অসম্ভব, ভাবলেই গা গুলিয়ে উঠছে।
ওরা কিন্তু সবচেয়ে বড় উৎসবের দিনে সম্মানিত অতিথিকে নাপ্পি পরিবেশন করে থাকে। সবচেয়ে বড়া খানা, আমাদের বিরিয়ানির মতো। সবই হল অভ্যাসযোগ। উট কাটাগাছ খায়। আপনি পারবেন। আমাদের ফকস সাহেবও আগুন খেয়ে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে। গণপতি ম্যাজিশিয়ান, কাটা পেরেক, কাঁচ, অ্যাসিড মুড়িমুড়কি আর শরবতের মতো খেতে পারেন। এর মধ্যে ধর্ম নেই, ঈশ্বরও নেই। কৌশল।
তোমার কোনও কথাই আমি ঠিকমতো ধরতে পারি না। আজ এক রকম বলো, কাল এক রকম বলো। এই সেদিন বললে, ভূত আছে। ভূত থাকলে ভগবানও আছে। আজ বলছ কিছুই নেই। ঘুরঘুরে বাবা জাদুকর হলেও, তোমার ছেলে তো ম্যাজিশিয়ান নয়। ও তা হলে কীভাবে দেহমুক্ত হয়ে সারাভারত ঘুরে এল। শেষে সেই হৃষীকেশের এক আশ্রমে কনককে খুঁজে পেল।
এই ঘরে বসে আমিও সারাভারত এখুনি ঘুরে আসতে পারি। দেখবেন? আমি এক্ষুনি কন্যাকুমারী চলে যাব! কল্পনাপ্রবণ মানুষ অনেকরকম ধাপ্পা দিতে পারে। কাঞ্চীপুর বর্ধমান ছয় দিনের পথ, একদিনে উত্তরিল অশ্বমনোরথ।
কী তুমি বলছ হরিশঙ্কর! তোমার মতো কালাপাহাড় কেউ দেখেছে! আমার নাতি ধাপ্পা দেবে?
ধাপ্পা দেবে কেন? স্বভাবে দুর্বল শরীরে দুর্বল। সে পড়েছে বলিষ্ঠ মনের খপ্পরে। ওর। কল্পনাটাকেই তিনি সত্যির মতো করে দেখিয়েছেন। একে বলে সাজেশন। যেমন মায়ায় জগৎভ্রম। কোথাও কিছু নেই, অথচ আমরা ঘরবাড়ি দেখছি, পাহাড়পর্বত দেখছি, গাছ দেখছি, ফুল দেখছি। স্বপ্নই কেমন সত্য হয়ে উঠছে। আজ থেকে ছ’বছর আগে ও আমার সঙ্গে হৃষীকেশে গিয়েছিল। বম্বে, মাদ্রাজ, দিল্লি, কানপুর কোথাও গেল না ও গেল হৃষীকেশে। সেখানে সারদা ভবনের প্রেয়ার হলে কনককে দেখে এল। এর চেয়ে সহজ রচনা আর কী আছে!
রচনা?
হা রচনা। পরীক্ষায় দেয় না? তোমার জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, একটি দিন, ওই জাতীয় একটা কিছু। মেসোমশাই সর্দিতে ফেসর ফোঁসর করতে করতে ঘরে এলেন। ভদ্রলোকের মন আর শরীর দুটোই ভেঙে পড়েছে। মুকু এমনিই একটু অমিশুক ধরনের ছিল। দিদির অন্তর্ধানে আরও গম্ভীর হয়ে। গেছে। বেশির ভাগ সময়েই বারান্দায় বসে বসে উদাস চোখে আকাশ দেখে। কাছে গেলে সরে যায়।
মেসোমশাই চেয়ারে বসে বললেন, তা হলে আমরা কবে যাচ্ছি?
পিতা বললেন, কোথায় যাবেন?
কেন হৃষিকেশে? কনক যে-আশ্রমে আছে।
কী করে বুঝলেন কনক হৃষীকেশেই আছে?
এই যে ওঁরা বললেন।
ওঁরা কি দেখে এসেছেন?
না তা নয়, তবে দৈবপ্রভাবে দেখেছেন।
পিতা বললেন, আমার আর কিছু বলার নেই। তিনি উঠে চলে গেলেন। একেবারে ঘরের বাইরে। মাতামহ বললেন, এই একটা মানুষ! কখন যে কীরকম! বাঘকে বাগ মানানো যায়। আমার এই জামাইটিকে যায় না। আমিও চলি। হাওয়া বড় এলোমেলো বইছে।
মেসোমশাই অসহায়ের মতো বললেন, একটা সিদ্ধান্তে তো আসতে হবে!
তা হবে, তবে সিদ্ধান্তে আসার মালিক তো উঠে চলে গেল। সে দলে না ভিড়লে কিছুই তো করা যাবে না।
মেসোমশাই হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, উঃ কী ফাঁপরেই যে পড়া গেল!
মাতামহ সত্যিই চলে গেলেন। মেসোমশাই আমার সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলেন না। অপরাধীদের তালিকায় আমি বোধহয় পয়লা নম্বরে আছি। আসামি নাম্বার ওয়ান।
কেউ কিছু না করুক, আমি করবই। প্রয়োজন হলে গৃহত্যাগেও প্রস্তুত। আমি কনককে স্বচক্ষে দেখেছি। চোখ কি চোখের! চোখ তো মনের। পিতা যাই বলুন, ঘুরঘুরে বাবার অসীম শক্তি। আমি আমার থেকে বেরিয়েছি, আবার আমাতে এসে ঢুকেছি। এমন অভিজ্ঞতা ক’জনের হয়! ম্যাজিক বলে উড়িয়ে দিলেই উড়ে যাবে! জ্ঞান দিয়ে, বিজ্ঞান দিয়ে কি সবকিছুর সমাধান হয়! তাই যদি হবে তা হলে মাঝরাতে ঘরে সেই জোড়া চামচিকি ঢুকলে, পিতা কেন রহস্যময় গলায় বলেন, চুপ, চুপ, এসেছে। সে তা হলে কীসের ইঙ্গিত!
দুপুরে সবে চান করে উঠেছি, কাকিমা ফিসফিস করে বললেন, তুমি আমার একটা উপকার করবে?
বেশ ভয় পেয়ে গেলুম, তবু বললুম, কী উপকার?
কাপড় ছেড়ে এসে তুমি আমার পুজোটা করে দেবে?
কী পুজো?
এমন কিছু না, ঠাকুরকে একটু ফুল, বাতাসা আর জল দিয়ে দেবে, আর একটা ধূপ জ্বেলে দেবে।
রোজ তো আপনি দেন, আজ আমি কেন?
মেয়েদের মাসে পাঁচ দিন ঠাকুর ছোঁবার উপায় থাকে না।
কেন?
উঃ আচ্ছা বোকার পাল্লায় পড়েছি! সব কেনর উত্তর দেওয়া যায় না। বুঝে নিতে হয়। পাঁচ দিন। মেয়েদের শরীর খারাপ থাকে। এত বড় ছেলে হলে, কত কী যে জানো না!
কাপড় ছেড়ে আবার নীচে নামতে হল। সেদিন অফিস থেকে একটা ফ্রিপ্যাকেট পেয়েছি। তাতে ছিল, গোটাকতক গায়েমাখা সাবান, দুটো কাপড় কাঁচার বড় বার সাবান, মাথায় মাখার দু’শিশি তেল, স্নো, সেন্ট, পাউডার। ঠিক করেছিলুম হাফ কাকিমাকে দোব, আর হাফ দেব মায়াকে। যতই হোক মায়া আমার প্রেমিকা। একটু পাগলি আছে। সেদিন একটা চিঠি লিখেছে। কী তার ভাষা! মনে হয় কোনও বই থেকে টুকে দিয়েছে। প্রিয়তম, জীবন বড় ছোট। একদিন ফুরিয়ে গেলে টের পাবে, তখন চোখের জল ফেললেও আমাকে আর পাবে না। তুমি বলেছিলে সাধু হবে, আমি হব তোমার ভৈরবী। তোমার একটা কথারও যদি ঠিক থাকত। শুনলুম চাকরি পেয়েছ? চলো এবার তা হলে পালাই। চিঠিটা গোল করে ঢোলের মতো একটা মাদুলির মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছি। পিতৃদেবের হাতে পড়লেই হয়েছে আর কী!
