যা থাকে বরাতে, আয়োডিনই লাগাই। কাঠিতে বেশ মোটা করে তুলো জড়িয়ে একটু একটু করে আয়োডিন লাগাচ্ছি। পিঠটা থিরথির করে কাঁপছে। চারপাশে শিশিরের দানার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটছে। কাকিমার কী হচ্ছে জানি না, আমার কিন্তু চোখ ফেটে জল আসছে। এ ওই গোঁয়ারগোবিন্দ তবলচি ব্যাটার কাজ। জানোয়ার। কেন ব্লাউজ পরেননি এখন বুঝতে পারছি।
পিঠের দিকটা খুলে রাখলে তুমি কিছু মনে করবে পিন্টু?
না না, মনে করব কেন?
খাটে বসেছিলেন বলে, একটু আগে আমার খারাপ লেগেছিল। এখন আর লাগছে না। একটু বাতাস করে দিলে, মনে হয় আরাম পাবেন। পাখাটা নিয়ে আসতেই খপ করে হাত চেপে ধরলেন। মুখ দেখলে বোঝা যায়, খুব জ্বালা করছে। অন্য কেউ হলে চিৎকার করতেন। এ মহিলার অসম্ভব সহ্যশক্তি।
ছাড়ুন, একটু বাতাস করে দিই। জ্বালা কমবে।
দুর পাগল। জ্বালা কি কমে? সহ্য করতে হয়। নাও, তুমি শুয়ে পড়ো। আমি একটু বসে চলে যাই। কাজ পড়ে আছে।
অসম্ভব জোরে বৃষ্টি পড়ছে। এইরকম জোরে ঘণ্টাখানেক পড়লেই জল জমে যাবে। বিখ্যাত ঠনঠনেতে একবুক জল হবে। পিতৃদেবের বাড়ি ফিরে আসতে আজ জীবন বেরিয়ে যাবে। চাদর চাপা দিয়ে আবার জানলার ধারে গিয়ে বসলুম। গুঁড়িগুঁড়ি জলকণা উড়ে আসছে।
সারাআকাশ ফাটিয়ে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। ভয়ে কানে আঙুল দিলুম বিকট শব্দ হল বলে। না, তেমন শব্দ হল না। বহু দূরে আকাশের হুমকি বাজল গুমগুম করে।
কাকিমা বললেন, আওয়াজকে বড় ভয় করে। বৃষ্টি হয় তোক। তুমি বাজ পড়া দেখেছ?
না, শুনেছি বাজ পড়লে গোবর চাপা দিতে হয়, তা হলে নাকি নীলমতো একটা বল পাওয়া যায়।
ধুস, ওসব গল্পকথা। আমি কত সাপ দেখেছি, একটারও মাথায় মণি দেখিনি। আমার ভীষণ হিরের নাকছাবি পরার শখ। একটা মণি পেলে কাটিয়ে আংটি আর নাকছাবি করিয়ে নিতুম। গল্পের সেই দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেল বলো তো, সেই পক্ষীরাজ ঘোড়া, রাজপুত্র, সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি।
দিন হারায়নি কাকিমা, গল্প হারিয়ে গেছে। যত দিন যাচ্ছে, পৃথিবী তত সেয়ানা হয়ে উঠছে।
নাঃ, কাকিমাকে এক ডোজ আর্নিকা খাইয়ে দিই, ব্যথা অনেক কমে যাবে। চাদর ফেলে আমাকে উঠতে দেখে কাকিমা বললেন, কী হল আবার?
কিছু না, আপনাকে এক পুরিয়া ওষুধ খাইয়ে দিই। ব্যথা কমে যাবে।
মনে হচ্ছে, জ্বর আসছে পিন্টু। শীতশীত করছে।
আর্নিকার শিশি হাতে কাকিমার সামনে এসে দাঁড়ালুম। বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছেন।
নিন, জিভটা বের করুন, গোটাকতক গুলি ঢেলে দিই।
শিশির পেছনে টুস টুস করে গোটাকতক টুসকি মেরে সাত-আট দানা ওষুধ জিভের ওপর সবে ছেড়েছি, বিদ্যুতের আলোয় আকাশে ঢেউ খেলে গেল। কানে আঙুল দেবার সময় নেই। প্রচণ্ড শব্দে কাছেই কোথাও বাজ পড়ল।
শব্দের সঙ্গে সঙ্গে কাকিমা, ও মা, বলে দু’হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বসে, আমি দাঁড়িয়ে। টাল সামলানো গেল না। হুমড়ি খেয়ে সামনে, মহিলার ঘাড়ে। দু’জনেই বিছানায় চিতপাত। কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়েছে। খুব কাছে। বাতাস গরম। নাকে পোড়াপোড়া গন্ধ।
আকাশ আবার চমকাল। আবার বজ্রপাতের শব্দ। মহিলার ভীত আলিঙ্গন আরও দৃঢ়। এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছেন! এভাবে না জড়ালেই ভাল হত। শরীরেরও তো চৌম্বক শক্তি আছে। এই মুহূর্তে নিজেকে আর পিন্টু বলে ভাবা যায় না। সেই পুরুষ ও প্রকৃতি। ঘনঘোর আকাশে, ঝোড়ো বাতাসে, মেঘ ছিঁড়ছে, মেঘ জুড়ছে, গাছের মাথা দুলছে উন্মত্ত আনন্দে, বিদ্যুৎ শিউরে শিউরে উঠছে, আকাশ কখনও চাপা, কখনও মুক্ত গর্জনে প্রকৃতিকে শাসন করছে।
সারা চাঁদরে ভিজেভিজে আর্নিকার গুলি। শিশি ছিটকে চলে গেছে বালিশের পাশে। রাত না দুপুর! পিন্টুর পিন্টুত্ব লুপ্ত। শরীরে বড় কষ্ট। কষ্টে আনন্দ, আনন্দে কষ্ট, চোখে আকাশ অদৃশ্য। মাতাল বর্ষায় বড় রমণীয় স্থানে আশ্রয় পেয়েছি। ছেড়ে যেতে চাই, মুক্তি নেই। মনে সে জোর নেই। নিজেকে এবার চিনতে পেরেছি। ভণ্ড তপস্বীকে।
যেমন হঠাৎ জড়িয়ে ধরেছিলেন, তেমনি হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে কাকিমা জানলার ধারে চলে গেলেন। বিছানায় পড়ে আছি চিতপাত। মনে একটু পাপের ফেঁসো এখনও লেগে আছে, তা না হলে এমন হতভম্ব হয়ে যাব কেন? মা কি সন্তানকে জড়িয়ে ধরতে পারেন না, খুব পারেন, একশোবার পারেন। ওই কথামৃত পড়ার ফলে, আমার এইরকম কলা খাইনি গোছের অবস্থা হয়েছে। কিন্তু ঠাকুর রামকৃষ্ণ যে বলেছেন, মেয়েদের সঙ্গে বসা কি বেশিক্ষণ আলাপ, সেও একপ্রকার রমণ। রমণ আট প্রকার,
স্মরণং কীর্তনম কেলিঃ প্রেক্ষণং গুহ্য ভাষণং।
সংকল্লোহধ্যাবসায়শ্চ ক্রিয়ানিষ্পত্তিরেব চ এতন্মৈথুনমষ্টাঙ্গং ॥
মেয়েদের কথা শুনছি; শুনতে শুনতে আনন্দ হচ্ছে, ও এক রকম রমণ। মেয়েদের কথা বলছি [কীর্তনম্], ও এক রকম রমণ; মেয়েদের সঙ্গে নির্জনে চুপিচুপি কথা কচ্ছি, ও এক রকম। মেয়েদের কোনও জিনিস কাছে রেখে দিয়েছি, আনন্দ হচ্ছে, ও এক রকম। স্পর্শ করা, আর এক রকম। তাই গুরুপত্নী যুবতী হলে পাদস্পর্শ করতে নেই।
অবশ্য, এ বিধিনিষেধ সবই হল সন্ন্যাসীদের জন্য। সংসারীদের আলাদা কথা; দু’-একটি ছেলে হলে ভাই-ভগ্নীর মতো থাকবে; তাদের অন্য সাত রকম রমণে তত দোষ নেই। কিন্তু, আমি তো সংসারীও নই, সন্ন্যাসীও নই। যখন সন্ন্যাসী হয়ে ছিটকে বেরিয়ে যাব, তখন আর মহিলাটহিলা কোথায়! বরফ ঢাকা হিমালয়। ছোট্ট একটা গুহা। যা হয়ে গেল, তাতে কি আমার আনন্দ হল! না, হয়নি। মনে হচ্ছে একটু হয়েছে। মরেছে। কাকিমা তো একটা পাতানো সম্পর্ক। আসলে তো রমণী। মধ্যবয়স্ক তরুণী ভার্যা।
