জানলার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখি। দাঁড়িয়ে আছেন সেই একভাবে। উদাস চোখ। চোখের দু’কোলে জলের ধারা। কাঁদছেন কেন? আমি তো কিছু করিনি। চড়াক করে আবার একটা বাজ পড়ল। কাকিমা চমকে জানলার ধার থেকে সরে এলেন। আবার হালুম করে বুকে এসে পড়ার ভয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলুম।
কাকিমা খাটের বাজু ধরে দাঁড়ালেন।
কাঁদছেন কেন আপনি?
এই একটি কথায় নীরব অশ্রু সরবে বইতে শুরু করল। মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
কেউ কাঁদলে মন এমনিই দুর্বল হয়ে পড়ে, মহিলারা কাদলে তো কথাই নেই।
আমাদের দু’জনের দূরত্ব খুব বেশি নয়। ইঞ্চি দুয়েক কাঠের ব্যবধান। কান্নার আবেগে বুক ফুলে ফুলে উঠছে।
আপনি কাঁদছেন কেন?
আমাকে একটু বিষ জোগাড় করে দিতে পারো?
বিষ?
হ্যাঁ বিষ।
আপনার কীসের দুঃখ!
দুঃখু? বলো, কীসের সুখ!
আপনি এদিকে এসে বসুন। জীবন মানেই দুঃখ। তা হলে সব মানুষকেই তো আত্মহত্যা করতে হয়! কাকিমার হাত ধরে টেনে এনে খাটের পাশে বসিয়ে দিলুম। বেশ আপনজনের মতো বসেছেন। কী জানি কেন, মনে এখন আর তেমন কোনও ব্যবধান নেই। একটু আগে লজ্জা করছিল, এখন মায়া এসেছে। মমতা-মাখানো সরল মুখ, অপরূপ একটি শরীর! মাতুলের স্টুডিয়োতে সেদিন যে বাইজির দল এসেছিল তাদের থেকে এঁর চেহারায় কীসের কমতি! গৃহবধূ হয়ে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছেন। বেঁচে থাকার ধরনটা সাহস করে পালটে ফেলতে পারলে, রানি মহেশ্বরী। সংস্কারে আটকে আছেন।
আপনার বাপের বাড়িতে কে কে আছেন?
কেউ নেই। সব খেয়ে বসে আছি। আর থাকলেই বা কী হত। বিয়ের পর মেয়েদের বাপের বাড়ি থাকে না।
এইরকম একটা মানুষকে বিয়ে করলেন কেন?
আমি করব কেন? আমার মামা করিয়ে দিলে। আমার মামা আর এর মামায় খুব আলাপ ছিল।
আপনার মামা কোথায়?
ওপারে।
এখানে আসার আগে কোথায় ছিলেন?
এর মামার বাড়িতে। এর মামার অবস্থা বেশ ভাল। একলা মানুষ। ব্যাবসাট্যাবসা আছে। ব্যায়লা বাজায়, একটু মদদ খায়। মানুষটা খুব উদার। বড় বাড়ি।
চলে এলেন কেন?
আমি আসব কেন? উনিই চলে এলেন। বুড়োকে মারধর করে।
মারধর করে কেন?
সে অনেক ব্যাপার। নোংরা ব্যাপার। তোমাকে বলতে আমার লজ্জা করবে। এতদিন পরে ওনার মনে হল, বুড়োর চরিত্র খারাপ। আর প্রথম থেকে আমাকে বলে এল, মামাকে একটু তোয়াজ করো, বুড়োর কেউ নেই, মরলে সব আমাদের। তুমিই বলো, বুড়োমানুষের কী চরিত্র খারাপ হবে! বুড়োরা তো এমনিই বুড়ো।
সে আপনি বলতে পারবেন।
আমি তো বলছি, মামাশ্বশুর দেবতার মতো মানুষ। বয়েস হয়েছে তাই বাতের রোগে ভোগেন। গা হাত পা বেশ কিছুক্ষণ টিপে না দিলে রাতে ঘুম আসত না। অ্যায় শুরু হল অশান্তি। মুখের তো কোনও বাঁধন নেই। রাগলে নালা নর্দমা। কেবলই বলে, তুমি টেপো না তোমাকে টেপে।
থাক থাক, আর শুনতে চাই না।
না, শুনে কাজ নেই। আমিও বলতুম না, যখন মারধর করে, তখন মনে হয় সত্যিই খারাপ হয়ে যাই। ওই মামাশ্বশুর আমাকে সাত ভরি সোনার গয়না করিয়ে দিয়েছিলেন, বাবু সব উড়িয়েছেন। মামার ভালটা পায়নি, মামার কাপ্তেনিটা পেয়েছে। তার অনেক আছে, তোমার কী আছে?
যাক গে, ছেড়ে দিন ওসব কথা।
ছাড়ব কেন? ছাড়ব কেন? তুমি করতে পারো, আমি বলতে পারি না। পেটে একটা বাচ্চা এল। বলে কিনা, এ কার? কে এর বাবা! কীরকম নোংরা মানুষ। সেই বাচ্চাটাকে আমার নষ্ট করিয়ে দিলে। মানুষ না জানোয়ার!
আবার কান্না এসে গেল। ফেঁপাতে ফেঁপাতে বললেন, জানো, আমি আর মা হতে পারব না। কেউ আর আসবে না আমাকে মা বলতে। দোষ আমার না, দোষ তোমার! এদিকে উঠতে বসতে গালাগাল দেবে, আঁটকুড়ো। জানে তো, এর কোথাও যাবার জায়গা নেই, তাই ধামসে যাচ্ছে।
আমি কিন্তু আপনাদের ভালবাসাও দেখেছি। সোহাগ যে করে তার শাসন করাও সাজে।
তুমি দেখেছ, তুমি বোঝেনি। স্বার্থ ছাড়া ও এক পা-ও চলে না। তুমি জানবে, ভালবাসা হিরের চেয়েও দামি। যে ভালবাসে তার চাবুকও হজম করা যায়। আমাকে কেউ কোনওদিন ভাল বাসেনি, ভাল বাসবেও না, আমি এক ক্রীতদাসী।
পাতকোতলায় দুম করে একটা শব্দ হল। কাকিমার মুখটা ছাইয়ের মতো হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সর্বনাশ! সদর খোলা ছিল নাকি? আমি তো বন্ধ করে এসেছিলুম, তা হলে!
তা হলে কী?
কখন এসে বসে আছে! হয়তো সব দেখেছে, সব শুনেছে। আজ আমায় খুন করে ফেলবে।
খুন করলেই হল! আমরা আছি!
আমি যাই।
পায়ে পায়ে ভয়ে ভয়ে কাকিমা চলে গেলেন। বৃষ্টি সামান্য কমেছে। আকাশ ঘুলিয়ে উঠেছে। এ সেই বৃষ্টি, যা চলবে সমানে তিন দিন। মহিলা মনটা বড় বিষণ্ণ করে দিয়ে গেলেন। পৃথিবীতে জানোয়ারের সংখ্যা এত বাড়ছে কেন! কিছু হান্টারওয়ালি জন্মালে বেশ হয়। চাবকে সব ঠান্ডা করে দেবে।
কাকিমার গলা শোনা গেল, পিন্টু, শিগগির এসো, শিগগির এসো।
কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে কাকিমা চিৎকার করছেন, আর জলে ভিজছেন। দোতলার বারান্দা থেকে। মুখ বের করে বললুম, কী হয়েছে!
ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালে অবিরাম বেজে চলেছে জলতরঙ্গ। নল বেয়ে জল বইছে দুধের ধারায়। প্রকৃতির অঝোর শব্দে মানুষের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিভেজা মুখ তুলে কাকিমা বললেন, নেমে এসো না। দেখে যাও আকাশ ভেঙে কী পড়েছে।
উঠোনে চিত হয়ে কী একটা পড়ে আছে। পাথর নয়। সরার মতো কী এক প্রাণী। মাছ বৃষ্টি হয়, আগুন বৃষ্টি হয়, এ আবার কী বস্তু রে বাবা! নড়েও না, চড়েও না অথচ ঠাসা মাল।
