বাবাকে এইবার মহিলারা ঘিরে ধরেছেন। কারুর মেয়ে স্বামী পরিত্যক্তা, কেউ অত্যাচারিতা, কারুর মেয়ের মাথায় গোলমাল। সারাপৃথিবী যেন শিকড় সমেত উঠে এসেছে। বাবা বললেন, অপেক্ষা কর, এবার আমি আসনে বসব।
মাতামহকে জিজ্ঞেস করলুম, আমাদেরটা কখন হবে? রাত তো অনেক হল।
আজ আর রাতের হিসেব করিসনি। বাবা আমাদের অন্তর্যামী, সময় হলেই ডেকে পাঠাবেন। আয়, আবার আমরা একপাশে চুপ করে বসি।
একটা জারুল গাছের তলায় দু’জনে চুপ করে বসলুম। কালো আকাশে আর গাছের পাতায় মাখামাখি। তারাদের ড্যাব ড্যাবা চোখ জ্বলছে। জ্বোরো রুগির উত্তপ্ত নিশ্বাসের মতো বাতাস বইছে। হঠাৎ চাঁ চা করে একসঙ্গে অনেক প্যাঁচা দিগ্বিদিকে ডেকে উঠল। সত্যিই কী অদ্ভুত, গা ছমছম করানো পরিবেশ। পৃথিবীর চেনা মুখ দিয়ে অচেনা সব বস্তু আর ঘটনা বেরিয়ে আসছে।
আশ্রম প্রায় খালি। কিছু মহিলা কেবল বসে আছেন। বাবা কখন ডাকবেন কে জানে! দূরে বেলতলায় পঞ্চমুণ্ডীর আসনে বাবা খাড়া বসে আছেন। গাছের কোটরে নিবুনিবু প্রদীপ জ্বলছে। পিঙ্গল জটার মতো ধোঁয়া উঠছে আকাশের দিকে। চারপাশ নিস্তব্ধ। পাচারা একবার না দু’বার
ডেকেই চুপ মেরে গেছে।
কোনও কথা না বলে, কতক্ষণ বসে থাকা যায়। বাবার মতোই সিদ্ধাসনে মাতামহ ক্রমশ ধ্যানস্থ হয়ে পড়েছেন। দু’জনেই একপথের পথিক। আমি এক দল ছাড়া আসামি।
মৃদু স্বরে ডাকলুম, দাদু।
বেশ ভাবগম্ভীর উত্তর এল, বলে ফেল।
আপনার কি মনে হয় কনক খারাপ পথে চলে গেছে!
দুর পাগল, তুই মেয়ে চিনিস না। যেসব মেয়ে খারাপ হয়, তাদের চেহারাই আলাদা। শাস্ত্রে তাদের পরিষ্কার বর্ণনা আছে। খনার বচনে আছে। তোকে দোব পড়ে দেখিস। জানবি মেয়েদের মধ্যেই স্বর্গ আছে নরক আছে। কনক আলাদা জাতের মেয়ে। কিছু পাখি আছে যারা ডাকতে ডাকতে ক্রমশই আকাশের ওপর দিকে উঠে যায়। কনক হল সেই জাতের পাখি, যার আরোহণ আছে অবরোহণ নেই। সে গেছে, সে ভাল দিকেই গেছে।
মেয়েছেলের এত সাহস হয় কী করে! একা একা বেরিয়ে চলে গেল।
সাহস! বলিস কী রে ব্যাটা! সাহস তো মেয়েদেরই হবে। তারা যে শক্তি। জানিস সন্তানধারণ কত বড় সাহসের কাজ! সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে কত মায়ের মৃত্যু হয় জানিস! ব্যাপারটা যদি উলটে যায়, তা হলে কী হবে? কোনও পুরুষের অত সাহস হবে, পারবে অত কষ্ট সহ্য করতে! আমার মেয়ে যদি তোকে ধারণ না করত, তা হলে তুই আসতে পারতিস এই পৃথিবীতে!
তাতে আমার কী লাভ হল? মা তো আমাকে ফেলে পালালেন।
হ্যাঁ, তা ঠিক, ও কাজটা সে খুব ভাল করেনি। থাকলে আমাকেও একটু দেখতে পারত। কিন্তু শালা, তার জন্যে তো তুমিই দায়ী। তুমি এলে, আর অমনি আমার মেয়েটিকেও নিয়ে গেল! না রে, এ আমি এমনি বললুম! পৃথিবীতে কে কীসের জন্যে দায়ী হতে পারে। কোনও কিছুর ওপর মানুষের হাত নেই। মানুষ আসে, মানুষ যায়, মানুষের সুদিন আসে দুর্দিন আসে। জুড়াইতে চাই, কোথায় জুড়াই, কোথা হতে আসি, কোথা ভেসে যাই।
খুব চাপা গলায় মাতামহ গাইতে লাগলেন, ফিরে ফিরে আসি কত কাঁদি হাসি, কোথা যাই সদা ভাবি গো তাই।
আজ কিন্তু বেশ ভালই গাইছেন। বেশ মিঠে লাগছে। হয়তো পরিবেশের গুণে। মাতামহ অন্তরায় উঠলেন, কে খেলায়, আমি খেলি বা কেন, জাগিয়ে ঘুমাই কুহকে যেন! এ কেমন ঘোর হবে নাকি ভোর, অধীরে অধীরে যেমতি সমীর, অবিরাম গতি নিয়ত ধাই!
বৃদ্ধ মানুষ, কত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এতটা পথ এসেছেন, হঠাৎ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। চাপা আবেগে বিশাল বুক ফুলেফুলে উঠছে। মাতামহের কান্না দেখে, মন বড় বিমর্ষ হয়ে গেল। মানুষকে কীভাবে যে একটু আনন্দে রাখা যায়।
পঞ্চমুণ্ডীর আসনে বসে বাবা হঠাৎ সাংঘাতিক এক শব্দ ছাড়লেন। বুম বুম করে সেই ডাক যেন অনন্তের টাগরায় গিয়ে ঠেকল। আমার তলপেট গুড়গুড় করে উঠল। মাতামহের চাপা কান্না বন্ধ হয়ে গেল। বাবা ওঁ স্বাহা ওঁ স্বাহা বলে আগুনে কী যেন আহুতি দিচ্ছেন, লেলিহান শিখা নটরাজের মতো নেচে নেচে উঠছে। রাত্রি এখন নিদ্রামগ্ন, জেগে আছেন শুধু সাধক, জেগে আছেন রোগী, আর পুড়ে যাওয়া কিছু সংসারী মানুষ।
বাবা হাঁকলেন, আয় তোরা আয়।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমরা এগিয়ে গেলুম। বাবা বসেছেন ঠিক যেন মহাদেবের মতো। ডান হাতে ধরে আছেন একটি চিমটে। কে একজন তার সমস্যার কথা বলতে গেলেন, বাবা সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিলেন, চুপ, চুপ করে বোস। তোরা বলবি কেন? আমি তো সব দেখতে পাচ্ছি রে শালা।
চিমটেটা মাটিতে ঠুকে বললেন, এই রুখে দিলুম। যেখানে আছিস সেইখানেই থাক।
হোমের শিখায় এক সার লাল লাল, উদ্বিগ্ন মুখ। কেউই কিছু বুঝলেন না, বাবা কী রুখে দিলেন, কাকে রুখে দিলেন!
মাতামহ সাহস করে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে রুখলেন বাবা!
সর্বাণীর স্বামীকে। তোর স্বামীকে মা বেঁধে দিলুম। দিনকতক হাজতবাস করুক। নির্জনে থাকতে থাকতে তোর কথা মনে পড়বে। সামনের বছর পুজোর আগেই সে ফিরে আসবে। রোজ মাঝরাতে হাড়ের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াবি।
মহিলা বাবা বলে পা ছুঁতে গেলেন, মহাপুরুষ চিমটে ঠুকে বললেন, খবরদার, আমাকে ছুঁবি না। ওপাশে গিয়ে বোস। ভোর হলে চলে যাবি। শ্যামা! শ্যামা কোথায়?
শ্যামা মৃদু গলায় বললেন, এই যে বাবা।
