মহাপুরুষ মৃদু হাসলেন আর সঙ্গে সঙ্গে মেসোমশাই আর্তনাদ করে উঠলেন, এ কী হল, আমি কিছুই যে দেখতে পাচ্ছি না। আমি অন্ধ হয়ে গেছি।
মহাপুরুষ বললেন, হবেই তো, হবেই তো। তুমি যে বাবা অহংকারে অন্ধ। পূর্বজন্মে তুমি ছিলে একজন রূপবান অভিনেতা, আগামী জন্মে তুমি হবে একজন শবর। এ জন্মে তুমি সব হারাবে। নদীর তীরে একলা বাস করবে। বেঁচে থাকবে এক নীচ জাতীয় মহিলার অন্নে। মৃত্যু হবে অমাবস্যায়, শেষরাতে, শ্বাসকষ্টে। মৃতদেহ সৎকার করবে নীচ জাতির লোকেরা।
মেসোমশাই, বাবা, বলে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন।
বাবা একটি তালি বাজালেন। স্পষ্ট দেখলুম হাত দিয়ে ধোঁয়া বেরোল। মেসোমশাই উল্লাসে চিৎকার করলেন, দেখতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।
আমি ক্ষমা করার কে রে ব্যাটা! নিজের কাছে ক্ষমা চা। নিজের আত্মপুরুষের কাছে। প্রতিদিন তুই যাকে খাটো করছিস। তোর দীনতা দেখে প্রতিদিন যে অশ্রু বিসর্জন করছে।
বাবা, আমি আমার বড়মেয়েকে কাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। আপনি দয়া করে তাকে পাইয়ে দিন। বলে দিন সে কোথায় আছে
মহাপুরুষ আবার হাঁক পাড়লেন, পঞ্চা পঞ্চা। কৌটো লে আও।
সেই ক্ষুদ্র চ্যালা নাচতে নাচতে একটি রুপোর কৌটো নিয়ে এলেন। নদীর জলে চাঁদের আলোর মতো চকচক করছে।
কৌটোটাকে মাদুরের পাশে মেঝেতে রেখে গেলেন। মনে হয় কোনও মশলাটশলা আছে। মহাপুরুষের জীবনে ভোগ আর ত্যাগ দুটোই হাতধরা।
তোমার মেয়ে পালিয়েছে। পালিয়ে বেঁচেছে। তবু একবার দেখি, কোথায় সে আছে? পঞ্চা!
হাঁক শুনে সেই পঞ্চ মহারাজ আবার নেচে নেচে এলেন। বাবার এবারের হুকুম, স্লেট পেনসিল আর এক সানকি জল। স্লেট-পেনসিলটা মেসোমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, তিনটে সংখ্যা লেখো।
মেসোমশাই লিখলেন, দুই সাত দুই। মহাপুরুষ সংখ্যা তিনটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমার মেয়ের নাম ক দিয়ে, বোধহয় কনক। চন্দ্রের জাতক, সুন্দরী, কেশ ঈষৎ কুঞ্চিত, নাতিদীর্ঘাঙ্গী, মৃদুস্বভাব, ভাবপ্রবণ, কল্পনাবিলাসী। পিতা এবং মাতার চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত।
মহাপুরুষ হোমকুণ্ড থেকে আঙুলের ডগায় ছাই নিয়ে মেঝেতে একটা চক্র আঁকলেন। চক্রের মাঝখানে একটা ব লিখলেন। ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে তিনটি বীজমন্ত্র ছুড়লেন, শব্দে বাতাস কেঁপে উঠল পাতলা ধাতব চাঁদরের মতো। সেই কম্পন যেন আর থামতেই চায় না। সানকির জলে তরঙ্গ খেলছে। এক ধরনের চিনচিন শব্দ হচ্ছে।
কী যে হচ্ছে ঈশ্বরই জানেন। পৃথিবীর প্রগতি অনেকটা লম্বা বেলুনের চেহারা নিয়েছে। এক প্রান্ত যেমন ছিল তেমনই আছে, অন্য প্রান্তে ঠেলে এগিয়ে চলেছে। মহাপুরুষ রুপোর কৌটাটি হাতে তুলে নিয়ে ঢাকা খুলে সেই বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুতে উপুড় করে দিলেন, যেন পাশার দান ফেললেন। চোখ বুজিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থেকে ঝপ করে কৌটোটা তুলে নিলেন। অদ্ভুত চেহারার একটা পোকা, কেন্দ্রে স্থির থেকে হঠাৎ সড়সড় করে দক্ষিণে চলতে শুরু করল।
দক্ষিণ দিকেই আমরা বসেছিলুম। মেসোমশাই ঘুরঘুরে ঘুরঘুরে বলে এক ডিগবাজি খেয়ে দাওয়া থেকে নীচে পড়ে গেলেন। মাতামহ পড়লেন না, তবে ভয়ে সিঁটিয়ে রইলেন। ঠোঁট বিড়বিড় করছে। মন্ত্র জপছেন। আর আমি, দ্বিতীয় কোনও কথা নয়। ঘুরঘুরে শুনেছি সাংঘাতিক প্রাণী। তিরবেগে দৌড়ে একেবারে চৌহদ্দির বাইরে।
বাবার চ্যালা পঞ্চা মেসোমশাইকে ঠেলেঠুলে আবার দাওয়ায় তুলে দিল। মাতামহর গলার স্বর ফিরে এসেছে। আমাকে ডাকছেন, চলে আয়। তার মানে ঘুরঘুরে আবার কৌটোয় ঢুকে পড়েছে।
কী কায়দায় ঢোকালেন, কে জানে! মহাপুরুষরা সব পারেন।
মেসোমশাইয়ের মাথার পেছন দিকে এক তাপ্পি ধুলো। মহাপুরুষ বললেন, তোমাদের এত ভয়! বেঁচে আছ কী করে! মনটাকে বড় চঞ্চল করে দিলে। পঞ্চা, ছিলিম আন।
এক টানে কলকের মাথা ব্লপ করে জ্বলে উঠল। চোখে এসে গেল তুরীয় দৃষ্টি।
মেসোমশাই একটু সামলেছেন। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী বুঝলেন বাবা?
বাবা হুম করে একটি হুংকার ছেড়ে বললেন, মেয়ে তোমার দক্ষিণ দিকে গেছে।
দক্ষিণ মানে দক্ষিণ কলকাতা?
না রে বোকা, দক্ষিণ ভারতের দিকে গেছে।
সেকী, সেখানে কে আছে!
বাবা খুব চটে গিয়ে বললেন, কে আছে, তার আমি কী জানি, সে জানবে তুমি। আচ্ছা দাঁড়াও জলদর্পণে একবার দেখি।
বাবা একটি দেশলাই কাঠি জ্বেলে সেই জল-টলটলে সানকির ওপর ধরলেন। আগুনের শিখায় জলের রং সোনার বর্ণ হল। কী আশ্চর্য! রং ক্রমেই ফিকে থেকে গাঢ় হচ্ছে। জল যেন টলটলে কাঁচা সোনা। বাবা তাকিয়ে আছেন স্থির দৃষ্টিতে। উত্তেজনায় আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
বাবা হঠাৎ নড়ে উঠলেন, নাঃ এখনও সে কোথাও পৌঁছোয়নি। মনে হয় ট্রেনেই আছে।
মেসোমশাই বললেন, ট্রেনের ভেতরেই একবার দেখুন না।
তা তো হবে না রে। ট্রেন যে গতিশীল। সে স্থিত না হলে আমার দর্পণে তো আসবে না।
আমি তা হলে এখন কী করব বাবা?
কী আর করবে, অপেক্ষা করো। ধৈর্য ধরো। সংসারে এমন ঘটনা কত হচ্ছে!
বাবা, ওর সঙ্গে আর কেউ আছে কি!
অবশ্যই আছে।
কে সে? সে কে?
অত সহজে বলতে পারব না। অমাবস্যার দিন আসনে বসব। সেই দিন তোমার জন্যে আমি সারাভারত চষে আসব। প্রতিপদে বলতে পারব, মেয়ে তোমার কোথায় আছে, কেমন আছে!
