মেসোমশাই একটি দশ টাকার নোট বাবার সামনে মাটিতে রাখলেন। প্রণাম করার জন্য সবে। মাথাটি নিচু করতে যাবেন, বাবা অমনি থামের মতো পা বের করে নোটে মারলেন লাথি। রাগে লাল চোখ ঘোর রক্তবর্ণ, তুই আমাকে টাকা দিতে এসেছিস! দশ টাকায় আমার সাধনা কিনতে এসেছিস? এটা কি মুদির দোকান? বেরিয়ে যা, বেরিয়ে যা এখান থেকে।
মাতামহ বাবার পা জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, শান্ত হন বাবা! শান্ত হন। না জেনে অন্যায় করে ফেলেছে। অবোধ সন্তানকে ক্ষমা করে দিন। শিব, শিব। শিব, শিব।
১.৩০ বাংলার বধূ বুকে তার মধু
স্বপ্ন বেশিক্ষণ মনে থাকে না। অনেক সময় জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মন থেকে মিলিয়ে যায়। স্বপ্ন মনে রাখতে হলে ঘুম ভেঙে গেলেও ধড়মড় করে উঠতে নেই। চুপ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে হয়। তা হলে স্বপ্নের প্রতিটি দৃশ্য, কথা, শব্দ ছবির মতো মনে থাকে।
স্বপ্ন দেখছিলুম বিশাল এক বাগানে, চাঁদের আলোয় আমি আর ছবিতে দেখা সেই অপর্ণা নামক মেয়েটি বসে আছি পাশাপাশি, গাছতলায়। চাঁদমাখা রাত চার পাশে ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে মসলিনের মধ্যে দিয়ে, কিংবা মসলিনের মশারির ভেতর বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। মাঝে মাঝে চুমকি জ্বলছে। পাশে ওই মেয়েটি বসে থাকায় বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। এরই মাঝে, কোন ঝোপে বসে পাখি ডাকছে। স্বপ্নে অবাস্তব একটা কিছু থাকবেই। তা না হলে, মাতুলের সেই ছাত্রী, সুন্দরী চিত্রাদেবী, ঘাড় ঢগঢগে সারেঙ্গিঅলাকে নিয়ে আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাবেন কেন। তিনি চলেছেন আগে আগে, নায়িকার মতো, বৃদ্ধ চলেছেন পেছন পেছন জিজ্ঞাসার চিহ্ন ধরে। চাঁদের আলোয় চরাচর ভেসে যাচ্ছে। স্বপ্নেই ভাবছি, আহা এ যেন স্বপ্ন! অপর্ণার দিকে তাকালেই সে মৃদু হেসে বলছে, কিছু বলো। হঠাৎ দূরে কোথাও গুড়গুড় করে মেঘ ডেকে উঠল। চাদিনি রাতে মেঘ। গর্জন! এলোমেলো হাওয়া বইতে শুরু করল। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস। সিনেমা হলে যেভাবে ধীরে ধীরে আলো নিভে আসে, সেইভাবে চাঁদের আলো মৃদু হয়ে আসছে। ঢালু জায়গা দিয়ে যেভাবে জল গড়িয়ে পড়ে, সেইভাবে চারপাশ থেকে আঁধার গড়িয়ে আসছে। অপর্ণা ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, এ কী হল পলাশ? আমার ভীষণ ভয় করছে। কোথা থেকে হঠাৎ একটা পাহাড় গজিয়ে উঠল চোখের সামনে। দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। অন্ধকার নেমে আসছে কুলকুল করে জোয়ারের জলের মতো। স্বপ্নে কী যে সব হতে লাগল! ভয় ছাড়া যেন স্বপ্ন হয় না। ষোড়শী সুন্দরী গাত্ৰলগ্না। শ্বাসপ্রশ্বাসে তার শরীর ওঠা-নামা করছে। দূরে একটা সাদা মূর্তি দেখা গেল। বাতাসে আঁচল উড়ছে। কে? কনক! সেই মূর্তি যেন মুখ ফিরিয়ে একবার তাকাল। সারামুখে চন্দনের আলপনা। অপর্ণাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আমি ছুটতে লাগলুম। কনক যেন সাদা মেঘখণ্ডের মতো ভেসে চলেছে। আমি তার আঁচল ধরতে না পেরে ক্রমাগত চিৎকার করে চলেছি, কনক, কনক!
এর পরের দৃশ্য স্বপ্ন নয়, বাস্তব।
বিছানায় বসে আছি হাদাগঙ্গারামের মতো। বালিশে চিত হয়ে শুয়ে আছেন পিতা। চোখদুটো খোলা। আকাশে ভোরের আলো ফুটেছে। পিতার মুখে এক ধরনের শান্ত হাসি, যেন আকাশে চিড় ধরছে। তিনি বললেন, কী হল হে! যেভাবে হাত তুলে কনক, কনক করছিলে, মনে হচ্ছিল ভুস করে আকাশে উড়ে না যাও। তোমার পেটগরম হয়েছে, জোড়া ডাব খেয়ো। আজ পয়সা দিয়ে যাব। উঠে পড়েছ যখন আর শুয়ে কাজ নেই। বাইরে গিয়ে কঁকা বাতাসে একটু পায়চারি করো।
আজ প্রায় সাত দিন হয়ে গেল কনকের কোনও খবর নেই। মেয়েটা একেবারে উবে গেল। পুলিশ নাকি বলেছেন, আমরা সারা ভারতবর্ষে ছবি ছড়িয়ে দিয়েছি। খোঁজপাত চলছে। না পেলে আমরা কী করতে পারি। যারা হারিয়ে যায়, তাদের সকলকেই কি আর পাওয়া যায়!
ভাগ্যিস বলেননি, মারা গেলে কী করতেন?
প্রতাপ রায়ের স্বরূপ বেরিয়ে পড়েছে। মেসোমশাইয়ের সঙ্গে আর তেমন ভাল ব্যবহার করছেন না। মেয়ে নেই, তা ভাবী শ্বশুরের সঙ্গে অত খাতির কীসের! মেসোমশাই এতদিনে বুঝেছেন, মানুষ কান ধরে টানে, মাথাটা কাছে আনার জন্যে। শুধু কানের কোনও কদর নেই। মেসোমশাই আজ আবার ফিরে আসছেন এ বাড়িতে। ব্যাক টু মেথুসেলা। এখন তার মনে হয়েছে, হরিদার মতো মানুষ। হয় না। যতই হোক একটা কুটুম্বিতার সম্পর্ক রয়েছে।
কোথা থেকে কনক এল, এসে একটা দাগা দিয়ে চলে গেল। যখনই মনে হচ্ছে কনক আর বেঁচে নেই, তখনই ভেতরটা হুহু করে উঠছে। কনকের মতো মেয়ে, একা পরিব্রাজিকা হয়ে বেরিয়ে যেতে পারে না। অসম্ভব। সে তো সিস্টার নিবেদিতা নয়, কিংবা সেই ভৈরবীও নয়, যিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে। সাধনা করাবার জন্য হঠাৎ দক্ষিণেশ্বরে এসেছিলেন।
কনকের খোঁজে তিন জন তিন ভাবে এগোচ্ছেন।
পিতা চলেছেন বিজ্ঞানের রাস্তায়। তিনি রাতের পর রাত অঙ্ক কষে চলছেন। একটি মেয়েকে যদি জোর করে বিয়ে দেবার চেষ্টা হয়, আর সে মেয়ে যদি স্বাধীনচেতা এবং শিক্ষিতা হয়, এবং যুগটা যদি আধুনিক, নারী স্বাধীনতার যুগ হয়, তা হলে মেয়েটি কী করবে! রুল অফ থ্রি লাগাও। নানারকম কেস হিস্ট্রি ঘেঁটে দেখো। অনুরূপ অবস্থায় কোন মেয়ে কী করেছে অনুসন্ধান করো, খোঁজ নাও। নিজের মনেই থেকে থেকে বলছেন, ইনভেস্টিগেশন, ইনভেস্টিগেশন। এখন তার অবস্থা প্রায় শার্লক হোমসের মতো।
