তোমার চেয়ে জীবনকে আমি অনেক বেশি চিনি। অস্বীকার করতে পারো?
আজ্ঞে না। আমি তোমার চেয়ে অনেক বেশি পোড়-খাওয়া মানুষ। কোনও সন্দেহ আছে?
আজ্ঞে না।
তা হলে শোনো, যুদ্ধ দুর্গে বসেই করা ভাল।
কীসের যুদ্ধ?
ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে অনবরতই মানুষের যে যুদ্ধ চলেছে, হারছে, জিতছে, উঠছে, পড়ছে, সেই অদৃশ্য যুদ্ধ সংসার দুর্গে বসে করাটাই হল গৃহীর ধর্ম। শক্তির আঁচলে বেশ করে নিজেকে বাঁধে, বেঁধে তাল ঠুকে বলো, কে আসবি আয়।
আপনি ধ্যান, জপ, দীক্ষা, এইসবের কথা বলছেন?
মনে হয় না। আধার ঠিক না হলে, ও সব হল ফাঁকি। মুখে বলি হরি, কাজে অন্য করি। মন্দিরে যার মাধব আছে তারই শাঁক ফোকা চলে। তোমাকে আমি সংসারী করব।
তার মানে?
চাকরিটা তোমার হচ্ছে, জানো বোধহয়।
আজ্ঞে না, হচ্ছে? আপনি কীভাবে জানলেন?
যে ভাবেই জানি, তোমার হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যেই চিঠি পাচ্ছ। সামনের ফাল্গুনেই তোমার আমি বিয়ে দেব। পাত্রী ঠিক করে ফেলেছি।
ইমপসিবল। হতেই পারে না।
ইমপসিবল কেন? তুমি নিজে কি কোথাও ঠিক করে বসে আছ?
নিজে ঠিক করব কেন? আমি কি বিয়ে-পাগলা!
বলা যায় না, এখন তো প্রেম আর আত্মহত্যার একটা হিড়িক পড়েছে। সেই বাতাসে তুমিও উতলা!
আজ্ঞে না। বিয়ে একটা থার্ড ক্লাস নোংরা ব্যাপার।
তাই নাকি! তা হলে আমরা খুব অন্যায় করে ফেলেছিলুম বলো! তোমার মায়ের সঙ্গে একটা থার্ড ক্লাস অ্যাফেয়ারে জড়িয়ে পড়ে, তোমার মতো একজন ফাস ক্লাস মহামানব লাভ করেছি!
আমি সে কথা বলিনি। আমার মত আলাদা, পথ আলাদা। সংসারে একজন সন্ন্যাসী হলে চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার হয়ে যায়। আমি সংসারের পাঁকে ডুবতে চাই না।
সন্ন্যাসী তুমি হতে পারবে না।
আলবাত পারব।
আমি লিখে দিচ্ছি তুমি পারবে না। সে গাছ আলাদা, সে ফল আলাদা, সে মাটি আলাদা। তুমি তো এই গাছের ফল। আমার ভেতরটা দেখো। সাংসারিক বুদ্ধিতে জবজবে, বৈরাগ্যের ছিটেফোঁটাও নেই। এখনও ভাদুয়া ঘিয়ে ভাজা ফুলকো ফুলকো লুচির লোভ গেল না। শীতের প্রথম বেগুনভাজার জন্যে প্রাণ আঁকুপাঁকু করে। ঈশ্বরে ছিটেফেঁটাও বিশ্বাস নেই। আমি বুঝি কর্ম। কর্মেই মুক্তি, কর্মেই সিদ্ধি। তুমি তো খুব কথামৃত পড়ো, ঠাকুরের সেই কথাটা মনে পড়ে?
কোন কথা?
সেই যে সাধুর কমণ্ডলু চার ধাম ঘুরে আসে, কিন্তু যেমন তেতো, তেমনি তেতো থাকে। মলয়ের হাওয়া যে-গাছে লাগে, সব চন্দন হয়ে যায়। কিন্তু শিমুল, অশ্বথ, আমড়া এরা চন্দন হয় না। কেউ কেউ সাধুসঙ্গ করে গাঁজা খাবার জন্যে। সাধুরা গাঁজা খায় কিনা তাই তাদের কাছে এসে বসে গাঁজা সেজে দেয় আর প্রসাদ পায়।
আপনি যাই বলুন, বিয়ে আমি করব না। নারী নরকস্য দ্বার।
বাঃ, তোতাপাখির মতো বেশ কপচাতে শিখেছ তো! নারী যে শক্তি তা কি জানো? তোমার অস্ত্রেই তোমাকে কাত করে দিই। ঠাকুর এক জায়গায় বলছেন, বিদ্যারূপিণী স্ত্রীও আছে, আবার অবিদ্যারূপিণী স্ত্রীও আছে। বিদ্যারূপিণী স্ত্রী ভগবানের দিকে নিয়ে যায়, আর অবিদ্যারূপিণী। ঈশ্বরকে ভুলিয়ে দেয়, সংসারে ডুবিয়ে দেয়। আমি যার হাতে তোমাকে তুলে দিচ্ছি, তিনি হলেন বিদ্যারূপিণী। তাঁর পাশে তুমি এক মর্কট।
তা হলে, জেনেশুনে আপনি বিদ্যার গলায় একটি মর্কট ঝোলাতে চাইছেন কেন?
যদি তুমি একটু মানুষ হও। তোমার এই উড়ুউড়ু, পাখি-পাখি ভাবটা কেটে গিয়ে, যদি একটু দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হতে পারো।
মানুষ হবার জন্যে মানুষ গুরুর কাছে যায়, সুন্দরী স্ত্রীর কাছে যায় না।
টেবিলের ওপর থেকে ওই খামটা নিয়ে এসো।
খাম থেকে সেই বর্ষণসিক্ত মধ্যরাতে অর্ধমাপের একটি ছবি বেরিয়ে পড়ল। ফুটবাথের জল শীতল হয়ে গেছে। তবু ডুবে আছে। এই মানুষটি দিনরাতের হিসেব তেমন গ্রাহ্য করেন না। কত রাত জেগে কাটিয়েছেন! কত রাতে এসরাজ বেজে গেছে দরবারির কোমল মোচড়ে।
এদিকে এগিয়ে এসো। অবাধ্য হোয়ো না। বসন্ত আসছে। এ সংসারে আমরা বড় রুক্ষ হয়ে আছি। আমাদের চিন্তাভাবনা বড় বাউন্ডুলে হয়ে গেছে। একটু সবুজ হতে হবে। জীবনের কথা কেউ বলতে পারে! আজ আমি আছি, কাল হয়তো থাকব না। কে বলতে পারে, ঘরের ওই কোণে মৃত্যু হয়তো এসে বসে আছে। ঘড়ি দেখছে, ক্যালেন্ডার দেখছে। তুমিও জানো না, আমিও জানি না। ছবিটা একবার দেখে যাও। আমার বন্ধুর মেয়ে। ঈশ্বর কত বড় স্রষ্টা একবার দেখে যাও! আমি অবশ্য ঈশ্বর মানি না।
পিতার ভাবাবেগ অঝোর বর্ষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে। পুত্রের সঙ্গে কোন পিতা এমন খোলাখুলি কথা বলতে পারেন! মিথ্যে বলব না, বন্ধুকন্যা অপরূপা। কুমোরটুলিতে অর্ডার দিয়ে তৈরি। রবিবর্মার পৌরাণিক ছবির নারীমূর্তির মতো। তেমনভাবে তাকাতে পারছি না। ফিচিক ফিচিক করে চোরাচাহুনিতে যতটুকু দেখা যায়।
পিতা বললেন, তুমি হেরে গেলে। তোমার বেড়াল বেরিয়ে পড়েছে।
কেন?
তুমি সোজাসুজি তাকাতে পারছ না। তুমি সংকুচিত। তোমার মধ্যে প্রেমও নেই ভক্তিও নেই। ও দুটো না থাকলে সন্ন্যাসী হওয়া যায় না। প্রেমার্পণ সম দরশন জগজন-দুঃখ যায়। শঙ্করের মাথা চৈতন্যের হৃদয় চাই। জানি এখুনি তুমি প্রতিবাদ করবে। তোমার মধ্যে শিশুর সরলতা থাকলে। এদিকে তাকাতে অমন ইতস্তত করতে না। হৃদি বৃন্দাবনে বাস যদি করো কমলাপতি/ওহে ভক্তিপ্রিয় আমার ভক্তি হবে রাধাসতী, মুক্তিকামনা আমারই হবে বৃন্দে গোপনারী/দেহ হবে নন্দের পুরী স্নেহ হবে মা যশোমতী ॥
