সুধীরের চেহারাটি বেশ হৃষ্টপুষ্ট। তিনি বার্নারের ওপর বিশাল একটি কেটলি বসিয়ে নল দিয়ে বাষ্প বেরোনো দেখছিলেন। তিনি বললেন, চা খাবেন না স্যার?
চা-ও খাব, অ্যাসিডও খাব। এবার থেকে আমি সব খাব।
এম ডি বললেন, এ ভেরি গুড ডিসিশন। না-খেয়ে মরার চেয়ে খেয়ে মরা ভাল। আচ্ছা, এই নাও, এই ছেলেটিকে তৈরি করো। পলাশ চট্টোপাধ্যায়। নাড়াচাড়া করলেই বুঝতে পারবে কী জিনিস! ভেতরে একটু আগুনটাগুন আছে! শোনো পলাশ।
বলুন।
প্রদ্যোত বেসিকেলি বড় ভাল ছেলে। তবে একটা দপ্তর চালায় তো, চিফ কেমিস্ট, তার ওপর পেটরোগা, তাই মেজাজটা তেমন সুবিধের নয়। মাঝে মাঝে আমাকেও দাঁতমুখ খিচোয়। তা নিয়মটা হল, ও খিচোলে তুমি খিচোবে না। চুপ করে থাকবে। মনে মনে প্রার্থনা করবে, ঈশ্বর, তুমি এঁর ক্রনিক ডিসপেপসিয়া ভাল করে দাও। আচ্ছা প্রদ্যোত?
আজ্ঞে বলুন!
আমি তোমাকে কী বলেছিলুম?
আজ্ঞে যোগাসন।
হচ্ছে?
মাঝে মাঝে।
কই দেখি, অর্ধমৎস্যেন্দ্রাসনটা করে দেখাও তো?
এখানে?
বেশ, আমার ঘরে চলো। কার্পেটের ওপর করবে।
ওটা বড় কঠিন। আমার পক্ষে শবাসনটাই বেস্ট।
সুধীরবাবু আধ গেলাস জল প্রদ্যোতবাবুর হাতে দিলেন। ঢকঢক করে খেয়ে গেলাসটা ফিরিয়ে দিলেন। এম ডি বললেন, বাঁচতে যদি চাও আসন করো প্রদ্যোত, আসন করো।
আসন করো, সাধন করো, বলতে বলতে এম ডি ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন, পলাশ, মন খারাপ লাগলে আমার কাছে চলে এসো। আর হ্যাঁ, রোজ সকালে আমার সঙ্গে দেখা করে, তবে এখানে আসবে। জানো তো, সব পুজোর আগে গণেশ পুজো?
চিফ কেমিস্ট ভদ্রলোক বললেন, সুধীর, এক গেলাস চা বেশি হবে?
হ্যাঁ স্যার, জল ঢেলে দিয়েছি।
নতুন একটা অ্যাপ্রন বের করে দিয়ে, একটা ভোয়ালে।
দিচ্ছি স্যার।
রবিবাবু?
বলুন।
দীর্ঘ চেহারার মিষ্টি একজন মানুষ এগিয়ে এলেন। পোশাক পরিচ্ছদে একেবারে টিপটপ। মুখে চোখে সুস্বাস্থ্যের ঝিলিক। হাসিহাসি মুখ।
পলাশকে আপনার হাতে তুলে দিলুম। তৈরি করে নিন।
রবিবাবু আমার কাঁধে একটি হাত রাখলেন। আমার দাদা নেই। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, দাদা যেন কাঁধে হাত রেখেছেন। সেই জয়ামাতা আমাকে একটি দৃষ্টি দান করেছিলেন, চোখের ভেতর দিয়ে মানুষের অন্দরমহল দেখার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা এখনও হারায়নি। রবিবাবুর ভেতরটা দেখতে পাচ্ছি। ঊষার আকাশের মতো বর্ণময়, শুদ্ধ, সাত্ত্বিক। আমার ভেতরে যেন আনন্দের হিল্লোল বইছে। এত ভাল লোক এক জায়গায় এসে মিললেন কী করে?
বাতাসের মতো মৃদু স্বরে রবিবাবু বললেন, এসো। এসো বললুম বলে রাগ করলে না তো!
আজ্ঞে না।
আজকে আমি সারাদিন কাজ করব, তুমি আমার পাশে দাঁড়িয়ে দেখবে। তুমি হবে তন্ত্রধারক। গোটাকতক জিনিস তোমাকে অবশ্য শিখতে হবে। তার মধ্যে প্রথম হল সেফটি। কোন জিনিস কার সঙ্গে কীভাবে মেশাবে! কীভাবে তাতাবে। কেউ স্বভাবে রাগী, কেউ ঠান্ডা। অ্যাসিড, অ্যালক্যালি আর নিউট্রাল, এই নিয়েই আমাদের কারবার। আচ্ছা, এসো, এখন আমাদের টি ব্রেক।
গেলাসে গেলাসে চা নিয়ে শুরু হল আমাদের চা-পর্ব। কেউ বসেছেন চেয়ারে, কেউ উঁচু টুলে। সকলের সঙ্গে আলাপ পরিচয় জমে গেল। রবিবাবু হলেন কেমিস্ট-ইনচার্জ। আর একজন ইনচার্জের নাম সমীরবাবু। গোলগাল, বেঁটেখাটো মানুষ। আপেলের মতো গায়ের রং। কুচকুচে কালো চুল। ইনিও খুব আস্তে কথা বলেন। জমিদার ফ্যামিলির ছেলে। এই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করছেন।
চারদিকে বুনসেন বার্নার জ্বলছে। বাইরে গরম, ভেতরে আরও গরম। তার ওপর গরম চা? রবিবাবু বললেন, প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হবে। পরে সবই সহ্য হয়ে যাবে। মানুষ কী না পারে! নাও, ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়া কোডেক্সটা খোলো। আমরা এখন টেস্ট করব, সোডিয়াম স্যালিসিলেট। তুমি পড়ে পড়ে বললো, আমি তোমার সামনে স্টেপ বাই স্টেপ এগোতে থাকি।
বেলা এগারোটার সময় ল্যাবরেটরি কাঁপয়ে এক ভদ্রলোক এলেন। দৈত্যের মতো বিশাল চেহারা। শালপ্রাংশু মহাভুজ। এই প্রথম একজনকে পেলুম, যিনি গলা ছেড়ে কথা বলেন, ঘর ফাটিয়ে হাসেন। এনার নাম জিমূতবাবু। ইনি মাল তৈরি করার কেমিস্ট। নীচের বিশাল কারখানায় এনার সাম্রাজ্য। সেখানে সারাদিন জলদস্যুর মতো হাঁকডাক করে ঘুরে বেড়ান।
জিমূতবাবু করমর্দনের জন্যে আমার সামনে হাত বাড়িয়ে দিলেন। বাঘের থাবায় আমার বেড়ালের থাবা তিনবার নেচে উঠতেই মনে হল কাঁধের কাছ থেকে আমার হাত খুলে বেরিয়ে যাবে। হাত ছেড়ে দিয়ে তিনি বলতে লাগলেন, আজ মাংস, আজ মাংস।
জিমূতবাবু আমাদের লাঞ্চ ইনচার্জ। যেদিন মাংস হয়, জিমূতবাবু সেদিন নিজে মাংস রাঁধেন। সে রান্না হয় নীচের কারখানায়, স্টিমে।
জিমূতবাবু বললেন, আজ তা হলে পরিমাণটা একটু বাড়িয়ে দিতে হবে। খেয়ে বলবেন, কেমন হয়েছে। সুবীর, তুমি তা হলে পৌনে একটার সময় নীচে যাবে।
জিমূতবাবু চলে গেলেন। ল্যাবরেটরি নিস্তব্ধ। বিকারে ফোঁটা ফোঁটা রি-এজেন্ট পড়ার শব্দ। ফ্লাস্কে জল ফোঁটার শব্দ। ফিল্টার পেপার লাগানো ফানেল থেকে টিপটিপ করে নেমে চলেছে তরল পদার্থ। সার সার বোতলে টলটল করছে নানা রঙের রি-এজেন্ট। বাতাসে উত্তাপ কঁপছে, ইথার আর ক্লোরোফর্মের গন্ধ ভাসছে।
রবিবাবু বললেন, চলো, সেনসিটিভ ব্যালান্সে কীভাবে ওজন করতে হয় তোমাকে শেখাই।
