আমি একটা কেসই জানি, সেইটাই বলতে গিয়ে ধমক খেয়ে ফিরে এসেছি। সে হল আমাদের। পাশের বাড়ির জবা। যাকে নিয়ে সুখেন দুর্গাপুরে পালিয়েছিল। যার জন্যে দীনু আজ পরলোকে। পিতা বললেন, ওটা হল সিম্পল রুল অফ থ্রি। চেয়েছি পেয়েছি। ও হল, মিঞা বিবি রাজি তো কেয়া করে কাজি। ওটা কোনও কেস নয়, ও হল কেলেঙ্কারি। এক ফুটোঅলা চৌবাচ্চার অঙ্কে হবে। না। চাই ডবল ফুটো। একটা ভোলা, একটা বন্ধ। আমার তো তেমন কোনও কেস জানা নেই।
মাতামহ কখনও চলেছেন আধ্যাত্মিক রাস্তায়, কখনও চলেছেন ভৌতিক রাস্তায়। মেসোমশাই ভাবছেন আইনের কথা। প্রতাপ রায়ের নামে একটা কেস ঠুকে দেবেন। হয় মেয়েকে খুঁজে দাও, নয় জেলে যাও। এদিকে কনক কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে। আগামীকাল অমাবস্যা। সেই ঘুরঘুরে বাবা পঞ্চমুণ্ডীর আসনে বসে ভূত নামাবেন।
সকালের চায়ে চুমুক দিতে দিতে পিতা বললেন, যদি একটা মেয়ে পেতুম!
কী করতেন?
শুধু মেয়ে পেলেই হবে না, তার স্বভাবটি হওয়া চাই কনকের মতো। তা হলে সেটা আমি রিকনস্ট্রাকট করতুম। প্রতাপের মতো একটা থার্ডক্লাসের সঙ্গে বিয়ের কথা পাড়তুম, তারপর সবসময় চোখে চোখে রেখে দেখতুম সে কী করে। এর মধ্যে আমি তিন ভম অপরাধ বিজ্ঞান পড়ে ফেলেছি। জানো কি, একটা খুনের কিনারা করতে আর একটা খুন করতে হয়!
আজকের কাগজে কনকের ছবি দিয়ে আবার একটা বিজ্ঞাপন করা হয়েছে। কনক, ফিরে এসো। তুমি যা চাও তাই হবে। বাবা। ছবিটা দেখছি, আর রাতের স্বপ্ন মনে পড়ছে। জানি, স্বপ্নের কোনও অর্থ হয় না, তবু ভয় হচ্ছে, কনক হয়তো বেঁচে নেই।
আমার কেবলই মনে হচ্ছে নৌকোয় দেখা সেই সতীমার কাছে যদি একবার যাওয়া যেত, তা হলে হয়তো সঠিক খবর পাওয়া যেত। মাতামহ কেন যে হঠাৎ ঘুরঘুরে বাবাকে নিয়ে মেতে উঠলেন! আগামীকাল হয়তো আবার ঘুরঘুরে বাবার আশ্রমে যাওয়া হবে। এবার রাতের দিকে, থাকতে হবে সারারাত। যেতে হবে বাসে। মেসোমশাই আজই যদি এখানে চলে আসেন, তা হলে প্রতাপ রায়ের গাড়ি কি আর পাওয়া যাবে!
আজ আমার জীবনের সাংঘাতিক একটি দিন। আজ থেকে শুরু হবে দাসত্ব। চাকরিতে বহাল হবার চিঠি এসে গেছে। মাইনেটা খুব একটা খারাপ নয়। আপাতত শ’ছয়েক। ফ্রি লাঞ্চ। তিন মাস শিক্ষানবিশির পর চাকরি পাকা হবে। তখন শ’আটেক মিলবে। পিতা অবশ্য খুশি নন। তাঁর মতে চাকরি যদি করতেই হয়, চার অঙ্কের কমে করা উচিত নয়। সে যোগ্যতা আমার নেই। অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ সার্ভিসের পরীক্ষায় বসলে গোল্লা পাব। যা হয়েছে, আমার মতো বুন্ধুর পক্ষে ভালই হয়েছে।
ল্যাবরেটরি মানেই কারখানা। কারখানার নিয়মেই চলতে হবে। আট ঘণ্টা ডিউটি, শুরু সকাল সাড়ে আটটায়। তানানানা করার মতো সময় নেই বললেই চলে। নীচে প্রফুল্ল কাকারা এসে একদিকে ভালই হয়েছে। আমরা সবাই বেরিয়ে গেলে, নীচে বাড়ি আগলাবার জন্যে একটি প্রাণী অন্তত থাকবেন।
সংসারের কাজে আজ আমার ছুটি। প্রথম দিন, ঠিক সময়ে হাজিরা দিতে হবে। যেতে, বাসটাস বদলে কতক্ষণ লাগবে জানা নেই। পিতা বললেন, দেখো, আমার নামটা যেন ডুবিয়ো না। বেরোবার আগে গুরুজনদের ছবিতে প্রণাম করবে। আশীর্বাদ চাইবে। আজ তোমার জীবনের একটি পরিবর্তনের দিন।
বেরোবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সদরের দরজার কাছে এসেছি, দেখি কাকিমা দাঁড়িয়ে আছেন সামনে। হাতে একটা লাল টকটকে জবা। ফুলটি কপালে চুঁইয়ে দিয়ে বললেন, পকেটে রেখে দাও, মায়ের পায়ের ফুল। দুর্গা, দুর্গা। ছুটি হলেই চলে আসবে। এখানে-ওখানে আড্ডা মারবে না। মনে থাকে যেন, আমি একলা থাকব। এত বড় বাড়ি, সন্ধের দিকে ভীষণ ভয়ভয় করে।
মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। কোন সুদূরের এক মহিলা, মাতৃস্নেহে দাঁড়িয়ে আছেন দরজার পাশে, হাতে একটি ফুল নিয়ে। এ দেশের ছেলে সহজে কি সন্ন্যাসী হতে পারে। প্রতি পদে পিছুটান।
সেদিনের সেই ম্যানেজিং ডিরেক্টারের ঘর। ঢুকতে আজ আর বুক কেঁপে গেল না। স্নিগ্ধ বৃদ্ধ, পরিচ্ছন্ন মটকার পাঞ্জাবি পরে বসে আছেন। সামনে একটি বিশাল টেবিল। পেছনে কাঁচ-ঢাকা বুককেসে মোটা মোটা কেমিস্ট্রির বই। পিতার মুখে এই মানুষটির পরিচয় সামান্য জেনেছি। একসময়কার সেরা ছাত্র, সেরা বিপ্লবী। নামে ইংরেজ সরকার সিংহাসনে বসে কঁপত। বিদেশ। থেকে বোমার ফর্মুলা এনে দেশে সন্ত্রাসবাদীদের হাত শক্ত করেছিলেন। স্বামী প্রণবানন্দের প্রিয় শিষ্য। এখন গৃহী সন্ন্যাসীর আদর্শ জীবন কাটাচ্ছেন। যদিও অকৃতদার, প্রতিপাল্যের সংখ্যা নেহাত কম নয়। একটি অনাথ আশ্রম করেছেন। উপার্জনের অর্ধেক টাকা সেই আশ্রমেই ঢেলে দেন।
এত বড় একজন মানুষ অথচ শিশুর মতো সরল। ব্যক্তিত্বের কোথাও এতটুকু অহংকারের আঁশ নেই। চোখদুটি স্নিগ্ধ। স্নেহ মাখা। চশমার আড়ালে চুলটুল করছে, যেন ঘোর লেগেছে। আমাকে দেখেই বললেন, বোসো, মনে মনে তোমার কথাই ভাবছিলুম। খুব সকালে বেরিয়েছ, নিশ্চয় খাওয়া হয়নি!
আজ্ঞে হ্যাঁ, জলখাবার খেয়ে বেরিয়েছি।
কী জলখাবার খেয়েছ?
আজ্ঞে পাউরুটি আর চা।
ডিম নয়, দুধ নয়, শুধু চা আর পাউরুটি!
ওইটাই যে বেশ সহজে হয়।
তা হয়, তবে তোমার বয়েসের ছেলের আর একটু পুষ্টির দরকার। একটা করে মুরগির ডিম খেলে কেমন হয়! কোনও বাধা আছে?
