আজ্ঞে না, তা নেই।
তা হলে কাল থেকে তাই খাবে। এখানে তোমাকে খুব খাটতে হবে। লাঞ্চ পাবে তো সেই একটার সময়। দাঁড়াও, দেখি, তোমাকে কী খাওয়ানো যায়।
আপনি ব্যস্ত হবেন না, আমার পেট বেশ জয়ঢাক হয়ে আছে।
ল্যাবরেটরিতে একবার গিয়ে ঢুকলে, তোমার ঢাক চুপসে যাবে। বুঝতে পেরেছি, তোমার লজ্জা হচ্ছে। সংকোচ হচ্ছে। হতেই পারে। যেহেতু আমি তোমার এমপ্লয়ার। ভুলে যাও, তফাতটা ভুলে যাও।
তিনি কথা বলতে বলতে ঘরের কোণের দিকে চলে গেলেন। সাদা রঙের একটি ফ্রিজ সেই কোণে গুনগুন করছে। দরজাটা টেনে খুলতেই হা করে একটা শব্দ বেরোল, যেন কোনও সাধক প্রাণায়ামে বসে ‘রেচক’ করলেন। যতক্ষণ দরজাটা খোলা রইল ততক্ষণ জলতরঙ্গ বাজতে লাগল মৃদু সুরে।
সাদা একটা প্লাস্টিকের বাটিতে জমাটমতো কী একটা বস্তু এনে আমার সামনে রেখে বললেন, নাও, খেয়ে নাও। এর নাম ‘ইয়োগহার্ট’। যেমন উপকারী, তেমনি সুস্বাদু।
বাবা, এমন বস্তুর নাম জীবনে শুনিনি। হার্ট যুক্ত শব্দ, সঙ্গে আবার ইয়োগ। অর্থাৎ যোগ। বাংলা করলে দাঁড়াবে যোগহৃদয়। সঙ্গে একটি সুদৃশ্য কাঠের চামচ। লজ্জা করলে চলবে না। খেতেই হবে। ঠিক আইসক্রিম নয়, অনেকটা দইয়ের মতোই স্বাদ, তবে ভেতরে প্রচুর কিসমিস, খেজুর, কুমড়োর বরফি, আমসত্ত্ব ঠাসা। বেড়ে তরিবাদি ব্যাপার।
প্রবীণ ম্যানেজিং ডিরেক্টার সস্নেহে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি যত খাচ্ছি, তার তত। তৃপ্তি হচ্ছে। এমন স্নেহপ্রবণ মানুষ কীভাবে এত বড় প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন! বইয়ে পড়েছি, শোষণ আর শাসনই হল ধনতন্ত্রের মূল কথা। কই মিলছে না তো?
পাত্র যখন প্রায় সাফ করে ফেলেছি, তখন তিনি প্রশ্ন করলেন, জিনিসটা কেমন?
আজ্ঞে অসাধারণ। একেবারে অমৃতোপম।
তোমার খুব খিদে পেয়েছিল। বুঝতে পারোনি?
খিদের সময় কমদিনই খেতে পেয়েছি, তাই খিদে কাকে বলে তেমন বুঝতে পারি না।
জানি, জানি, আমার ফ্রেন্ড হরিকে আমি চিনি। অতিমানব হবার সব গুণ নিয়ে মানব হয়ে বসে আছে। জানো, ওর স্বপ্ন ছিল, এই ধরনের এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। সে প্রতিভাও ছিল। আমার চেয়ে একশোগুণ ভাল ছাত্র। আর আমি চেয়েছিলুম দেশসেবক, মানবসেবক হতে। দু’জনেই আজ লক্ষ্যভ্রষ্ট। পয়সা করেছি, কিন্তু মানুষ হতে পারিনি। যাও, হাত ধুয়ে এসো। ওই দরজাটা খোলো। ওটা বাথরুম। কাপটা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দাও।
হাতমুখ ধুয়ে ফিরে এলুম। ম্যানেজিং ডিরেক্টার নিচু হয়ে বুককেসের তলা থেকে ঘড়ির মতো কী একটা বস্তু টেনে বের করলেন। কাটা বসানো।
এসো, এর ওপর দাঁড়াও, তোমার ওজনটা নিয়ে রাখি।
ওজন?
হ্যাঁ, ওজন। তুমি কতটা আন্ডারওয়েট, আমার দেখা দরকার। এক মাসের মধ্যে তোমাকে আমি মোটা করে দোব। শরীরম, আদ্যম, খলু ধর্ম সাধন।
যন্ত্রে উঠে দাঁড়ালুম। ঝুঁকে পড়ে কাটাটা দেখে বললেন, অনেকটা বাড়াতে হবে। শুধু দইয়ে হবে না, মধু চাই, মুরগি চাই, চিজ চাই, ছোলা চাই, ভিটামিন চাই, মিনারেলস চাই। আমাদের লাঞ্চ খুব ভাল, ব্রেকফাস্ট আর ডিনারটাকে যদি সামলাতে পারো, একমাসে তোমার উন্নতি হতে বাধ্য। আচ্ছা, এবার তা হলে চলো।
দুটো বাড়ির মাঝখানে সেতুর মতো ঝুলবারান্দা। বারান্দা শেষ হয়েছে জাহাজের ডেকের মতো একটা জায়গায়। মোটা মোটা লোহার চাদর। নীচের দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছে বিশাল কারখানা। বিরাট একটা ভ্যাটে সাবান ফুটছে। ক্ষার ক্ষার ধোঁয়া উঠছে। এক দিকে একটা বয়লার। মাঝে মাঝে রেল ইঞ্জিনের মতো বাষ্প ছাড়ছে। নানারকম কেমিকেলসের গন্ধ ভেসে আসছে। সব গন্ধ ছাপিয়ে উঠছে ন্যাপথলিনের গন্ধ। ছোট ছোট ট্রলি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
একটা ছোট সিঁড়ি ভেঙে আমরা একটা নতুন ব্লকে চলে এলুম। এবার নাকে আসছে অন্য গন্ধ। এ গন্ধ আমার ভীষণ চেনা। কলেজ ল্যাবরেটরিতে এঁকে এসেছি। অ্যাসিড ইথার। ল্যাবরেটরিটি বেশ আধুনিক। নেহাত ছোট নয়। জনা দশেক কেমিস্ট এরই মধ্যে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। খাড়া খাড়া ব্যুরেট। র্যাকে র্যাকে সাজানো রি-এজেন্টের বোতল। ত্রিপদে গলা উঁচিয়ে আছে ডিস্টিলেশন জ্বার। বুনসেন বার্নার জ্বলছে। প্রতিটি টেবিলের শেষে বেসিন আর কল।
বই-ঠাসা কাঁচের ঘরে বসে আছেন ডিসপেপটিক চেহারার এক ভদ্রলোক। অ্যাপ্রন-পরা অবস্থায় তাকে ফাদারের মতো দেখাচ্ছে। ল্যাবরেটরিতে ম্যানেজিং ডিরেক্টার ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীরা বেশ চঞ্চল হয়ে উঠলেন। যিনি কিছুই করছিলেন না, তিনি হাতের কাছে কিছুই না পেয়ে একটা খালি টেস্টটিউব চোখের সামনে তুলে ধরে গভীর মনোযোগে ভেতরের বাতাস দেখতে লাগলেন।
এম ডি ডাকলেন, প্রদ্যোত, উঠে এসো।
ইনিই সেই প্রদ্যোতবাবু, যাঁর হাতে আমাকে ফেলে দিলে একমাসেই মানুষ করে দেবেন। প্রদ্যোতবাবুর চোখে যে-চশমাটা ছিল, সেটা খুলে, দ্বিতীয় আর একটা চশমা পরে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। সামনের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। কোমরের পেছন দিকে দু’হাত রেখে শরীরটাকে সোজা করতেই ঢেউ করে একটা সেঁকুর উঠল। মুখে হাত চাপা দিয়ে বললেন, সরি। বুড়ো আঙুল ছাড়া সব আঙুলেই একটা করে আংটি। ভাগ্যকে পাথরের চেন দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছেন।
এম ডি বললেন, পেটে মনে হচ্ছে শুম্ভনিশুম্ভের লড়াই চলেছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হল পেট। এইবার একটু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড খাই। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের টেবিলের এক ভদ্রলোককে বললেন, সুধীর, অ্যানালার এইচ সি এল কয়েক ফোঁটা জলে গুলে দাও তো!
