ঘুরঘুরে বাবা দমদম বিমানবন্দরের কাছে কোনও এক গ্রামে থাকেন। মেসোমশাই গাড়ি এনেছেন। যেতে আধঘণ্টাও লাগবে না। পিতার তেমন মত ছিল না, তবু আমরা বেরিয়ে পড়লুম। যেতে যেতে মেসোমশাই শুধু একটি কথাই বললেন, কনককে যদি খুঁজে না পাই, তা হলে আমি। আত্মহত্যা করব। মাতামহ বললেন, আত্মহত্যার কোনও প্রয়োজন হবে না। বেনারসে আমার স্ত্রী একবার হারিয়ে গিয়েছিলেন। আমি কিছু করিনি। চুপচাপ বসে রইলুম আর বগলা স্তোত্র আওড়াতে লাগলুম। সন্ধের দিকে সুড়সুড় করে সৌদামিনী এসে হাজির। তখন আমি শ্রীরামচন্দ্রের মতো বললুম, এবার তোমাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। তিনি বললেন, ঝাটার বাড়ি দোব। যাঁড়ের তাড়া খেয়ে শিবঠাকুর আমার বউ ফেলে পালালেন। তা দেখুন, সেই স্ত্রীর কল্যাণে স্বামী জগদানন্দের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। জ্বলন্ত মহাপুরুষ। চোখ দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোচ্ছে। দু’জনেরই দীক্ষা হয়ে গেল। বীজমন্ত্র যেন ভঁসা ভোমরার মতো ভোঁ ভোঁ করছে। তবে একটা কথা, স্ত্রী ফিরে আসবেই। সে যে জন্মজন্মের বন্ধন। এই সামনের বার আবার আমার সৌদামিনীর সঙ্গে বিয়ে হবে। আপনার স্ত্রী হারিয়ে গেলে ভাবনার কিছু ছিল না। মেয়ে তো? কেউ যদি পেয়ে থাকে সে কি আর ফেরত দেবে! অমন সুন্দরী মেয়ে। একটা টাকা ফেরত দেয় না যে দেশের মানুষ, সে দেশের মানুষের ওপর আমার তেমন বিশ্বাস নেই। যাক যা করেন কালী সেই সে জানে।
বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশ দিয়ে গাড়ি চলেছে। রোদে দাঁড়িয়ে থাকা একটা প্লেন চকচক করছে। মাতামহ নানা কথা বলছেন, আমার মনটা কিন্তু তেমন সুবিধের নেই। মনে হচ্ছে আমিই হারিয়ে গেছি। এই বিশাল শহরে কনক সত্যিই হারিয়ে গেল। কার খপ্পরে গিয়ে পড়ল কে জানে। কনক তো কচি মেয়ে নয় যে গোলাপ ফুল শুকিয়ে অজ্ঞান করে দেবে, কি লজেন্সের লোভ দেখিয়ে থলেতে ভরে ফেলবে! এই হোঁতকা বাপটার জন্যে মেয়েটার জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল। যে ধরেছে সে নিশ্চয়ই আরবদের দেশে চালান করে দেবে।
মাতামহ বললেন, এই যে আমরা এসে গেছি। ঘুরঘুরে বাবার আশ্রম দেখা যাচ্ছে।
মেসোমশাই জিজ্ঞেস করলেন, ঘুরঘুরে বাবা নাম হল কেন? খুব ঘুরে ঘুরে বেড়ান?
গেলেই বুঝবেন, কেন ওঁর নাম ঘুরঘুরে বাবা।
ছিটে বেড়া দেওয়া বিশাল একটা জায়গা। মাঠে এক কণাও ঘাস নেই। পরিষ্কার তকতকে। কী করে এমন হল! মাথায় টাক পড়ে, মাঠে কেমন করে পড়ে কে জানে? চারপাশ সাদা খনখনে। দমকা হাওয়ায় মাঝে মাঝে ধুলো উড়ছে। একপাশে একটা ছোট মাপের মন্দির। তার মাথায় লাল পতাকা উড়ছে। ভেতর দিকে আটচালা ধরনের কয়েকটা বাড়ি। উঁচু উঁচু দাওয়া। দেখলেই মনে হয় ভেতরটা বেশ শীতল হবে। লাল রঙের পাঞ্জাবি, ধুতি, কৌপিন ঝুলছে। দাওয়ার এক পাশে বিশাল একটা ত্রিশূল পোঁতা। ফলায় ঝুলছে জবার মালা। দিনের উত্তাপ শুকিয়ে এসেছে। তলায় একটি নির্বাপিত হোমকুণ্ড। কিছু কাঠে তখনও আগুনের স্পর্শ লেগে আছে। ফুরফুরে ধোয়া পাকিয়ে পাকিয়ে বাতাসের গায়ে অদৃশ্য কোনও লোকের লিপি লিখে চলেছে।
ঘরের ভেতর থেকে বিরাট এক হুংকার ভেসে এল, মা, মা, একবার তেড়েফুঁড়ে ওঠ মা।
মাতামহ ততোধিক জোরে হাঁক পাড়লেন, বাবা, বাবা, আমি আ গিয়া।
খটাস খটাস করে খড়মের আওয়াজ ক্রমশই এগিয়ে আসছে। উঃ ঘুরঘুরে বাবার কী সাংঘাতিক চেহারা! দারা সিং, কিংকং, রানধোয়া, সব একসঙ্গে এক ছাঁচে ফেলে ভগবান বাবাকে তৈরি করেছেন। এরকম বিশাল ভুড়ি খুব কমই দেখেছি। ভয় হতে লাগল, এখুনি না ফটাস করে ফেটে যায়। বেলকুঁড়ির মতো নাইকুণ্ডল, ভোমরার মতো সেঁটে আছে, ভোঁ করে উড়ে এসে কামড়ে না দেয়। নিম্নাঙ্গে একটুকরো লাল কাপড় কোনওরকমে জড়ানো। টেনিস বলের মতো লাল দুটো চোখ। কপালে গোল এতবড় একটা লাল টিপ। মাথায় জটা। মহাপুরুষ সামনে এসে দাঁড়ালেন। প্রায় ফুট ছয়েক লম্বা। যখন দূরে ছিলেন মুখ দেখতে পাচ্ছিলুম, যখন কাছে এলেন, তখন জালার মতো ভুড়ি আর থামের মতো দুটো পা ছাড়া আর কিছুই দেখার উপায় নেই। তিনি ঈশ্বরের মতো বিশাল, আমি কীটের মতো ক্ষুদ্র।
মাতামহ দমাস করে পায়ের ওপর পড়লেন।
বাবা বললেন, রান্ধুসি তোর মঙ্গল করুক।
আমরাও পালা করে প্রণাম সারলুম। মহাপুরুষ কর্কশ গলায় ডাকলেন, পঞ্চা, পঞ্চা।
গুড়গুড় করে বামনাকৃতির একটি মানুষ, যাই বাবা, বলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। সার্কাসের ক্লাউনের মতো ভাবভঙ্গি।
মহাপুরুষ হুকুম করলেন, মাদুর বিছাও। ছিলিম লে আও।
যো হুকুম, বলে চ্যালা নাচতে নাচতে চলে গেলেন। দাওয়ায় মাদুর পড়ল। আমরা একে একে বসে পড়লুম। মহাপুরুষ বসলেন পদ্মাসনে। যোগের শরীর। পায়ের ওই বিচিত্র মুদ্রায় আসতে এতটুকু কষ্ট হল না। ভুড়িটি সামনে লটকে পড়ল। ত্রৈলঙ্গস্বামী কীভাবে উলঙ্গ থাকতেন আজ বুঝতে পারলুম। ছোট একটি কলকে এসে গেল। দমভোর টানে ব্লপ করে আগুন জ্বলে উঠল। এর নাম গাঁজা। ব্যারিস্টার মেসোমশাইয়ের চোখমুখের অবস্থা তেমন ভাল নয়। মহাপুরুষকে পছন্দ হয়নি।
কলকেটি চ্যালার হাতে দিয়ে বাবা বললেন, শিক্ষিত লোকেদের বড় অবিশ্বাস, আর অবিশ্বাসী লোক দেখলে আমার খুব দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে করে। তোমরা মজা দেখবে? তা হলে দেখো।
