আমার পাশে হাঁটুর ওপর দু’হাত রেখে সামনে ঝুঁকে পড়ে কাকিমা বললেন, কী বলো তো!
ঠাকুর, আমাকে রক্ষা করো। এ মহিলার লজ্জাশরম বড় কম। বেহুঁশ উদাসী। শরীর ভিজে জাব। চুল ভেঙে পড়েছে পিঠে। দেহভঙ্গি তেমন ভাল নয়। আমি বস্তু দেখব, না মানবী দেখব! তুমিই আমাকে বলে দাও। আমি এক যুবক। শ্বাসপ্রশ্বাস পড়ে। দেহে রক্তস্রোত বইছে। কোনওরকমে বললুম, কী বলুন তো! ঠিক বুঝতে পারছি না। অনেকটা কচ্ছপের মতো।
ঠিক ধরেছ। কচ্ছপই। উলটে পড়ে আছে। শরীরটা ভিতরে ঢুকে আছে। কোত্থেকে এল বলো ততা!
আকাশ থেকে কচ্ছপ পড়বে কী করে?
তাই তো অবাক হচ্ছি।
আমার মনে হয় পাতকো থেকে এসেছে।
কুয়োয় কচ্ছপ আসবে কী করে?
আমাদের কুয়োর সঙ্গে গঙ্গার যোগ আছে।
হ্যাঃ!
হ্যাঃ নয়। সত্যিই আছে। দেখবেন চলুন।
সাঁওতাল রমণীদের মতো হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে কাকিমা কুয়োর পাড়ে গিয়ে ঝুঁকে পড়লেন। আদুড় পিঠে ভিজে এলো চুল, এপাশে ওপাশে লাল সোঁটা দাগ। তবলচি কাকার সোহাগের তেহাই।
কই, কোথায় তোমার গঙ্গা?
ওই দেখুন, পাতকোর মাঝখানে সুড়ঙ্গের মুখ। হুহু করে জল আসছে।
বাঃ, কী মজা, কী মজা! এখুনি বড় বড় মাছ আসবে।
কাকিমা সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। ভিজে নার্গিসের মতো দেখাচ্ছে।
তুমি আচ্ছা বোকা! জামাকাপড় পরে ভিজছ। সব খুলে ফেলল।
না, না, সব খুলব কী?
আরে দুর, আন্ডারওয়ার আর গামছা পরে এসো। বিকেলের গা ধোয়া বৃষ্টির জলেই হয়ে যাক। আমার গান গাইতে ইচ্ছে করছে। আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভেজাব না।
বাঃ বেশ সুরেলা গলা। বৃষ্টিতে সংসারের মলিনতা ধুয়ে গেছে। দুঃখ ভেসে গেছে। আসল মানুষটি ক্ষণিকের জন্যে বেরিয়ে পড়েছে বৃষ্টি-ভেজা উঠোনে। চারপাশে তোড়ে জল পড়ছে ছাদের নল থেকে। কলকল শব্দে জল খেলছে চারপাশে।
দাঁড়াও কচ্ছপটাকে বালতিতে তুলি।
তুলে কী করবেন?
পুষব।
যদি কামড়ায়, মেঘ না ডাকলে ছাড়বে না।
মেঘ তো অনবরতই ডাকছে।
বালতি এসে গেল। মহিলার অসম্ভব সাহস। দু’পাশ থেকে দু’হাতে ধরে কচ্ছপটাকে ঝপাং করে বালতিতে ফেলে দিলেন। তোলামাত্রই কচ্ছপটার লম্বা গলা, আর চারটে পা বেরিয়ে পড়ল। ভয়ে চোখ বুজিয়ে ফেললুম। শব্দ শুনে আবার চোখ খুললুম।
কাকিমা খিলখিল করে হাসছেন আর বলছেন, তুমি কী ভিতু, তুমি কী ভিতু!
১.২৮ তুই নেই বলে ওরে উন্মাদ
কোনওকালে আমাদের বাড়িতে গোরু ছিল না; কিন্তু জাবনা দেবার একটা কাঠের পাত্র ছিল। আমাদের এইরকম অনেক কিছুই আছে। মাল আছে মালিক নেই। ভাব আছে ভাবী নেই? শাড়ি আছে, গহনা আছে, রমণী নেই। রান্নাঘর আছে রাঁধুনি নেই।
সেই কেঠোটি এখন শোবার ঘরে খাটের পাশে চলে এসেছে। ভেতরে গরম জল গোলাপি ধোঁয়া ছাড়ছে। পাশে একটা বালতিতে ঠান্ডা জল, মগ ভাসছে দুলে দুলে। আধ হাত ওপরে পিতার চরণদ্বয় ঝুলছে। ফুটবাথের প্রস্তুতি। মাথায় দু’পুরু ভিজে তোয়ালে। ঘড়ির শেষ শব্দ এইমাত্র বাতাসে মিলিয়েছে। এগারোটা বাজল। মেঘলা আকাশের তলায়, বৃষ্টি-ভেজা পথে রাত এগিয়ে চলেছে মধ্যযামের দিকে। বৃষ্টির বিরাম নেই। ঝোড়ো বাতাসে বন্ধ জানলা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
পায়ের পাতা গরম জল স্পর্শ করেই ছো-মারা চিলের মতো ওপরে উঠে গেল। পিতা বললেন, মাই গড, ঢালো এক মগ ঠান্ডা জল।
আগেও কয়েক মগ ঢেলেছি। জল কিছুতেই সহনীয় উত্তাপে নামতে চাইছে না। পাদস্পর্শ সম্ভব হলেও পদকেলির সুযোগ মিলছে না। ছোবল-মারা উত্তাপ। চাঁদরের ঝোলা অংশটা হঠাৎ তুলে। ধরে বললেন, একী, কোথা থেকে রক্ত এল? হাত কেটেছে বুঝি? বঁটিতে পেয়ারা কাটতে গিয়েছিলে?
পা দুটো ওপরে তোলা ছিল। কথা বলতে বলতে খেয়াল নেই। জলে পা পড়ে গেল। উঁহু উঁহু করে পা তুলে নিলেন। বললেন, জল একবার গরম হলে আর ঠান্ডা হতে চায় না। কতটা কেটেছে?
ওটা রক্তের দাগ নয়, আয়োডিন।
হাত কাটেনি তো আইডিন নিয়ে কী করছিলে? এমব্রয়ডারি! চাদরটা দাগরাজি করে দিলে।
পা আবার ধীরে ধীরে জলের দিকে নামছে। এখুনি হ্যাঁকা লেগে যাবে। সাবধান সাবধান বলে একটু জোরে চিৎকার করে ফেলেছি।
ষাঁড়ের মতো চেল্লাচ্ছ কেন?
আজ্ঞে না।
আরও দুমগ জল ঢালো। হট বাথের চেয়ে কোলড বাথই ভাল। ধৈর্য থাকে না।
আজ মেজাজ সপ্তমে চড়ে আছে। জল ভেঙে হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন। দুমগ জল ঢাললুম। পা এবার ডুবেছে। কিছুক্ষণ পরেই খলবল খলবল করে শব্দ হবে। জলে এক তোলার মতো নুন। পড়েছে। এবার একটু সুস্থ হয়ে বসতে পেরেছেন। দু’পাশে দুটি হাত। মাথায় ভিজে তোয়ালে। ব্যাং ডাকছে। বৃষ্টির শব্দ, বাতাসের শব্দ। প্রকৃতির জলসাঘরে বসে আছি। চাঁদরে আবার একটা কী খুঁজে পেয়েছেন। দু’আঙুলে ধরে ওপর দিকে টেনে তুলছেন। উঠছে উঠছে। কী রে বাবা! লম্বা চুল। আলো আর চোখের মাঝখানে চুলটাকে দু’আঙুলে ঝুলিয়ে বললেন, একী? চাঁদরে মেয়েদের চুল। আশ্চর্য? সামথিং ফানি।
এ যেন ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া হচ্ছে। ওইরকম গোটাকতক চুল পেলেও আশ্চর্য হব না। পিতা বললেন, আইডিন, এলোচুল, মানুষ খুন করেছ নাকি?
আজ্ঞে না! কাকাবাবু কাকিমাকে চাবুক মেরেছেন।
চাবুক মেরেছে? কেন, লটারি পেয়েছে নাকি?
আজ্ঞে?
লটারি পেয়ে জমিদার বাচ্চা হয়েছে?
না, সেরকম তো কিছু দেখলুম না। তা ছাড়া লটারি পেলে মানুষ তো হাসতে হাসতে মরে যায় শুনেছি।
