলে যাই। আর একবার মরে জন্মাতে ইচ্ছে করে।
আপনি এর মধ্যে কতবার মরেছেন কাকিমা?
ওই হল রে বাবা। বলতে গিয়ে গুলিয়ে গেছে। মরে আর একবার জন্মাতে ইচ্ছে করে। নাও। দেখো। সিল্কের সুতো দিয়ে বোনা গেঞ্জির মতো কী একটা জিনিস কাকিমা আমার হাতে তুলে দিলেন।
কী এটা? গেঞ্জি?
হ্যাঁ গো? কার বলো তো?
কার? কাকাবাবুর?
আজ্ঞে না মশাই। তোমার। কাউকে বলবে না। আর দু-এক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
এই সুতো পেলেন কোথায়?
সে খবরে তোমার দরকার কী? বড়াভাজা খাবে?
