বাবা দু’হাতে মহাশূন্য থেকে কী সব ধরে ধরে আমাদের দিকে ছুঁড়তে লাগলেন। মাতামহ মহা ব্যস্ত হয়ে বললেন, তুলে নে, তুলে নে।
আমাদের এপাশে ওপাশে কী সব পড়তে লাগল। হুটোপাটি শুরু হয়ে গেল। কে জানে কী পরমপদার্থ জিনিস! নিচু হয়ে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে একটা সংগ্রহ করলুম। নরম তুলতুলে, অনেকটা লিচুর মতো। মাতামহও একটা পেয়েছেন। আমাকে বললেন, শিগগির মুখে পুরে দে।
কী এটা? মুখে পুরে মরব নাকি? ধুলোবালি লেগে আছে।
খবরদার, মনে কোনও অবিশ্বাস আনবি না। বিপদ হবে। ভক্তিভরে খেয়ে নে। অমর হয়ে যাবি। আমার ভেতর থেকেও কে যেন বলে উঠল, মূর্খ, যা পেয়েছিস খেয়ে নে। ভয়ে ভয়ে মুখে পুরে দিলুম। অদ্ভুত স্বাদ। পৃথিবীর কোনও বস্তুর স্বাদের সঙ্গে মেলে না। ফল, তবে কোনও বিচি নেই। জিভে পড়ামাত্রই বরফের টুকরোর মতো গলতে শুরু করল। সুন্দর গন্ধ। সারাশরীর স্নিগ্ধ হয়ে গেল। ফিনফিনে বৃষ্টিধারার মতো মনে চিনচিন করে উঠল সুখ। সব দরজা যেন একে একে খুলে যেতে লাগল। মনে হতে লাগল, আমার ভেতর দিয়ে একটা রাজপথ চলে গেছে, আর সেই পথে চলেছে। অসংখ্য তীর্থযাত্রী। কেউ বলছেন, হরি ওম তৎসৎ, কেউ বলছেন, জয় শিবশম্ভ, কেউ বলছেন রাম নাম সত্য, কেউ বলছেন, আল্লাহ আকবর। মনে হতে লাগল, ধীরে ধীরে আমি মহাশূন্যের দিকে ভেসে উঠছি৷ কানে আসছে বাবার হাসির শব্দ। খলখল করে হাসছেন, আর বলছেন, জাগ শালারা, জাগ গুয়ের পোকা, কামিনীকাঞ্চনের দাস। জাগ শালারা শয়তানের ক্রীতদাস।
বাবার চ্যালা আবার শিঙা ধরেছে। শব্দে আকাশের চাঁদোয়া কঁপছে। তারারা মিটিমিটি করছে। দূরে মড়মড় করে একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। বাবা চিৎকার করে বললেন, পালালি কেন শালা! পালালি কেন? এরা আমার কাছে এসেছে। এরা আমার আশ্রিত। ব্রহ্মশভুজলৌযে চ শবমধ্য-প্রসংস্থিতে। প্রেতকোটি-সমোযুক্তে কালিকায়ৈ নমোহস্তুতে ॥ কৃপাময়ি হরে মাতঃ সর্বাশাপরিপূরিতে। বরদে ভোগদে মোক্ষে কালিকায়ৈ নমোহস্তুতে ॥
বাবা ত্রিশূল হাতে ধেই ধেই করে নাচতে লাগলেন। আর হুংকার ছাড়তে লাগলেন, হুংহুংকারে শবারূঢ়ে নীলনীরজলোচনে। বাবার নৃত্য দেখে ভক্তরাও নাচতে লাগলেন, আর চিৎকার করতে লাগলেন, বাবা, বাবা। মাতামহ বললেন, আহা, যেন সাক্ষাৎ শিব। উঃ, কত ভাগ্যে মানুষের এইসব দর্শন হয়? শালা, সংসারের নিকুচি করেছে। ডেকে নিয়ে আয় তোর প্রাইম মিনিস্টার, তোর চিফ মিনিস্টারকে। সব তুচ্ছ, সব তুচ্ছ। ডাক তোর টাটা বিড়লা ডালমিয়াকে। সব তুচ্ছ, সব তুচ্ছ।
বেশ বুঝতে পারছি, মাতামহের পা দুটো নেচে ওঠার জন্যে ছটফট করছে। চেপে ধরে না থাকলে ধেই ধেই করে নৃত্য শুরু করে দেবেন।
বাবা নাচতে নাচতে হাতের ত্রিশূলটি মাটিতে পুঁতে দিলেন। বুকে দু’হাত রেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে হাঁকলেন, তোদের যার যা অসুখ আছে, এই ত্রিশূল ছুঁলেই সেরে যাবে। একে একে এগিয়ে আয় শালারা। সেই ক্যান্সারের রুগি কোঁত পাড়তে পাড়তে এগিয়ে গিয়ে ত্রিশূল স্পর্শ করলেন। কী হল, তা বলতে পারব না। ভদ্রলোক ছিটকে হাত দুয়েক দূরে উলটে পড়লেন। বাবা অট্টহাসি হেসে বললেন, যাঃ শালা, মরেই গেল বুঝি।
সঙ্গে যে-ভদ্রলোক ছিলেন, তিনি আর্ত চিৎকারে ডাকতে লাগলেন, বাবা প্রবোধ, ওরে আমার প্রবোধ।
প্রবোধবাবু হাতপা চিতিয়ে পড়ে আছেন ঘাড় কাত করে। বাবা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ডান পায়ের আঙুলটা গায়ে ঠেকাতেই প্রবোধবাবু ধড়মড় করে উঠে বসলেন। সঙ্গী ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, কেমন বুঝছ বাবা প্রবোধ?
তড়াক করে খাড়া লাফিয়ে উঠে প্রবোধ বললেন, পারফেক্টলি কিওরড মেসোমশাই।
মাতামহ ঝুঁকে পড়ে বললেন, একেবারে সেরে গেলেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবার দয়া।
ভদ্রলোক বাবা বলে চিৎকার করে মহাপুরুষের পায়ে পড়লেন।
বাবা স্নেহের সুরে বললেন, ওঠ, ওঠ, যোলো আনা কি একদিনেই সারে! কর্কট ব্যাধি। অনেক নিয়ম মেনে চলতে হবে বাবা। স্ত্রীসঙ্গ চলবে না, পান বিড়ি সিগারেট খাবে না। ভোরে উঠে আসনে বসবে। জোরে জোরে শ্বাস নেবে। অনুভব করবে, শীতল বাতাস মেরুদণ্ডের দুপাশ বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে তোমার মাথায় ছড়িয়ে পড়ছে। শ্বাস যখন ছাড়বে, তখন মনে করবে গরম কালো বাতাস মেরুদণ্ড বেয়ে নীচের দিকে নেমে চলেছে। যা, পালা শালা।
মাতামহ একপাশে সরে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ওভাবে ছিটকে পড়লেন কেন?
প্রবোধবাবু বললেন, উঃ, কী বলব মশাই, যেই না ত্রিশূলে হাত দিয়েছি, মনে হল হাজার ভোলটের ইলেকট্রিসিটি খেলে গেল সারাশরীরে। অলৌকিক ব্যাপার মশাই। বাবা সাক্ষাৎ দেবতা। এসব জিনিস বিশ্বাস না করলে সন্দেহই থেকে যায়।
প্রবোধের মেসোমশাই বললেন, আমিও তা হলে ছুঁয়ে আসি একবার। গত তিন বছর লামবেগোয় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি।
কিন্তু ত্রিশূলের চারপাশে এখন তাণ্ডব চলছে। রোগের শেষ নেই, রুগিরও শেষ নেই। হাঁপানি, যক্ষ্মা, বাত, মৃগী, আলসার, প্যারালিসিস সব লাইন দিয়ে চলেছে, আর ছিটকে ছিটকে পড়ছে। রোগ যেন ফুটবল। বাবার ত্রিশূলের লাথি খেয়ে ঠিকরে যাচ্ছে।
মাতামহ বললেন, যা না তুই একবার স্পর্শ করে আয়। তোর তো পেটের ব্যামো, দেখবি সেরে যাবে।
না দাদু, আমার সাহস নেই।
তোর মতো ভিতু আমি জীবনে দুটো দেখিনি।
