প্রায় সংগীতের মতো করে পিতা চরণকটি উচ্চারণ করলেন। পা দুটো জল থেকে উঠে এসে আপাতত ভোয়ালের আশ্রয়ে। ছবিটা বিছানায় চিত হয়ে পড়ে আছে। পিতার পাশে কন্যার মতো। চোখ পড়লেই মনে হচ্ছে সেই অন্তরালবর্তিনী হেসে উঠছে। নাকে মনে হয় ছোট্ট একটি হিরের। ফুল। সাদাকালো ছবিতেও চিকিরমিকির করছে। বেশ স্নেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আগামী জীবনের সুন্দর একটা পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলেছি, এখন তুমি যদি না বানচাল করে দাও। এই জরাজীর্ণ বাড়িটা আমি এবার বেচে দেব। এর দেয়ালে দেয়ালে জীবনের বিষণ্ণ স্মৃতি। আর একটু নিরিবিলি দিকে সরে গিয়ে বিযেখানেক জমি কিনব। সেই জমিতে ছোট্ট একটা। কটেজ টাইপ বাড়ি করব। চারপাশে বাগান করব নিজের হাতে। স্থলপদ্ম, টিকোমা জেসমিন, সবরকমের করবী, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, গুলমোহর, জবা, টগর, গোলাপের ফোয়ারা ছোটাব। চটিটা একটু এগিয়ে দাও তো, উঠে দাঁড়াই।
চটিজোড়া খাটের পাশে এগিয়ে দিতে গিয়ে মেঝে থেকে আর একটি মেয়েলি জিনিস আবিষ্কার করলুম, মুখখোলা সেফটিপিন। সর্বনাশ! পায়ে ফুটলে হয়েছিল আর কী! সাধে কি মেয়েরা কাছখোলা।
ঘরে পায়চারি করতে করতে পিতা বলতে লাগলেন, বাথরুমটা করব বেশ বড়। দেয়াল, মেঝে সব মার্বেল পাথর দিয়ে বাঁধাব। বিরাট একটা বাথটব বসাব। শাওয়ার থাকবে। তোমার মা খুব চান করতে ভালবাসত। খুব শখ ছিল এইরকম একটা বাথরুমের। এই বাথরুম আমি উৎসর্গ করব আমার পুত্রবধূকে। একে বলে হামাম। দুটো হলঘর হবে। একটায় বসবে জলসা, আর একটা হবে লাইব্রেরি। বাগানে থাকবে গার্ডেন লাইট আর ফোয়ারা। যুদ্ধে আমার জীবন হয়ে গেছে পোড়ামাটি। তোমার জীবন আমি ভরে দোব। ফুলের মতো একটি নাতি আর একটি নাতনি। নাতিকে আমি নিজে হাতে তৈরি করব। বিরাট ম্যাথেমেটিশিয়ান, এ গ্রেট র্যাংলার। নাতনিকে করব ডাক্তার, এ লেডি উইথ দি ল্যাম্প। তোমার মনে নেই, আমাদের একটা কুকুর ছিল। তার নাম ছিল জিম। নিউফাউন্ডল্যান্ড ডগ। মেজদা মারা গেল, সাত দিনের দিন মারা গেল জিম। ওইরকম একটা কুকুর পুষব। যারা চলে গেছে তাদের আর ফেরাতে পারব না। তা না পারি, নতুন হাট তো বসাতে পারি। এক কূল নদী ভাঙে নিরবধি আবার অন্য কূলে আকুলে সাজায়। লেট আস হ্যাভ সাম মিউজিক।
ঘরের কোণে টেবিলের ওপর পরিপাটি করে রাখা দম দেওয়া গ্রামাফোন, এত বড় তার চোঙা। দম দেবার হাতলটা ভারী সুন্দর। কুকুর-মার্কা ছোট্ট কৌটো থেকে পিন বেরোল। ঘরঘর করে দম দিলেন বারকতক। বাইরে বৃষ্টি ভেতরে সংগীত। শূন্য এ বুকে পাখি মোর, আয়, ফিরে আয়, ফিরে আয়।
পেছনে হাত জোড় করে ঘরে পায়চারি করছেন। ঘড়ির পেন্ডুলাম ঠাস ঠাস করছে। জ্ঞান গোস্বামীর গলায় গানের সুর তিরের ফলার মতো বিধছে–তুই নেই বলে ওরে উন্মাদ, পাণ্ডুর হল আকাশের চাঁদ।
ঘরের মাঝখানে থেমে পড়ে পিতা বললেন, মেয়েটির নাম অপর্ণা। আমি তাকে এই এতটুকু দেখেছি। তোমার মায়ের চেহারার সঙ্গে অদ্ভুত সাদৃশ্য। শুধু সুন্দরী নয়, সুশিক্ষিতা। লেটার নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট করেছে। সামনের বার ফিলসফিতে অনার্স নিয়ে বি এ দেবে। বি এর আগেই বিয়ে, তারপর এম এ করাব। তোমরা সুখী হও।
গানের শেষ চরণ বাজছে, শূন্য এ বুকে পাখি মোর, আয়, ফিরে আয়, ফিরে আয়। খটাস আওয়াজ করে রেকর্ডের ওপর থেকে হাতলটা সরে গেল একপাশে। এবার শুধু বৃষ্টির শব্দ, হাওয়ার ওঠাপড়া। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পিতা দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। বুক কেঁপে উঠল। এ বাড়িতে অল্পবিস্তর অশরীরীদের আনাগোনা আছে। এই ঝড়ের রাতে কেউ অভিসারে এলেন নাকি! চৌকাট টপকে সরার মতো কী একটা বস্তু মেঝেতে ঠকাস করে উলটে পড়ল।
ইনি আবার কে এলেন, এই মাঝরাতে?
আজ্ঞে ওটা একটা কচ্ছপ।
কচ্ছপ? কচ্ছপ কোথা থেকে এল? দেখো দেখো, এরপর হয়তো একটা গজ এসে ঢুকবে।
আজ্ঞে না, গজ মনে হয় আসবে না। কচ্ছপ আজ দুপুরে পাতকো থেকে উঠেছে।
সেকী?
মনে হয় সুড়ঙ্গপথে গঙ্গা থেকে এসেছে। নীচে ছিল বালতিতে চোবানো, ওপরে উঠে এসেছে।
বলো কী? অত্যন্ত শুভলক্ষণ। ভবিষ্যতের চিন্তা করতে না করতেই প্রাপ্তিযোগ। ইনি পুরুষ না মহিলা?
তা তো জানি না।
এর একটা নাম রাখতে হয়। কী নাম রাখা যায়!
বলাই।
বলাই। নট ব্যাড। বলাইবাবু। ওটাকে আমি পুষব। আপাতত আজ রাতের মতো এই বালতিতে থাক। আপ মাই বয়, আপ।
দেখবেন, কামড়ে না দেয়!
কামড়াবে কেন?
দু’হাতে তুলে বালতিতে বলাইবাবুকে ফেলা হল। সলিলশয্যায় বলাই ভাসতে লাগল। পিতা একটি রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড চাপালেন। পঙ্কজ মল্লিক। কেন বাজাও কাঁকন কনকন। বড় ডেকচেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে বসে বললেন, পাজিটা একবার দাও। ইচ্ছে করলে শুয়ে পড়তে পারো।
সিঁড়িতে এবার স্পষ্ট পায়ের শব্দ। পিতা শুনতে পাননি। পাঁজি নিয়ে ব্যস্ত। শব্দটা খুবই চেনা। দরজার মুখে প্রফুল্লকাকা, ভাই হরি!
পিতা মুখ না তুলে গম্ভীর গলায় বললেন, গেট আউট।
সেভ মি হরি। ওয়াইফ ফিভার। স্পিকিং ডিলিরিয়াম।
পিতা মুখ তুললেন, আর একটু ধরে পেটাও না রাসকেল।
রাগের মাথায় অন্যায় করে ফেলেছি ভাই। এই আমি কান ধরে ওঠবোস করছি।
কান ধরে সত্যিই ওঠবোস শুরু করলেন ভদ্রলোক। আর ঠিক সেইসময় বলাইবাবু মেঝেতে উলটে পড়লেন।
১.২৯ আমি দেহ বেচে ভবের হাটে
বলাইবাবু খুব পোষ মেনে গেছে। পিতা তার পিঠ পালিশ করে দিয়েছেন। এমন পরিচ্ছন্ন কচ্ছপ জীবজগতে আর দুটি নেই। সারা বাড়িতে ইচ্ছেমতো পায়চারি করে বেড়ায়। খাদ্য পুঁইশাক, কুটনোর খোসা, আলু, কলা। চুকচুক করে দুধ খেতে শিখেছে। আগের মতো আর কথায় কথায় খোলে ঢুকে পড়ে না। গলা বের করে পৃথিবী দেখে। তবলার শব্দে চঞ্চল হয়।
