ঘণ্টা তিনেক হয়ে গেল, ঠায় একভাবে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে বসার উপায় নেই। পা দুটো ইতিমধ্যেই বেশ ভারী হয়ে উঠেছে। ফুলোফুলো লাগছে। আলাদা একটা ঘরে, কাঁচের আধারে সারি সারি ওজন যন্ত্র। এর মধ্যে একটা-দুটো এত সূক্ষ্ম যে হাওয়া ওজন করা যায়। এই একটি মাত্র জায়গা যেখানে একটু বসা চলে।
সাড়ে চারটের সময় রাস্তায় নেমে মনে হল, আর এক পা-ও হাঁটতে পারব না। পা দুটো থামের মতো ভারী হয়ে উঠেছে। জুতো দু’পাটি কাপ হয়ে বসে গেছে। মাথা টলছে। একটা জিনিসই মুখে লেগে আছে, জিমূতবাবুর রান্না করা বাষ্পপক্ক মাংস। বেশ বড় মাপের মাটির ভাড়ে সেই মাংস যখন। ঘরে এসে ঢুকল, গন্ধেই আমি কুপোকাত। যেমন তার বর্ণ, তেমনি তার স্বাদ। পাঁঠার মতো একটা জিনিস যে এইভাবে রূপান্তরিত হতে পারে আমার জানা ছিল না। আজ এই খেয়ে বুঝলুম। না, প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই সর্বাঙ্গসুন্দর। জয় বাঙালি। ভাগ্য এতদিনে মুচকি হেসেছে। শেষরক্ষে হলে হয়।
সামনেই সেদিনের সেই পার্কটা। একটু বসে যাই। অনেকটা গেলে, তবে বাস কি ট্রাম মিলবে। আয়ারা প্যারাম্বুলেটরে চাপিয়ে ফুটফুটে সব বাচ্চা নিয়ে এসেছে। আগামী পৃথিবী মনে হয় খুব সুন্দর হবে। আজকের মতো সূর্য বিদায় নিচ্ছে। বাতাসে রাতের শীতল ওড়না উড়ছে। সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে কনকের কথা মনে পড়ে গেল। কনক এখন কোথায়?
১.৩১ জানি না কে বা, এসেছি কোথায়
একে অমাবস্যা। তায় শনিবার। তার ওপর রটন্টি কালীপূজা। রাত একেবারে গমগম করছে। পিচকালো আকাশে তারার খই ফুটছে। শুকনো বাতাস বইছে। ঘুরঘুরে বাবার আশ্রম কেমন যেন থমথম করছে। দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে। রাত যে এত রহস্যময়ী এখানে না এলে বোঝা যেত না।
মেসোমশাই রেগে মেয়েকে নিয়ে প্রতাপ রায়ের বাড়ি থেকে চলে এসেছেন। ভদ্রলোকের সে দাপট আর নেই। বেশ ভেঙে পড়েছেন। এত ভেঙেছেন যে আজ আর আমাদের সঙ্গে আসেননি। মাতামহ যা ধরেন, তার শেষ দেখে ছাড়েন। আমরা দুজন বারকতক বাস পালটে, সন্ধের মুখে এখানে এসে হাজির হয়েছি। একে একে আমাদের মতো আরও সব বিশ্বাসী মানুষ এসে পড়েছেন। মহিলারাও আছেন। এক এক জনের এক এক সমস্যা। কারুর ছেলের অসুখ। কারুর স্বামী মরণাপন্ন। কারুর চাকরি নেই। সমস্যার ভারে সবাই নেতিয়ে পড়ে, এখানে ওখানে বসে আছেন চুপচাপ। অন্ধকারে বসে বসে কবিতার সেই লাইন ক’টা মনে পড়ছে: মুখ দিল যে, ভুখ দিল সে, মৃত্যু দিল লেলিয়ে পাছে পাছে।
মাতামহ মাঝে মাঝে চটাস করে মশা মারছেন। সামান্য শব্দ, তাই কত জোর মনে হচ্ছে! নির্জনতা এমন জিনিস! মাতামহ গুনগুন করে গান ধরলেন, শ্মশান ভালবাসিস বলে শ্মশান করেছি হৃদি/শ্মশানবাসিনী শ্যামা নাচবে বলে নিরবধি! ক্রমশই ভাব আসছে। হঠাৎ গাঁক গাঁক করে চিৎকার করে না ওঠেন! গান থেকে মনটাকে ঘুরিয়ে আনা দরকার।
দাদু!
বল।
ঘুরঘুরে বাবা কখন আসনে বসবেন?
আর একবার শেয়াল ডাকুক।
কখন আবার ডাকবে?
সে ওদের ঘড়ি আছে। সেই ঘড়ির নিয়মে ওরা ডাকে। তুই কি ভাবিস মানুষই একমাত্র জীব। পৃথিবীতে কত আধ্যাত্মিক প্রাণী আছে জানিস? এই যে কচ্ছপ, কচ্ছপ কত বড় যোগী! শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর কী কন্ট্রোল! কুম্ভক করে বসে রইল সারাদিন। এক-একটা কচ্ছপ তিনশো চারশো বছর বাঁচতে পারে। ঐরাবতের স্বভাব হল ঋষিদের মতো। নিরামিষাশি। শরীরটা দেখেছিস! একেবারে পর্বতের মতো। ধীর, স্থির। রেগে গেলে দুর্বাসা।
কিন্তু দাদু, শেয়াল তো শুনেছি ভীষণ ধূর্ত। চোর। শেয়ালের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার কী আছে?
শেয়াল হল তান্ত্রিক। শৃগাল ছাড়া তন্ত্রসাধনা হয় না। শেয়ালের ডাক শুনেছিস? এমন উদাত্ত গলায় আর কোনও প্রাণীকে ডাকতে শুনেছিস? শেয়ালের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ভীষণ জোরদার। শুভ, অশুভ দুটোই আগেভাগে জানতে পারে। যেসব প্রাণী রাতে জাগে তারা সবাই হল সাধক।
পাখি তা হলে সাধক নয়?
হ্যাঁ, পাখিও সাধক। শেষরাত্রে সে ঈশ্বরকে ডাকে। একটি ডালে দুটি পাখির অর্থ বুঝিস?
না।
জীবাত্মা আর পরমাত্মা। পাশাপাশি, দুটোই এক। কথামৃতে ছবি দেখেছিস তো? পাখি ডিমে তা দিচ্ছে। চোখদুটো ফ্যালফেলে। ঠাকুর বলছেন, যোগীর চোখ ওইরকম ফ্যালফ্যাল করে। তখন থেকে তুই ছটফট করছিস কেন? শান্ত হয়ে বোস না।
ভীষণ মশা কামড়াচ্ছে যে!
সহ্য করতে শেখ। সাধনজগতে শরীরকে তৈরি করতে হবে লোহার মতো করে। টললে চলবে না, টসকালে চলবে না। আমি লৌহভীম বলে শুরু করতে হবে। চাকরিটা কেমন লাগছে?
বেশ ভালই। তবে চাকরি তো। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত, আট ঘণ্টা আটকে থাকা।
খাঁচার পাখি, তাই না! বড় দুঃখু রে! ভেবেছিলাম তোকে সংসারী করে দিয়ে কংখলে চলে যাব। যাঃ শালা, মেয়েটাই হারিয়ে গেল। তুই আমাকে একটা জিনিস কিনে দিবি?
কেন দোব না! বলুন কী চাই?
কলুটোলা থেকে আমাকে একটা আলবোলা কিনে এনে দিবি! বেশ লম্বা নলঅলা। আমার অনেক দিনের ইচ্ছে, বেশ ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে, জমিদারদের মতো ফরসিতে অম্বুরি তামাক খাই। শোন, সংসারে যদ্দিন বাঁচবি, রাজার মতো বাঁচবি।
অন্ধকারে ফোঁসফোঁস করে মেয়েলি গলার কান্না শোনা গেল। কাঁদে কে? মাতামহ চঞ্চল হয়ে উঠলেন। অন্ধকার কোণ থেকে প্রবীণা কোনও মহিলার উত্তর ভেসে এল, আমার মেয়ে বাবা।
