রান্নাঘরের সামনে বারান্দায় বলাই ঘুরছে। পিতা ডাকছেন, বলাই আয়, একটু চা খেয়ে যা। নীচে প্রফুল্লকাকা কাপড় থোবার তালে তালে গাইছেন, লোহারই বাঁধনে বেঁধেছে সংসার, দাসখত লিখে নিয়েছে হায়।
সামনের রাস্তায় গাড়ি থামার শব্দ হল। মনে হয় মাতুল এলেন। এতদিনে সিনেমা নিশ্চয় অনেকটা এগিয়ে গেছে। গম্ভীর গলায় ডাক শোনা গেল, হরিদা আছেন, হরিদা।
দীর্ঘকাল পরে মেসোমশাই এলেন। নিশ্চয় মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে এলেন! এমাসে কি বিয়ের দিন আছে! যে জানে সে জানে। আসুন আসুন, বলে পিতা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। বলাইবাবু প্লেট থেকে চেটে চেটে চা খাচ্ছে।
মেসোমশাইকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে। ভেবেছিলুম পেছন পেছন প্রতাপ রায় উঠে আসবেন না, মেসোমশাই একা। গাড়িটা অবশ্য প্রতাপ রায়ের। ড্রাইভার চালিয়ে এনেছে। বসার ঘরের চেয়ারে বসে মেসোমশাই চারপাশ একবার ভাল করে দেখে নিয়ে, কেউ কিছু প্রশ্ন করার আগেই বললেন, বড় দুঃসংবাদ।
পিতা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, কেন, কী হয়েছে? মেয়েরা ভাল আছে তো!
মেয়েদের মধ্যে ছোট মেয়ে ভালই আছে, পরীক্ষাও ভাল দিয়েছে, তবে বড় মেয়েটা নেই।
নেই মানে? পিতা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। আমার বুকের মধ্যে কেমন করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। কনক মারা গেছে! সে কী করে হয়?
হরিদা, কনক নিরুদ্দেশ, কনককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! তা কী করে হয়! ছেলেরা হিরো হবার জন্যে বাপের পকেট কেটে বোম্বে পালায়। মেয়ে পালায়, আমি বিশ্বাস করি না। কনক সেরকম মেয়েই নয়। আপনারা ভাল করে খুঁজে দেখেছেন?
কোথাও বাকি নেই। নো স্টোন লেফট আনটার্নড। সব জায়গা দেখেছি। হাসপাতালে, মর্গে, শ্মশানে। থানায় ডায়েরি করা হয়েছে। কোনও খবর নেই। কনক এখানে আসেনি তো!
এখানে? এখানে এলে তো আপনাকে আগেই বলতুম।
সেইটাই তো উচিত। তবে মানুষ তো অনেক সময় অনেক কিছু চেপে যায়!
বাঃ বাঃ, বেশ বললেন যা হোক। চেপে রাখার পেছনে একটা উদ্দেশ্য থাকবে নিশ্চয়ই। এখানে আমার উদ্দেশ্যটা কী!
আপনাদের দিকে কনকের একটা টান দিনদিন বাড়ছিল। তার ওপর আমি প্রায় জোর করেই তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে প্রতাপের সঙ্গে ম্যারেজ ফাঁইন্যালাইজ করে ফেলেছি। এই অবস্থায় সে কোথায় যেতে পারে! লজিক বলে, এখানেই আসা উচিত।
আপনার লজিকের নিকুচি করেছে! এমন ফাদার আমি জীবনে দেখিনি। পুরো ঘটনাটা বলুন।
আপনার ছেলে এখানে আছে তো?
দরজা দিয়ে উঁকি মেরে একটু আগে কে দেখে গেল?
হ্যাঁ, মনে হল তাই; কিন্তু সাহস করে ঘরে আসছে না কেন? ও মহলে কেউ নেই তো!
পুলিশের কাছ থেকে একটা সার্চ ওয়ারেন্ট বের করে তা হলে বাড়ি সার্চ করান।
না, সেটা তো হয়ে গেল শেষ কথা, তার আগে দেখতে হবে, একটা অ্যামিকেবল সেটলমেন্টে আসা যায় কি না!
না আসা যায় না, আপনার মতো একটা ক্রুকেড লোকের সঙ্গে কোনও সেটলমেন্ট চলে না।
হ্যাঁ, তা তো বলবেন। মেয়ের বাপ হলে বুঝতেন কী জ্বালা!
মেসোমশাই হাক পাড়লেন, কনক, কনক, আমি এসেছি, কাল থেকে প্রতাপ তোর জন্যে না খেয়ে আছে মা।
আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। যান সারাবাড়ি তন্নতন্ন করে দেখে আসুন।
মেসোমশাই লাফিয়ে উঠে দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন, ওটা কী?
সামনেই আমি দাঁড়িয়ে ছিলুম। মেয়ে হারিয়ে গেল তবু জীবনের ভয় গেল না। অতবড় একটা মানুষ, সামান্য একটা কচ্ছপ দেখে আঁতকে উঠলেন। বললুম, চলে আসুন, ভয় নেই, ওটা একটা কচ্ছপ!
কচ্ছপ! ছি ছি, অযাত্রা। তোমরা কচ্ছপ খাও নাকি!
ওটা খাবার নয়, আমরা পুষেছি।
কচ্ছপ আবার কেউ পোষে নাকি? যাক তোমাদের ব্যাপার, আমার নাক গলিয়ে দরকার কী! তা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, কনক কি সত্যিই এই বাড়িতে নেই!
আপনি নিজে দেখুন না। সব ঘুরে দেখে আসুন।
মেসোমশাই আবার লাফিয়ে উঠলেন, ওই তো কনকের গলা। নীচে লুকিয়ে আছে।
সিঁড়ির দিকে দৌড়ালেন। কাকিমার গলা। নিজের মেয়ের গলা চেনেন না! বাধা না পেলে এখুনি হুড়মুড় করে নীচে ছুটতেন। ও কনকের গলা নয়। বারান্দা দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখুন।
ও বাবা, ইনি আবার কে?
বাবার বন্ধুর স্ত্রী।
হরিদার স্বভাবই হল যত উড়ো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া। তা পড়ুন। আমার তাতে কী! কনক নীচে নেই তো!
আপনি অনর্থক সময় নষ্ট করছেন। কনক এখানে আসেনি।
চুপ করো পেঁপো ছেলে, আমার মেয়ের মাথাটি তুমিই খেয়েছ। প্রেম কাকে বলে সে জানত! প্রেম আবার কী? প্রেম! রাধাকেষ্ট পালা।
ঘর থেকে পিতা সাবধান করলেন, তুমি চলে এসো। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ। কোনও উত্তর দিয়ো না। চলে এসো।
মেসোমশাই হতাশ হয়ে বেশ কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন আকাশের দিকে তাকিয়ে। তারপর ধীর পায়ে ঘরে এসে ঢুকলেন। চোখে জল। পিতা বললেন, শান্ত হয়ে বসুন, বিনয়দা। বিপদের সময় উতলা হতে নেই।
মেসোমশাই রুদ্ধ কান্নায় ফুলেফুলে উঠতে লাগলেন, হরিদা, আমি কোন মুখে বাড়ি ফিরব? বাড়ি গিয়ে আমি কী বলব? এই এত বড় শহর, কোথায় আমি খুঁজব!
আপনি কোনও চিঠি পেয়েছেন?
কী চিঠি? কনকের সুসাইড নোট!
না, র্যানসাম চেয়ে কোনও চিঠি। যেমন বিলেতে হয়। প্রথমে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়, তারপর বিরাট টাকা চেয়ে চিঠি ছাড়ে না দিলে খুন করে।
