প্রস্তুত হ, প্রস্তুত। তোর বৈধব্যযোগ এসে গেছে।
শ্যামা ফুঁপিয়ে উঠলেন, বাবা, বাঁচিয়ে দাও। বাবা, আমার যে আর কেউ নেই গো!
ভাগ্যের চাকা ঘুরছে মা, তাকে আমি থামাই কী করে? তোর প্রারব্ধ।
মেয়েটি এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বাবা এক দাবড়ানি দিলেন, চুপ। গত জন্মে যা করে এসেছিস এ জন্মে তার ফল ভুগতে হবে না! তখন মনে ছিল না! এই দেখ।
বাবা একটা জ্বলন্ত কাঠ হাতে তুলে নিলেন। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! এমনভাবে ধরে আছেন যেন আগুন নয়, আইসক্রিমের কাঠি। বাবা আগুন নাচাতে নাচাতে বললেন, এর নাম জীবন। সহ্য করতে শেখ। আগুন নিয়ে খেলতে শেখ। পুড়ে পুড়ে পোড়াকাঠ হয়ে যা। এই দেখ।
বাবা সেই আগুন মুখে পুরে দিলেন। একেবারে রোমহর্ষক ব্যাপার। একবার করে হাঁ করছেন, মুখ দিয়ে ভক ভক করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। অবাক কাণ্ড! কাঠের টুকরো হোমের আগুনে ফেলে দিয়ে বাবা বললেন, পৃথিবীতে বাঁচতে এসেছিস ফুলের ওপর দিয়ে হেঁটে যাবার জন্যে? মামার বাড়ি! সহ্য কর, সহ্য কর, সহ্য কর। আগুন যা জলও তাই, দুঃখও যা সুখও তাই। সবই সেই অনন্ত শক্তির লীলা। ভগবানকে জব্দ কর।
সব শেষে বাবা মাতামহের দিকে তাকিয়ে বললেন, কাছে সরে আয়। তোর মনের দরজা খুলে গেছে। সামনের বার তোর কিছু হবে। এবারটা চোখকান বুজিয়ে কাটিয়ে যা।
মাতামহ এক হাতে আমার হাত চেপে ধরে আছেন। তার সারাশরীর কাঁপছে। বাবা এইবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখতে চাস?
থতমত খেয়ে বললুম, কী মহারাজ?
তোর সেই মেয়েটিকে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, পেতে চাই।
পেতে চাস? না পেলে? শালা মানুষ, কী পেতে চায়, ঠিক কী পেতে যে তার মন চায় মানুষ জানে? আমার দিকে তাকা। বড় বড় চোখে তাকা।
বাবা ফটাস করে একটা তালি বাজালেন।
আমার সারাশরীর কেমন যেন এলিয়ে পড়ল। দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এল। আমি মারা যাচ্ছি। আমার শরীর স্থির। চিন্তাশূন্য অবস্থা। বিস্মৃতি নেমে আসছে, আঁধার নেমে আসছে। অস্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, বাবা বলছেন, বেরিয়ে আয়, বেরিয়ে আয়, পাখির মতো উড়ে যা, খুঁজে দেখ, খুঁজে দেখ।
সারাশরীরে কেমন যেন একটা হ্যাঁচকা টান লাগল। আমার আর কিছু মনে রইল না। শুধু মনে। হল আমার অন্দরমহল থেকে কে যেন বেরিয়ে চলে গেল।
একসময় আমার চেতনা ফিরে এল। আমি মরিনি। তবে আমার আমি আমাতে ছিল না। সবে ভোর হচ্ছে। পুব আকাশ জবাফুলের মতো লাল। আমি হাতপা ছড়িয়ে চিত হয়ে শুয়ে আছি। শরীর যেন পাথরের মতো ভারী। হাত নড়ছে না, পা নড়ছে না। দাতে দাঁত লেগে আছে। মাথাটা মনে হচ্ছে আমার নয়, অন্য কারুর।
অনন্ত আকাশের পটভূমিতে ভাসছে আমার স্নেহময় মাতামহের মুখ।
বাবার গম্ভীর গলা কানে এল, ফিরে এসেছে!
মাতামহ বললেন, হ্যাঁ বাবা। কিন্তু দাতে দাঁত লেগে আছে।
বাবা ফট করে একটা তালি বাজাতেই খট করে আমার দাঁত খুলে গেল।
১.৩২ ওই দেখা যায় বাড়ি আমার
অবিশ্বাসী পিতা আমার সহজে কিছু বিশ্বাস করতে চান না। আমাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনে হাসতে হাসতে বললেন, যাক, বিনা পয়সায় ম্যাজিক দেখে এলেন। আধ্যাত্মিক ম্যাজিক।
বিশ্বাসী মাতামহের মনে বড় লাগল। তিনি বললেন, আচ্ছা, আমি না হয় বোকা বুড়ো। গাধাতে আর আমাতে কোনও তফাত নেই; কিন্তু আমার এই বুদ্ধিমান নাতিটিকে তুমি জিজ্ঞেস করো। এক তুড়িতে সে প্রায় ঘণ্টা আড়াই মৃতের মতো পড়ে রইল। দেহ রইল আশ্রমে, মন ছুটল ভুবন ভ্রমণে।
আরে মশাই, ওকে বলে সম্মোহন। ও বিদ্যে আমাদের পি সি সরকারও জানেন। তা হলে তো হুডিনিকে এনে গেরুয়া পরিয়ে আশ্রমে বসাতে হয়।
মাতামহ তর্কের হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, তুমি যখন বিশ্বাস করবে না তখন কার ক্ষমতা তোমাকে বিশ্বাস করায়! তুমি ভূত মানলেও ভগবানকে একেবারেই মানতে চাও না। ভগবানের কী যে খেলা!
বিশ্বাস অবিশ্বাস জানি না, আসলে আমার অত অবসর নেই। জীবন ক্রমশই ছোট হয়ে আসছে, এখনও অনেক কাজ বাকি। যতটা পারা যায় ততটা সেরে যেতে হবে তো। কে জানে আর আসা। হবে কি না! আমি দুটো ঘটনা বিশ্বাস করি, জন্ম আর মৃত্যু, আর বিশ্বাস করি সময়ের গতি। সময়ের নদীতে, বিভিন্ন দূরত্বে বাঁশের খোটার মতো আমরা পোঁতা রয়েছি। হুহু করে জল ছুটছে উলটো দিকে। স্রোত কখনও প্রবল, কখনও মৃদু। টাইম টেকস অল।
তুমি প্রারব্ধ বিশ্বাস করো না? তুমি পুনর্জন্ম বিশ্বাস করো না?
আমি যা দেখি তাই বিশ্বাস করি। অভিজ্ঞতার বাইরে যেতে চাই না। জন্ম দেখি, বিশ্বাস করি। সেটা পুনর্জন্ম কি না, অনর্থক সেই বিচারে সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। মৃত্যু দেখি, বিশ্বাস করি। প্রকৃতিতে শক্তির খেলা দেখি, বিশ্বাস করি। ন্যাচারাল ফোর্সেস। বিশ্বাস করি নিজের শক্তিকে, মেধাকে। হু ইজ গড? ভগবান আবার কে?
মাতামহ ভীষণ আহত হয়ে বললেন, আমার আর কিছু বলার নেই।
কী করে বলবেন? ভগবানকে তো আপনি আর হাত ধরে আমার সামনে হাজির করতে পারবেন না। আমার মতোই একজন মানুষকে ভগবান বলে চালাতে চাইবেন।
তুমি আগুন খেতে পারবে?
চেষ্টা করলেই পারব। এত কিছু খেতে পারছি, অভ্যাস করলে আগুনও খেতে পারব।
অত সহজ নয়, হরিশঙ্কর।
বেশ, আপনি নাপ্পি খেতে পারবেন?
সে আবার কী?
বার্মিজদের প্রিয় খাদ্য। মাটির তলায় পুঁতে রাখা পোকা-ধরা পচা মাংস।
