তা হলে চাবুক মারার জমিদারি শখ হল কেন?
তা তো জানি না। তবে কাকিমা এসেছিলেন, পিঠ দুফাঁক, ডায়াগোনালি মেরেছেন।
তুমি সেই পিঠে আইডিন লাগালে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাঃ বেশ। তিনি এই বিছানায় বসলেন, তুমি লাগালে, তিনি শুয়ে পড়লেন, সারা চাঁদরে আইডিন আর লম্বা লম্বা চুল। জানো, এটা ব্যাচেলারদের বিছানা। বিছানা কত পবিত্র জানো? জানো বিছানা হল সাধনার পীঠস্থান! তান্ত্রিকের পঞ্চমুণ্ডী আসনের মতো।
আজ্ঞে হ্যাঁ জানি। তবে আপনি যদি দেখতেন, আপনিও কাতর হতেন। সে এক পাশবিক ব্যাপার।
পৃথিবীটাই তো পাশবিক। মানুষ এখানে আসে শাস্তি পেতে, সাফার করতে। নারী নির্যাতন এদেশে কোনও নতুন ঘটনা নয়।
আপনার কিছু বলা উচিত।
আমি বলব অন্যভাবে। আমার নীতি হল, টিট ফর ট্যাট। ওকে ঘুম থেকে টেনে তুলে স্কেল দিয়ে মেপে, সমান মাপের একটি ক্ষত তৈরি করে দেব।
সেটা কি ঠিক হবে?
তুমি কী করতে বলো?
আমার সেই ঘটনাটা মনে পড়ছে। সেই ভুজাওয়ালা!
ওঃ হেঃ আমাদের বাড়ির সামনের সেই উৎপাত!
আজ্ঞে হ্যাঁ, রাত বারোটার সময় স্ত্রীকে ধরে পেটাচ্ছিল, আপনি যেই স্বামীটাকে তেড়ে গেলেন। পেটবার জন্যে স্ত্রী অমনি ঝাটা নিয়ে আপনাকে তেড়ে এল। মনে পড়ছে?
হুঁ, পড়ছে। মার যে সোহাগ বুঝতে পারিনি। তোমার কি মনে হয় এটাও সেম কেস।
তা বলতে পারব না, তবে কাকিমা কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, একটু বিষ পেলে জীবনযন্ত্রণা জুড়োতেন।
হ্যাঃ, তুমিও যেমন, জীবনযন্ত্রণা জুড়োতেন। এদেশের মেয়েরা প্রতি মুহূর্তে আত্মহত্যার চিন্তা করে। সেই চিন্তা নিয়েই সুখে শেষ জীবন পর্যন্ত সংসারের জোয়াল ঠেলে। মৃত্যুর কথা ভাবা যায়, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া যায় না।
তা হলে এ নিয়ে আর রাগারাগি না করাই ভাল।
তুমি কিন্তু ডেঞ্জার জোনে চলে গেছ।
ডেঞ্জার জোন?
তোমার তো যোনো হয়ে গেছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, বহুদিন আগে।
তা হলে খোলাখুলি বলা চলে, কী বলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, পুত্র মিত্র, কী যেন বলে?
পা দুটো জলে খলবল করে উঠল। কোন দিকে মোড় নেবেন বুঝতে পারছি না। গভীর প্রদেশে চলে যাবেন নাকি? যেখানে জীব জগতের প্লাস আর মাইনাস ফ্যাক্টর অনবরত দাঁড়কাকের মতো
শুকনো ডালে বসে খাখা করছে। নীরবতা ভঙ্গ হল। পদকেলি শান্ত।
বুঝলে, মানুষের একটা বয়েস আসে, যে বয়েসটাকে বলে পিউবার্টি। তোমার গলার স্বর কত পালটে গেছে লক্ষ করেছ। তোমার ভেতরেই, তোমার অজান্তেই একজন পুরুষ বাসা বেঁধেছে। সেই পুরুষের অনেক চাহিদা আছে। বুঝতে পারো কিছু?
আজ্ঞে না, তেমন তো কিছু বুঝি না।
হয় তুমি অসুস্থ, না হয় তুমি মিথ্যেবাদী।
মিথ্যেবাদী শব্দটা সহ্য করতে পারি না। মাথায় আগুন জ্বলে যায়। আমি মিথ্যে কথা বলছি! পুরুষের ভেতর তো পুরুষই থাকবে। মেয়েছেলে থাকতে যাবে কোন আক্কেলে। মেয়েলি পুরুষকে তো লোকে গালাগালিই দেয়। বলে এফিমিনেট লৌভা। তা হলে প্রতিবাদ করা উচিত।
মিথ্যেবাদী বলছেন কেন? আমি তো কোনও মিথ্যে বলিনি। আমার গলা যখন সরু থেকে মোটা হল, তখন আপনি বয়সা লেগেছে বয়সা লেগেছে বলে দিনকতক এমন কাণ্ড করলেন, মনে হল আমার চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে। মুখে একটা ব্রণ বেরিয়েছিল, সেই দেখে সাত দিন ভাল করে কথা বলেননি। প্রায় ত্যাজ্য পুত্র করে দেবার মতো অবস্থা। আজ বলছেন মিথ্যেবাদী। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।
শোনো, শোনো মাই ডিয়ার সান, বাক্য দিয়ে, আবেগ দিয়ে সত্য চাপা যায় না। তোমার এই বয়েসটা আমিও পেরিয়ে এসেছি। কাম বলে একটা জিনিস আছে, জানো কি?
আজ্ঞে হ্যাঁ, শুনেছি।
শোনননি, অনুভব করেছ। তুমি তো মানবপুত্র। যে-কোনও সুস্থ মানুষ জীবনের অসংখ্য মুহূর্তে ওই আবেগে বিচলিত হয়। দেবতারাও মুক্ত ছিলেন না। আমাদের শাস্ত্রকাররা বড় প্র্যাকটিক্যাল ছিলেন। যৌবনেই তারা বিবাহের বিধান দিয়েছিলেন। আমাদের অর্থনীতি পারমিট করে না বলেই, সাকার হয়ে সংসারী হতে হয়। অনেকে প্রৌঢ় বয়সে বিবাহ করে, যখন বিবাহের আর কোনও প্রয়োজন থাকে না। ইংরেজিতে একটা কথা আছে– Early marriage late orphan, late mar riage early orphan. আমি তোমাকে একটা স্বাভাবিক চ্যানেলে ফেলে দিতে চাই। পজেটিভ লাইফ।
তার মানে? এখন কি আমার নেগেটিভ লাইফ!
দেখো বাপু, আমার মুখটা বড় আলগা। অবশ্য ভালগার নই। জীবন আমার কাছে জীবন। কোদাল আমার কাছে কোদাল। চাঁদ আমার কাছে চাঁদ, পৃথিবীর মৃত উপগ্রহ, প্রেয়সীর মুখ নয়। কিছুদিন আগে, তোমার মনে আছে নিশ্চয়, এ পাড়ার মানুষ এক হুলোর জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠেছিল। মাঝরাতে পাঁচিলে পাঁচিলে আউ ওঁআউ করে ডাকত। আমি চাই না, তুমি চাঁদনিরাতের কামতাড়িত হুলো হয়ে যাও।
নাঃ, আর বসে থাকা যায় না। অসহ্য আক্রমণ। একেই বলে হিটিং বিলো দি বেল্ট। সামনে থেকে সরে যাই। মুখে মুখে তর্ক করে লাভ নেই। ব্যাপারটা থিতিয়ে যাক।
চললে কোথায়? আমার সামনে থেকে পালালে, নিজের কাছ থেকে পালাতে পারবে? পারবে না। ধৈর্য ধরে বোসো। আমার চেয়ে ভাল বন্ধু পাবে না, আমার চেয়ে ভাল উপদেষ্টা পাবে না। তোমার শুরু আমার শেষ। যাবার আগে তোমার মা বলেছিলেন, খোকা রইল, তুমি দেখো। তোমাকে আমি তুলোয়-রাখা আঙুরের মতো মানুষ করেছি। অস্বীকার করতে পারো?
আজ্ঞে না।
