মাতামহ বললেন, কেন, খিদে পেয়েছে?
আমার মাতামহের এই এক দোষ। কখন কী যে বলে বসেন! আঃ, দাদু, খিদে পাবে কেন? যিনি কাঁদছেন তিনি বয়েসে বড়, শিশু নয়।
ও, তাই নাকি! তা হলে, মনে খুব দুঃখ হয়েছে। দেখো, কী আবার হল!
প্রবীণা মহিলা বললেন, এক শয়তান ছেলে মেয়েটার জীবন নষ্ট করে দিয়ে পালিয়েছে। বাবা কথা দিয়েছেন, এর জীবনের একটা বিলিব্যবস্থা করে দেবেন।
মাতামহ গর্জন করে উঠলেন, ওর আর বিলিব্যবস্থা কী? কোথায় সেই ছেলেটা আছে বলো, জুতিয়ে লাশ করে দিই।
সে আর এ দেশে নেই বাবা, জার্মানিতে গিয়ে বসে আছে। সেখানে এক মেমসায়েব জুটিয়েছে।
বসে আছে বসে থাক। মেয়ের আবার বিয়ে দাও।
এ পোড়া দেশে বাবা মেয়েদের একবারই বিয়ে হয় না, দ্বিতীয়বার কে বিয়ে করবে? তেমন ছেলে কি আছে? ঠোকরানো ফল কি দেবতার পুজোয় লাগে!
তা হলে মেয়েকে বিন্ধ্যাচলের কোনও আশ্রমে পাঠিয়ে দাও। আসল দেবতার সেবা করুক।
সকলে কি তা পারে বাবা! সংসারের মায়ায় সব লাটুর মতো ঘুরছে।
মাতামহ উঠে পড়লেন, চল, একটু ঘুরেফিরে দেখি। দুঃখ, দুঃখ আর দুঃখ। কেন যে মানুষ জন্মায়!
অন্ধকারে অন্ধকারে অনেকেই এসেছেন। এক ভদ্রলোক মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। অন্ধকারে। কে যেন জিজ্ঞেস করলেন, প্রবোধ, খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা!
মাতামহ থমকে দাঁড়ালেন। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?
উত্তর এল, আর কী হবে দাদা! রাজরোগ। পেটে ক্যান্সার।
আরও দু’ধাপ এগোতেই দেখা গেল সামান্য একটু শ্বাস নেবার জন্যে এক মহিলা ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খাচ্ছেন। এই বয়েসেই হাঁপানি! এই অমাবস্যার রাতে, ঘুরঘুরে বাবার আশ্রমে নামহীন মানুষের দল এমন কিছুর আশায় এসেছেন, যা অলৌকিক। বিজ্ঞান যা দিতে পারে না, বাবা তাই দেবেন।
বাবার গলা পেয়ে আমরা ফিরে তাকালুম।
বাবার বিশাল শরীর দাওয়ায় পিলারের মতো খাড়া। ঘরের দরজা খোলা। ঘরে মিটমিট আলো জ্বলছে। সেই আলোর সামনে বাবাকে মনে হচ্ছে অন্ধকারের দেবতা। বাবা অদ্ভুত গলায় ডাকছেন, আয়, আয়, আয়। অতি সাধারণ একটি শব্দ, কিন্তু ডাকার ধরনে এই ছায়াময় পরিবেশ কেমন যেন ভৌতিক হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে সমস্ত অশুভ শক্তি চারপাশ থেকে হিলহিল করে ছুটে আসছে। চতুর্দিকে যেন বিচিত্র সব আকার আকৃতি প্রাণময় হয়ে উঠছে। বাবা ভৌতিক গলায় প্রেতাত্মাদের ডাকছেন, আয়, আয়। প্রদীপের মিটিমিটি আলোয় ছায়া কাঁপছে। চোখের ভুল কি না জানি না, বাবা ক্রমশই একটি লাল আগুনের মতো উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছেন। সারাশরীর যেন জ্বলজ্বলে আগুনের রেখা। প্রতিবার আয় বলছেন, আর মুখ দিয়ে যেন ভলকে ভলকে নীল আগুন ছুটছে, বেশ। মোটা বিদ্যুতের রেখার মতো। ভয়ে মাতামহের গা ঘেঁষে দাঁড়ালুম। তিনি ফিসফিস করে বললেন, তোরা বিশ্বাস করিস না, শক্তিটা একবার দেখ। আরে বোকা! ভয়ে কাঁপছিস কেন?
যা দেখছি, তা কি সত্যিই দেখছি?
অন্ধকারে কারা যেন ছুটে আসছে। আকৃতি বিশিষ্ট তাল তাল অন্ধকার এপাশ থেকে ওপাশ থেকে তেড়ে আসছে। মাতামহ ফিসফিস করে বললেন, কী আসছে বুঝতে পারছিস?
না দাদু, মনে হচ্ছে কুকুর।
কুকুর নয় রে বোকা। শেয়াল। কত শেয়াল দেখছিস!
বাবা বললেন, নে সেবা কর।
কী যেন সব ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগলেন। একটা-দুটো নয়, অনেক শেয়াল, গোটা বারো তো হবেই, নিজেদের মধ্যে মারামারি না করে, শান্ত হয়ে খেতে লাগল। কড়মড় শব্দ শুনে মনে হচ্ছে, হাড় চিবোচ্ছে। এতক্ষণ যেখানে যত আর্তনাদ আর চাপা কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, সব থেমে গেছে। শুধু কানে আসছে শেয়ালদের নড়াচড়া, নিশ্বাস, আর হাড় ভাঙার শব্দ। মিটিমিটি প্রদীপের আলোয় বাবার বিশাল ছায়া কাঁপছে। নারকেল গাছের পাতায় পাতায় বাতাসের শ্বাস ভাঙার শব্দ উঠছে।
বাবা হুংকার ছাড়লেন, নে, এবার তোরা পাগলির জয়ধ্বনি কর। ডাক ডাক, গলা ছেড়ে ডাক। একবার তেড়েফুঁড়ে ওঠ মা। একবার তেড়েফুঁড়ে ওঠ।
শেয়ালগুলো অমনি আকাশের দিকে মুখ তুলে সমস্বরে ডেকে উঠল, হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া। আর বাবার সেই চ্যালা, বামন পঞ্চানন, কোণে দাঁড়িয়ে রামশিঙায় ফুঁ দিল। শেয়ালের ডাক আর ভো ভো। শব্দে তলতলে অন্ধকার থলথল করে কাঁপতে লাগল। সারাগায়ে আমার কাঁটা দিয়ে উঠল। কী। অদ্ভুত সাধনপদ্ধতি। এমনটি আমি কোথাও দেখিনি। আমি ধ্যান দেখেছি, জপ দেখেছি, ভাবে বিভোর হয়ে মানুষকে নাচতে দেখেছি, সাধনসংগীতে অশ্রু বিসর্জন দেখেছি, হোম দেখেছি। এ জিনিস দেখিনি।
বাবা পা ফাঁক করে স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ খলখল করে হেসে উঠলেন। মনে হল বিশাল এক জলপ্রপাত উঁচু পাহাড় থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে নীচে নেমে আসছে। মনে হচ্ছে কোনও গুহার মধ্যে দিয়ে নদী ছুটে চলেছে। হাসি থামিয়ে, দু’হাত ওপর দিকে ধুলো ছোঁড়ার মতো করে ছুঁড়তে ছুঁড়তে বাবা বলতে লাগলেন, যাঃ ব্যাটারা, যাঃ চলে যা, যাঃ যাঃ।
নিমেষে সমস্ত শেয়াল অদৃশ্য হয়ে গেল।
বাবা হঠাৎ ভীষণ রেগে গেলেন। অদৃশ্য সেই মহাশক্তিকে উদ্দেশ করে বলতে লাগলেন, আর কত খাবি, আর কত খাবি! এখনও তোর খিদে মিটল না! দন্ডুরাং দক্ষিণব্যাপি-লম্বমানকচোচ্চয়াং। এই নে, তোরা সব নে। লুটে নে, লুটেপুটে নে।
