না, কোনওরকম চিঠিই আমি পাইনি।
ঘটনাটা খুলে বলুন তো আপনি।
কাল সকালে প্রতাপের বউদির সঙ্গে…
প্রতাপের তো কেউ নেই শুনেছিলাম।
না না, সবাই আছে, মিল নেই, আলাদা আলাদা থাকে। মামলা-মকর্দমা চলছে।
বেশ বলুন তারপর। বউদির সঙ্গে?
বউদির সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর যাবে বলে বেরোল। বেলা একটার সময় বউদি ফিরে এলেন। এসে জিজ্ঞেস করলেন, কনক ফিরেছে। আমরা অবাক। কনক একা ফিরবে কী করে! সে তো গেল আপনার সঙ্গে। খোঁজ খোঁজ, তোলপাড়, এখনও তার সন্ধান নেই।
জল-পুলিশে খবর নিয়েছেন?
জল-পুলিশে কেন?
দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গাটা মশাই তেমন সুবিধের নয়। এ সময়টা আবার বান আসার কাল। হয়তো জলে নেমেছিল, টেনে নিয়ে চলে গেছে।
সঙ্গে যিনি ছিলেন, তিনি বলছেন, গঙ্গার ঘাটে সে নামেনি। পঞ্চবটীর কাছে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।
সেই মহিলার কথা কতটা বিশ্বাসযোগ্য! আপনি খুব ভুল করেছেন। শুনেছেন নিশ্চয়, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।
কার লোভ, কীসের লোভ!
বড়লোক জামাইয়ের লোভ। অগাধ বিষয়সম্পত্তি। মামলার জট ছাড়াতে পারলেই, অভিভাবক হয়ে নিজে লাঠি ঘোরাবেন। এখন ম্যাও সামলান। ওরা কায়দা করে আপনার মেয়েকে মেরেও ফেলতে পারে।
মারবে কেন? মেরে ফেলে কার কী লাভ হবে!
খুব হবে। প্রতাপের উত্তরাধিকারী আসার পথ বন্ধ হবে। আপনি আইন বোঝেন, এই সামান্য জিনিস বোঝেন না? জমিদারি মানেই খুন, জখম, রাহাজানি, হত্যা, ব্লাডবাথ। অর্থকণিকা আর রক্তকণিকা এক জিনিস। আমাদের এখানে এক জমিদারকে বিষ খাইয়ে মেরেই দিলে। কে মারলে, জানেন? ভাগনে। সমস্ত সম্পত্তি পড়ে রইল কোর্ট অফ ওয়ার্ডে। নাবালক ছেলে কবে সাবালক হবে, তারপর সব ছাড়ান পাবে! এর মধ্যে তাকে যদি সরিয়ে ফেলতে পারে তো হয়ে গেল! বেশ ছিলেন এখানে, লোভে লোভে পা দিলেন গিয়ে জতুগৃহে।
হরিদা, আমি তো এত সব ভাবিনি। আমি এখন নিমজ্জমান ব্যক্তি। আমাকে তিরস্কার না করে উদ্ধার করুন।
পিতা আপনমনে বলতে লাগলেন, কোথায় যেতে পারে? আচ্ছা, প্রতাপকে কি ওর পছন্দ হয়নি?
মেয়েদের আবার পছন্দ-অপছন্দ কী! আমরা যা পছন্দ করে দোব সেইটাই তো হবে তাদের পছন্দ।
তা বললে চলে! যুগ পালটাচ্ছে। মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। তার একটা পছন্দ অপছন্দ থাকবে না! প্রতাপকে স্বামী হিসেবে আমার খুব একটা রিলায়েবল মনে হয়নি।
ছেলেটার সব ভাল, তবে একটু খেয়ালি। জীবনটাকে হিসেব করে খরচ করতে শেখেনি। আর অসম্ভব স্ফুর্তিবাজ। অত ফুর্তি আবার ভাল নয়।
মানুষকে একটা দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, বিনয়দা। তা না হলে চরিত্র তৈরি হয় না। আপনারা ভাবেন টাকায় সুখ। একেবারে ভুল ধারণা। জীবনকে যত সিম্পল করবেন তত সুখ বাড়বে। সব ছাড়োয়ে, সব পাওয়ে। স্বভাব একবার এলে গেলে বড় বিপদ। তাকে খাড়া করা খুব শক্ত!
গানের সুরে কথা চাপা পড়ে গেল। অভয় পদে প্রাণ সঁপেছি। আমি আর কি যমের ভয় রেখেছি। এ আমার মাতামহের গলা। দুলে দুলে সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। কালী নাম কল্পতরু হৃদয়ে রোপণ করেছি। আমি দেহ বেচে ভবের হাটে দুর্গানাম কিনে এনেছি।
গানের শেষ চরণটি নিচু হয়ে ঘরে ছাড়লেন, যেন কোল থেকে বেড়াল নামালেন। আজ একেবারে রাজবেশ। ফরসা ধবধবে ধুতি। কোয়ার্টার হাতা সাদা পাঞ্জাবি। পায়ে বার্নিশ করা জুতো।
এলুম গো। কে কেমন আছ তোমরা! কেন বসে বিরস বদনে? কী হল কী তোমাদের?
পিতা বললেন, আপনার পানিশমেন্ট হওয়া উচিত। হঠাৎ কোথায় যে উধাও হয়ে যান।
উঃ, সে তোমাকে কী বলব হরিশঙ্কর। জীবনে একটা অভিজ্ঞতা হল। সাধনার জোরে মানুষ যে কোথায় যেতে পারে! এক মহাপুরুষ দেখে এলুম হরিশঙ্কর।
চেয়ারে বসতে বসতে মাতামহ বলছেন, আর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। হঠাৎ মেসোমশাইয়ের দিকে চোখ পড়ল। এতক্ষণ নিজের খেয়ালে ছিলেন।
কী খবর? আপনি আবার বৃন্দাবন থেকে মথুরায় ফিরে এলেন?
আমার বড় বিপদ।
চাবি হারিয়ে ফেলেছেন?
হারিয়েছি, তবে চাবি নয়, মেয়ে। আমার বড়মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছি না।
কোথায় রেখেছিলেন?
কোথায় আবার রাখব। ঘরে রেখেছিলুম।
ওইজন্যেই হারিয়েছে। রিং-এ না রাখলেই হারাবে।
পিতা বললেন, আপনি কোন জগতে আছেন! উনি চাবি হারাননি! মেয়ে হারিয়েছেন। বড়মেয়ে কনককে কাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
আঃ। বলো কী! কী সর্বনাশ! কনক সেই মেয়েটি! যার সঙ্গে মনে মনে আমার নাতির বিয়ের ঠিক করেছিলুম! চলো তা হলে।
কোথায় যাবেন?
খুঁজতে বেরোই। আমার মনে হয় সে জিটি রোড ধরে হাঁটছে। এতক্ষণে তারকেশ্বরে পৌঁছে। গেছে।
মেসোমশাই উদগ্রীব হয়ে বললেন, কী করে বুঝলেন? আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল!
না, দেখা হয়নি। আমি নখদর্পণে যেন দেখতে পেলুম।
নখদর্পণ কী জিনিস!
সে আছে। অবিশ্বাসীদের জন্যে নয়। একটু অলৌকিক ধরনের ব্যাপার।
ওসবে আমার খুব বিশ্বাস। পারেন তো বলুন না আমার মেয়েটাকে কোথায় পেতে পারি?
আমার ক্ষমতায় হবে না, তবে আপনাকে একজায়গায় নিয়ে যেতে পারি। ঘুরঘুরে বাবার কাছে।
তিনি বলে দিতে পারবেন?
খুব পারবেন। তার অসাধারণ ক্ষমতা। মৃত্যুর পর কে কোন লোকে আছে একেবারে সঠিক বলে দেন।
কনকের মৃত্যু হয়েছে!
না না, মৃত্যুর কথা আমি ভাবছি না। মৃত্যু হবে কেন? আমি বলছি পরলোকের কথা যিনি বলতে পারেন, এ লোক তো তার কাছে ছেলেখেলা।
